বিজ্ঞাপন

মসজিদ কি “লকড কারাগার”? ইসলাম, বাস্তবতা ও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির সংকট

মসজিদ—এই একটি শব্দ শুধু একটি স্থাপনার নাম নয়; এটি কোটি কোটি মুসলমানের হৃদয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গভীর আবেগ, বিশ্বাস ও আত্মিক আশ্রয়ের নাম। পৃথিবীর যে প্রান্তেই একজন মুসলমান থাকুন না কেন, মসজিদের আজান শুনলে তার ভেতরে এক ধরনের পরিচিত অনুভূতি জেগে ওঠে। সেখানে মানুষ দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে কয়েক মুহূর্তের জন্য নিজেকে সরিয়ে নেয়, সৃষ্টিকর্তার সামনে দাঁড়ায় এবং নিজের ভেতরের অস্থিরতা, অপরাধবোধ ও আত্মার তৃষ্ণা নিয়ে ফিরে আসে।

কিন্তু সেই মসজিদের দরজাই যদি নামাজের নির্দিষ্ট সময় ছাড়া বন্ধ থাকে? নামাজ শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই যদি তালা ঝুলে যায়? কোনো পথিক যদি কিছুক্ষণ বসতে চান, একজন ক্লান্ত মানুষ যদি নীরবে বিশ্রাম নিতে চান, কেউ যদি একাকী কোরআন পড়তে বা জিকির করতে চান—তখন যদি তাকে বলা হয়, ‘মসজিদ বন্ধ’—তাহলে প্রশ্ন জাগতেই পারে, আমরা কি মসজিদের মূল চেতনাকে কোথাও হারিয়ে ফেলছি? সেখান থেকেই প্রশ্ন—মসজিদ কি ধীরে ধীরে ‘লকড কারাগারে’ পরিণত হচ্ছে?

প্রশ্নটি আবেগের। কিন্তু এর উত্তর শুধু আবেগ দিয়ে দেওয়া যায় না। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইসলামি ইতিহাস, শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি, নিরাপত্তা, সামাজিক পরিবর্তন, মসজিদ পরিচালনার বাস্তবতা এবং আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন।

ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে মসজিদের একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখতে পাই। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে মসজিদে নববী শুধু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের স্থান ছিল না; এটি ছিল একটি জীবন্ত সামাজিক প্রতিষ্ঠান। সেখানে নামাজ হতো, কোরআন শিক্ষা হতো, জ্ঞানচর্চা হতো, মানুষের সমস্যা নিয়ে আলোচনা হতো এবং সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো।

সাহাবায়ে কেরাম (রা.) মসজিদে বসে রাসূল (সা.)-এর কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতেন। দরিদ্র সাহাবিদের একটি অংশ মসজিদে অবস্থান করতেন। মসজিদ ছিল তাদের জ্ঞান, আশ্রয় ও আত্মিক শক্তির জায়গা। মসজিদে নববী ছিল এমন একটি কেন্দ্র, যেখানে ব্যক্তি ও সমাজ—দুটিই গড়ে উঠত।

অর্থাৎ মসজিদকে ইসলামের প্রথম যুগে কোনো ‘শুধু নামাজের ঘর’ হিসেবে দেখা হয়নি। বরং এটি ছিল ইবাদত, শিক্ষা, নৈতিকতা, সামাজিক সংযোগ ও মানবিকতার কেন্দ্র।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। মসজিদ উন্মুক্ত ছিল মানেই সেখানে যা খুশি করার অনুমতি ছিল—এমন ধারণাও ইসলাম সমর্থন করে না।

মসজিদের নিজস্ব পবিত্রতা, শৃঙ্খলা ও আদব রয়েছে। সেখানে অশালীনতা, ঝগড়া-বিবাদ, উচ্চস্বরে অনর্থক কথা বলা কিংবা এমন কোনো কর্মকাণ্ড করা উচিত নয়, যা মুসল্লিদের ইবাদতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। মসজিদ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হবে, কিন্তু সেই উন্মুক্ততার সঙ্গে দায়িত্ববোধ ও শৃঙ্খলাও থাকতে হবে।

সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন শৃঙ্খলার নামে উন্মুক্ততার দরজাটিই বন্ধ করে দেওয়া হয়।

আজকের বাস্তবতা অবশ্য আগের মতো নয়। শহর বড় হয়েছে, জনসংখ্যা বেড়েছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে। অনেক মসজিদে চুরি হয়েছে, জিনিসপত্র নষ্ট হয়েছে, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরি হয়েছে। কোথাও মসজিদের ভেতর অনাকাঙ্ক্ষিত আড্ডা হয়েছে, কোথাও রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। আবার কোথাও মসজিদকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত বিরোধ বা সামাজিক সংঘাতও তৈরি হয়েছে।

এসব বাস্তবতা মসজিদ কমিটিকে নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের অনেক মসজিদে ইমাম, মুয়াজ্জিন বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সার্বক্ষণিকভাবে উপস্থিত থাকেন না। ফলে মসজিদের দরজা খোলা রাখলে কী ঘটতে পারে—এই আশঙ্কা থেকেই অনেক কমিটি নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে মসজিদ বন্ধ রাখে।

এ সিদ্ধান্তকে এক কথায় ‘ইসলামবিরোধী’ বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি নিরাপত্তার অজুহাতে মসজিদকে প্রায় সারাক্ষণ বন্ধ রাখাকেও আদর্শ ব্যবস্থা বলা যায় না।
কারণ মসজিদ কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি মুসলিম সমাজের ইবাদতের স্থান। কমিটি মসজিদ পরিচালনা করবে, কিন্তু মসজিদের মালিকানাবোধ যেন তাদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি না করে যে, কখন দরজা খুলবে আর কখন বন্ধ হবে—সেটিই কেবল তাদের ইচ্ছার বিষয়।

এখানে আমাদের একটি মৌলিক পার্থক্য বুঝতে হবে—মসজিদ পরিচালনা করা আর মসজিদকে নিয়ন্ত্রণ করা এক বিষয় নয়।

পরিচালনার উদ্দেশ্য হবে মসজিদের পবিত্রতা, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। নিয়ন্ত্রণের মানসিকতা তৈরি হলে মানুষ ধীরে ধীরে মসজিদ থেকে দূরে সরে যেতে পারে।

একজন পথিক হয়তো আজানের অপেক্ষায় মসজিদের বারান্দায় বসতে চেয়েছিলেন। একজন বৃদ্ধ হয়তো কিছুক্ষণ ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিতে চেয়েছিলেন। কোনো তরুণ হয়তো কোরআন পড়তে চেয়েছিলেন। কোনো মানুষ হয়তো জীবনের কোনো কঠিন মুহূর্তে মানুষের ভিড় থেকে দূরে গিয়ে আল্লাহর কাছে কান্না করতে চেয়েছিলেন।

তার জন্য যদি মসজিদের দরজা বন্ধ থাকে, তাহলে আমরা হয়তো একটি দরজা বন্ধ করছি; কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, হয়তো একটি আত্মিক আশ্রয়ের দরজা বন্ধ করছি। এখানেই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির সংকট।

আমরা অনেক সময় মসজিদকে শুধু নামাজের সময়ের সঙ্গে যুক্ত করি। নামাজ শেষ—মসজিদের প্রয়োজন শেষ। অথচ মসজিদের শক্তি শুধু জামাতে নয়; এর শক্তি মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরি করার মধ্যেও।

একটি আদর্শ মসজিদ হতে পারে শিশুদের কোরআন শিক্ষার জায়গা, তরুণদের নৈতিক শিক্ষা ও দিকনির্দেশনার জায়গা, বয়স্কদের আত্মিক প্রশান্তির জায়গা এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের আশ্রয়ের জায়গা। সেখানে বই পড়ার ব্যবস্থা থাকতে পারে, ইসলামি জ্ঞানচর্চার আয়োজন থাকতে পারে, সামাজিক সচেতনতা তৈরি হতে পারে। অবশ্যই এসব কার্যক্রম মসজিদের পবিত্রতা ও মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

আমাদের গ্রামীণ সমাজে এখনো অনেক মসজিদ স্থানীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। সেখানে মানুষ পরস্পরের খোঁজখবর নেয়, দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ায়, দান-সদকা সংগ্রহ করে এবং সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ করে। কিন্তু শহুরে জীবনে মসজিদের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। এটি শুধু মসজিদের সংকট নয়; এটি সমাজেরও সংকট।

আমরা যদি মসজিদকে কেবল তালাবদ্ধ একটি স্থাপনা বানিয়ে ফেলি, তাহলে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে মসজিদের সম্পর্কও একসময় আনুষ্ঠানিক হয়ে যেতে পারে। অথচ মসজিদ হওয়া উচিত এমন একটি জায়গা, যেখানে একজন শিশু প্রথম আল্লাহর ঘরের সঙ্গে পরিচিত হবে, একজন তরুণ নৈতিক শক্তি খুঁজে পাবে এবং একজন বৃদ্ধ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে শান্তি অনুভব করবেন। তাই সমাধানও হতে হবে বাস্তবসম্মত।

মসজিদ ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখতেই হবে—এমন কথা বলা হচ্ছে না। বরং প্রতিটি মসজিদের স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নামাজের সময়ের বাইরেও নির্দিষ্ট কিছু সময় মসজিদ উন্মুক্ত রাখা যেতে পারে। সিসিটিভি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক বা পালাক্রমে দেখভালের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

মসজিদ কমিটি, ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং স্থানীয় মুসল্লিদের মধ্যে আলোচনা করে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করা যেতে পারে—কখন মসজিদ খোলা থাকবে, কী ধরনের কর্মকাণ্ড করা যাবে, কী করা যাবে না এবং কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। কারণ দরজা খোলা মানেই বিশৃঙ্খলা নয়; আবার দরজা বন্ধ মানেই শৃঙ্খলা নয়।

শৃঙ্খলা মানুষের আচরণে তৈরি হয়, তালায় নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, মসজিদ কোনো কারাগার নয়। আবার এটি এমন কোনো উন্মুক্ত স্থানও নয়, যেখানে যার যা ইচ্ছা তাই করা যাবে। মসজিদ হলো পবিত্রতা, ইবাদত, জ্ঞান, মানবিকতা ও আত্মশুদ্ধির কেন্দ্র।

তাই মসজিদের দরজায় তালা লাগানোর আগে আমাদের একবার ভাবতে হবে—তালাটি কি সত্যিই নিরাপত্তার জন্য, নাকি আমাদের মানসিকতার ওপরও একটি তালা পড়ে গেছে?

মসজিদের সৌন্দর্য শুধু তার গম্বুজে নয়, শুধু তার মিনারে নয়, শুধু তার কারুকাজেও নয়। মসজিদের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই প্রকাশ পায়, যখন একজন মানুষ সেখানে গিয়ে নিজেকে আল্লাহর কাছে নিরাপদ মনে করেন।

একজন পথহারা মানুষ সেখানে এসে পথ খুঁজে পান। একজন অপরাধী তওবার সাহস পান। একজন দুঃখী মানুষ চোখের পানি ফেলতে পারেন। একজন জ্ঞানপিপাসু মানুষ শিক্ষা পান। আর একজন সাধারণ মুসলমান কয়েক মুহূর্তের জন্য পৃথিবীর সব কোলাহল থেকে মুক্তি পান। সেই মুক্তির জায়গাটিকে যেন আমরা তালার সংস্কৃতিতে বন্দী না করি।

মসজিদকে তাই দেখতে হবে তার ইতিহাস দিয়ে, তার উদ্দেশ্য দিয়ে এবং তার আত্মা দিয়ে। নিরাপত্তা থাকবে, শৃঙ্খলা থাকবে, পবিত্রতা থাকবে—কিন্তু মানুষের জন্য দরজাটিও থাকবে। কারণ মসজিদ কখনোই ‘লকড কারাগার’ হওয়ার কথা নয়।

মসজিদ হলো সেই দরজা, যেখান দিয়ে মানুষ পৃথিবীর অস্থিরতা পেরিয়ে তার সৃষ্টিকর্তার কাছে ফিরে আসে।

লেখক পরিচিতি: সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : জলাবদ্ধতার চেয়েও বড় সংকট বিশ্বাসের

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন