বিজ্ঞাপন

অনলাইন জুয়ার এজেন্ট শামীম মেহেরপুরে গ্রেপ্তার

অনলাইন জুয়ার এজেন্ট এবং সাইবার সুরক্ষা আইনে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি শামীম রেজাকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। বুধবার (১৯ আগস্ট) রাত সাড়ে ৭টার দিকে মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার কোমরপুর গ্রামে নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

শামীম রেজার বিরুদ্ধে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে মেহেরপুরে দুটি এবং ঢাকার সিআইডিতে আরও তিনটি মামলা চলমান রয়েছে। এ ছাড়া সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার তার বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিংয়ের একাধিক অভিযোগে তদন্ত করছে বলে ঢাকা সিআইডির সূত্র প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছে।

গ্রেপ্তারের বিষয় নিয়ে মেহেরপুর জেলা গোয়েন্দা শাখার ওসি প্রদীপ কুমার সানার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি একটি সাক্ষীর কারণে বর্তমানে মেহেরপুরের বাইরে রয়েছি। তবে আমার টিম একজন এজেন্টকে গ্রেপ্তার করেছে এ কথা শুনেছি। কাকে কী কারণে কোথা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এটা তদন্ত ও যাচাই-বাছাই শেষে আগামীকাল অফিসিয়াল প্রেস রিলিজের মাধ্যমে আপনাকেসহ সব গণমাধ্যম কর্মীকে জানিয়ে দেওয়া হবে।

এর আগে অনুসন্ধানে উঠে আসে, হঠাৎ করে শামীম রেজার আর্থিক উত্থানের ভয়ংকর তথ্য। শামীম রেজার বাবা সাহজুল সর্দার ওরফে বিলু সর্দার ২০০০ সালের দিকে ৫ থেকে ১০ টাকার বিনিময়ে মহাজনপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ভিসিআর দিয়ে সিনেমা প্রদর্শন করতেন। এরপর ২০১৬ সালে একটি রাইসমিল স্থাপন করে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। রাইসমিলের দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন ছেলে শামীম।

প্রায় তিন বছর রাইসমিলের ব্যবসা করার পর চাচাতো ভাই রাজুর সহযোগিতায় জামান মাস্টার নামে এক ব্যবসায়ীর মাধ্যমে অনলাইন জুয়া পরিচালনার একটি ‘ওয়ান এক্স বেট মাস্টার’ চ্যানেল সংগ্রহ করেন শামীম। এর মাধ্যমে শুরু হয় তার অনলাইন জুয়ার ব্যবসা। এসব লেনদেন ও অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে জামান মাস্টারের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং পয়েন্ট ব্যবহার করা হতো বলে অভিযোগ ওঠে।

এক বছরের মধ্যে শামীম আরও দুটি ‘মেল বেট’ চ্যানেলের মালিক হন। এর প্রায় ছয় মাস পর রাশিয়া থেকে পরিচালিত ‘লাইন বেট’ -এর সহকারী কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। এরপর দ্রুত বাড়তে থাকে তার অনলাইন জুয়ার ব্যবসার পরিধি।

অবৈধ অনলাইন জুয়া পরিচালনার জন্য নিজস্ব নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন শামীম। সাহেবপুর গ্রামের রতনকে ব্যক্তিগত ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় কয়েকজনের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার চ্যানেল পরিচালনা শুরু করেন। সিআইডির একটি সূত্রের দাবি, সাহেবপুর গ্রামের রতন ও শাহীন বর্তমানে ঢাকায় থেকে শামীমের কয়েকটি অনলাইন জুয়ার চ্যানেল পরিচালনা করছেন। সূত্রটির দাবি, বর্তমানে শামীমের মোট চ্যানেলের সংখ্যা ১৪টি।

স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা যায়, অনলাইন জুয়ার ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার পর অল্প সময়েই শামীমের সম্পদের পরিমাণ বাড়তে থাকে। পৈতৃক বাড়ি সংস্কারের পাশাপাশি আরও দুটি বহুতল বাড়ির মালিক হয়েছেন তিনি। বর্তমানে যে বাড়িতে বসবাস করেন, সেটির পাইলিং করতেই দুই কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। বাড়িটির নিচে রয়েছে দুই তলা আন্ডারগ্রাউন্ড এবং ওপরে আরও তিন তলা।

বাড়ির পাশে থাকা একটি আমবাগানের অর্ধেকও শামীম কিনে নিয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। কোমরপুর গ্রামে প্রথম হার্ডওয়্যারের ব্যবসা শুরু করার সময় প্রায় দুই কোটি টাকার মালামাল তুলেছিলেন তিনি। এরপর অল্প সময়ের মধ্যে শুধু কোমরপুর গ্রামেই প্রায় ২৫ বিঘা জমি কিনেছেন বলে এলাকাবাসীর দাবি।

এ ছাড়া সাহেবপুর গ্রামে শ্বশুর ও স্ত্রীর নামে অনেক জমি কেনার অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়টি এখনো সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিপুল অর্থের মালিক হওয়ার পর শামীম টাকার প্রভাবে এলাকায় মাদক ব্যবসা ও নারী কেলেঙ্কারিতেও জড়িয়ে পড়েছেন। নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কোমরপুর গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, কিছুদিন আগে শামীমের একটি অনলাইন জুয়া চ্যানেলের এক পার্টনারকে অস্ত্র মামলায় ফাঁসিয়ে তার টাকা ও চ্যানেল আত্মসাৎ করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শামীমকে গ্রেপ্তারে মেহেরপুরে তিনবার অভিযান পরিচালনা করেছিল ঢাকার অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে প্রতিবারই তিনি গ্রেপ্তার এড়িয়ে যান। স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ নেতা আমাম হোসেন মিলুর ছত্রছায়ায় থাকার কারণে প্রতিবারই শামীম রক্ষা পেয়েছেন। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই তিনি খোলস পাল্টে ভিন্ন মতাদর্শের একজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়ায় চলে যান বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি ঢাকায় অভিযান চালিয়ে শামীমের দুটি অনলাইন জুয়ার চ্যানেল শনাক্ত করেছে সিআইডি। চ্যানেল দুটি রোজ ফ্যাশনের মাসুদের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনা করতেন শামীম। ঢাকায় থেকে চ্যানেল দুটি পরিচালনা করতেন সুমন ও শামীমের চাচাতো ভাই সাদ্দাম। সিআইডির অভিযানে সুমন গ্রেপ্তার হলেও সাদ্দাম ও শামীম গ্রেপ্তার এড়িয়ে যান।

ওই দুটি চ্যানেল উদ্ধারের ঘটনায় সিআইডির পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলায় সাদ্দামকে এক নম্বর, শামীমকে দুই নম্বর এবং সুমনকে তিন নম্বর আসামি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে শামীমের বিরুদ্ধে মেহেরপুরে দুটি মামলাসহ ঢাকার সিআইডিতে আরও তিনটি মামলা চলমান রয়েছে। এ ছাড়া সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার তার বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিংয়ের তদন্ত করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, অবৈধভাবে অনলাইন জুয়ার এজেন্ট হিসেবে উপার্জিত অর্থের মাধ্যমেই দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলকে ‘ম্যানেজ’ করে চলছিলেন শামীম।

বুধবার রাতে নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে শামীম রেজাকে গ্রেপ্তারের পর কোমরপুরসহ মেহেরপুরে তার অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক, বিপুল সম্পদ, অর্থের উৎস এবং দেশ-বিদেশে আর্থিক লেনদেন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : জীবননগর সীমান্ত দিয়ে ভারতীয়সহ ৫ জনকে পুশইন করেছে বিএসএফ

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন