বর্ষা এলেই যেন অন্য এক রূপ নেয় পাবনার চাটমোহরের ডিকশি বিল। বিস্তীর্ণ জলরাশির বুকজুড়ে সবুজ পদ্মপাতা, তার ফাঁকে ফাঁকে ফুটে থাকা গোলাপি ও সাদা পদ্ম-শাপলা। ডিঙি নৌকায় চড়ে বিলের ভেতর ঘুরে বেড়ান প্রকৃতিপ্রেমীরা। পরিবার-পরিজন ও প্রিয়জনদের নিয়ে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন দর্শনার্থীরা। কিন্তু এবার সেই চেনা সৌন্দর্যে ভাটা পড়েছে। পদ্মবিলে আছে পদ্মপাতা, আছে সবুজের সমারোহ নেই কাক্সিক্ষত পদ্ম ও শাপলার ফুল।
পাবনা জেলার অন্যতম বড় বিল ডিকশি। চাটমোহর উপজেলার ফৈলজানা ও পার্শ্বডাঙ্গা ইউনিয়নের প্রায় ১৫টি গ্রামজুড়ে বিস্তৃত এই বিল বর্ষায় পানিতে ভরে ওঠে। বর্ষা শেষে পানি কমে গেলে বিলের বিস্তীর্ণ অংশে চাষাবাদ শুরু করেন স্থানীয় কৃষকেরা। আর বর্ষাকালে বিলটি হয়ে ওঠে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এক অনন্য স্থান।

স্থানীয়দের কাছে ডিকশির বিল নামে পরিচিত হলেও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এটি ‘পদ্ম বিল’ হিসেবেই বেশি পরিচিত। প্রতিবছর বর্ষায় প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া পদ্ম, শাপলা ও শালুকের সমারোহে বিলটি হয়ে ওঠে দৃষ্টিনন্দন। পানির ওপর সারি সারি পদ্মপাতা আর তার মাঝখানে ফুটে থাকা ফুলের সৌন্দর্য দেখতে ভিড় করেন বিভিন্ন এলাকার মানুষ।
তবে চলতি বর্ষায় সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। বিলে অন্যান্য বছরের মতো পর্যাপ্ত পানি আসেনি। বিলের কিছু অংশে পানি থাকলেও বেশিরভাগ জায়গায় পানি অগভীর। কোথাও কোথাও পানি ও জলজ উদ্ভিদের ঘনত্ব এত বেশি যে নৌকা চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। পদ্মপাতা দেখা গেলেও ফুলের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম। ফলে প্রত্যাশা নিয়ে পদ্মবিলে আসা অনেক দর্শনার্থী এবার হতাশ হচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগের বছরের পদ্মফুলে ভরা বিলের ছবি ও ভিডিও দেখে যারা এখানে আসছেন, তারা বাস্তবে এসে পাচ্ছেন ভিন্ন চিত্র।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক বছর ধরেই ডিকশি বিলে পদ্ম-শাপলার বিস্তৃতি কমছে। বিলে সেচ, ক্ষতিকর জাল ও যন্ত্র দিয়ে মাছ ধরা, জলজ উদ্ভিদের গোড়া ও লতা নষ্ট হওয়া, পানিদূষণ এবং কৃষিজমি থেকে সার ও কীটনাশক পানির সঙ্গে বিলে মিশে যাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন তাঁরা। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘ সময় পর্যাপ্ত পানি না থাকাও পদ্ম-শাপলার স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধা দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ডিকশি বিলপাড়ের বাসিন্দা ও ডিঙি নৌকার মাঝি শাহাদাত বলেন, বছরের অন্য সময় তিনি কৃষিকাজ করেন। বর্ষায় কৃষিকাজ কমে যাওয়ায় নৌকা চালিয়ে বাড়তি আয় করেন। প্রতিবছর পদ্মফুল ফুটলে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ে। ২০০ থেকে ৩০০ টাকা ভাড়ায় ডিঙি নৌকা নিয়ে মানুষ বিল ঘুরে দেখেন।
তিনি আরো বলেন, ‘আগে বর্ষা এলেই মানুষ নৌকা নিয়ে বিলে ঘুরতে আসত। ফুলের সৌন্দর্য দেখত, ছবি-ভিডিও করত। এবার পদ্মফুল অনেক কম। তাই নৌকা ভাড়াও কমে গেছে। আমাদের আয়েও এর প্রভাব পড়েছে।’
আরেক মাঝি আব্দুর রহিম বলেন, পদ্ম-শাপলার সৌন্দর্য দেখতে মানুষ এখানে আসে। বর্ষায় অন্য কাজ কম থাকায় নৌকা চালিয়ে বাড়তি আয় করেন নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ। কিন্তু ফুল না থাকলে দর্শনার্থী কমে যায়। এতে তাঁদের আয়ও কমে যায়।
চাটমোহর থেকে পদ্ম বিল দেখতে আসা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বিলে সেচ দেওয়ার সময় এবং ক্ষতিকর যন্ত্র দিয়ে মাছ ধরার কারণে পদ্ম-শাপলার মূল ও লতা নষ্ট হচ্ছে। ফলে প্রতিবছরই এসব জলজ ফুলের সংখ্যা কমছে। দর্শনার্থীদের মধ্যেও সচেতনতার অভাব রয়েছে। অনেকে ফুল ও কলি ছিঁড়ে নিয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে ফুলের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সজীব বলেন, আশপাশের কৃষিজমিতে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারের পর বৃষ্টির পানির সঙ্গে সেসব রাসায়নিক বিলে চলে আসে। এতে পানির স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও খরাপ্রবণ আবহাওয়ার কারণেও পদ্ম-শাপলার স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
পার্শ্বডাঙ্গা ইউনিয়নের মোহাম্মদ আলী বলেন, বছরে তিন থেকে চার মাস ডিকশি বিলে পানি থাকে। এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিতভাবে পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এতে স্থানীয় মাঝি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে।
তিনি বলেন, বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট না করে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে এটি চাটমোহরের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে। তবে তার আগে বিলের জীববৈচিত্র ও জলজ উদ্ভিদ রক্ষা করতে হবে।
পাবনা থেকে ঘুরতে আসা গোলাম রাব্বি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও দেখে এবং বন্ধুদের কাছ থেকে পদ্ম বিলের সৌন্দর্যের কথা শুনেই তিনি এখানে এসেছেন। গজারিয়া ব্রিজ এলাকা থেকে ডিঙি নৌকা ভাড়া করে বিলের মাঝখানে গিয়ে দেখেছেন, পদ্মপাতা থাকলেও ফুল খুব কম। তবে বিলের বিস্তীর্ণ সবুজ প্রকৃতি তাঁকে মুগ্ধ করেছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, শুকনো মৌসুমে বিলের জমিতে ফসল চাষ এবং বর্ষায় মাছ ধরা ও নৌকা চালানোর মাধ্যমে স্থানীয় মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন। তাই বিলের পরিবেশ রক্ষা করা গেলে স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি পর্যটনেরও বিকাশ ঘটতে পারে।
স্থানীয়দের দাবি, ডিকশি বিলকে শুধু দর্শনীয় স্থান হিসেবে দেখলে হবে না এর জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। বিলে ক্ষতিকর জাল ও যন্ত্রের ব্যবহার বন্ধ, পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা, জলাশয় ভরাট রোধ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং দর্শনার্থীদের সচেতন করার পাশাপাশি পদ্ম-শাপলা সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুসা নাসের চৌধুরী বলেন, ডিকশি বিল উপজেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক জলাভূমি। বিলের পদ্ম, শাপলা ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। চায়না জালের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। পাশাপাশি মাছ ধরার সময় যাতে পদ্ম-শাপলার গোড়া ও লতা নষ্ট না হয়, সেদিকেও মাঝি ও জেলেদের খেয়াল রাখতে হবে।
তিনি আরো বলেন, অনেক দর্শনার্থী সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে পদ্মের ফুল ও কলি তুলে নেন। এতে জলজ উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। তাই দর্শনার্থীদের ফুল না তোলা, পানিতে ময়লা না ফেলা এবং বিলের পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ না করার আহ্বান জানান তিনি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে ডিকশি বিলকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগানো যেতে পারে বলেও জানান ইউএনও।
পড়ুন : পর্ব-১: টাঙ্গাইলে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার


