বিজ্ঞাপন

নানা সংকটে বিপন্ন হাকালুকি: ধ্বংসের মুখে জীববৈচিত্র্য, প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি

শীতে অতিথি পাখির আগমন আর বর্ষায় দেশীয় মাছের প্রজননে মুখর হয়ে ওঠে হাকালুকি হাওর। কিন্তু পাখি শিকার, প্রজনন মৌসুমে মাছ নিধন, পাখির আবাস্থল সংকট ও পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে হুমকির মুখে পড়ছে এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ এই জলাভূমির জীববৈচিত্র্য।

বিজ্ঞাপন

বড়লেখা জুড়ী ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ ইসি এলাকায় জুড়ে ১৮ হাজার ৩৮২ হেক্টর হাওরের অবস্থান। কিন্তু এখানে পাখির কোন অভয় আশ্রম নেই।

শীতকালে লেঞ্জা হাঁস,পাতি সরালি,পিয়াং হাঁস, পান্তামুখী, কাদাখোঁচাসহ বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এ সময় জাল, ফাঁদ ও বিষটোপ ব্যবহার করে পাখি শিকার করা হয়।

অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে মাছের প্রজননকালে নিষিদ্ধ ও অবৈধ জাল দিয়ে প্রকাশ্যে দিবালোকে ডিমওয়ালা মাছ, রেণু ও পোনা ধরা হয়। এতে হাওরের দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য হুমকিতে পড়ছে।

২০২১ সালে ইজারাদারের লোকজন বিলের বাধ নির্মানের নামে পরিবেশ অদিদপ্তর ও প্রাকৃতিক জলজ বনের হাকালুকির মালাম বিলে প্রায় ২০ হাজার জলজ বৃক্ষ হিজল,করছ ও বরুন গাছসহ বিভিন্ন গাছ কাঠা হয়
পরিবেশ সচেতনদের মতে, হিজল,করচ,বরুণসহ জলজ উদ্ভিদ হাওরের পাখির নিরাপদ আশ্রয় ও প্রজননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

হাল্লা এলাকায় মনোহর আলী মাস্টারের বসতবাড়িতে বিভিন্ন প্রজাতির হাজার হাজার পাখি পুরো বছর থাকে। পাখির ময়লায় এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে এটিকে পাখি বাড়ি বলে। এ বাড়িটির পরিবেশের দূষণ থেকে রক্ষার ও পাখির অভয় আশ্রম করা জরুরি। এ পাখি বাড়ি ও ওয়াচ টাওয়ারকে কেন্দ্র করে অনেক পর্যটক হাকালুকিতে হাওরে আসে।

হাকালুকি হাওরে অতিথি ও দেশীয় পাখির নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ বিল ও পাখির বিচরণক্ষেত্রগুলোকে অভয়াশ্রমের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন হাকালুকি হাওর রক্ষা কমিটির মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সদস্য আব্দুল হাফিজ চৌধুরী। তিনি বলেন, অভয়াশ্রম গড়ে তোলা হলে পাখি শিকার বন্ধে কার্যকর নজরদারি ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

পরিবেশ সচেতনদের মতে, পাখির অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা হলে শিকার ও বিরক্ত করা বন্ধের পাশাপাশি পাখির নিরাপদ খাবার, বিশ্রাম ও প্রজননের সুযোগ নিশ্চিত হবে। এতে পাখির সংখ্যা ও প্রজাতির বৈচিত্র্য বাড়বে, হাওরের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে এবং পর্যটনের সম্ভাবনাও বাড়বে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. ফেরদৌস আহম্মেদ বলেন, একসময় হাকালুকি হাওরে প্রায় ২০০ প্রজাতির পাখির বিচরণ থাকলেও বর্তমানে তা অনেক কমেছে। নির্বিচারে গাছপালা নিধনে পাখির আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে। পাখির নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করতে হাওরপাড় ও চরাঞ্চলে পাখিবান্ধব গাছ লাগানোসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

পরিবেশ অধিদপ্তর মৌলভীবাজারের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম বলেন, হাকালুকি হাওরে বর্তমানে অধিদপ্তরের কোনো প্রকল্প নেই। জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত হাওর পরিদর্শন ও নজরদারি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মৌলভীবাজারে একাই দায়িত্ব পালন করায় বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকা লাগে।

মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তোহিদুজ্জামান পাভেল জানান, হাকালুকি হাওরে মাছের অভয়াশ্রমের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় জনগনের সহযোগিতায় পাখির অভয়াশ্রম করার পরিকল্পনা রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, বড়লেখা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে বিস্তৃত হাকালুকি হাওরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হলে পাখি ও মাছ শিকার বন্ধের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

সচেতন মহলের মতে, মাছের প্রজনন মৌসুমে শিকার বন্ধ, শীতকালে পাখি শিকার রোধ, পাখির অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা, বৃক্ষরোপণ ও নিয়মিত নজরদারি জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত অভিযান নিশ্চিত করা গেলে হাকালুকি হাওর ফিরে পেতে পারে তার হারানো জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

পড়ুন : পরিবহন সংকটে নাকাল চট্টগ্রাম, যাত্রীদের ভোগান্তি

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন