রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার দুই সন্দেহভাজনের একজনের পরনের শার্ট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে। মরদেহ উদ্ধারের দিন একই ধরনের শার্ট পরা এক পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখা যাওয়ায় এ নিয়ে নানা প্রশ্নও উঠেছে।
রংপুরের বিভিন্ন স্থানীয় ফেসবুক পেজে প্রচারিত লাইভ ভিডিওতে দেখা যায়, মরদেহ উদ্ধারের সময় একজন ব্যক্তি ওই ধরনের শার্ট পরে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছেন। তার মুখে মাস্ক ছিল। এ বিষয়ে ওই কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, একই শার্ট আলাদা আলাদা লোক পরতেই পারেন।
চার হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নামে দুজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের বাড়িও মাছুয়াপাড়ায়। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর ভবনটিতে বসে তারা ইয়াবা সেবন করেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান টের পেয়ে আটক দুজনের একজন পার্শ্ববর্তী রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তুতবাগানে গিয়ে লুকিয়ে পড়েন। পরে তুতবাগানের পাশের দখীগঞ্জ শ্মশান থেকে তাকে আটক করা হয়।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের তদন্তে যুক্ত কর্মকর্তাদের পরিচয় নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে। চার খুনের তদন্তে যুক্ত সিআইডির ইনচার্জ, মরদেহ উদ্ধারে নেতৃত্ব দেওয়া উপ-কমিশনার এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা—তিনজনই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। গ্রেপ্তার দুই সন্দেহভাজনও একই ধর্মের অনুসারী।
তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি নিছক কাকতালীয় এবং ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে তদন্তের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি।
শনিবার সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার দুই যুবক হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ জানান, বৃহস্পতিবার রাতে তারা এক মাদক কারবারির কাছ থেকে ইয়াবা কিনে সীমান্ত নামে এক ব্যক্তির বাসায় বসে সেবন করেন। পরে রাতের শেষ দিকে দেবু নামে এক ব্যক্তির নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ থেকে তারা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান। সেখানে ইয়াবা সেবনের সময় শব্দ হলে গণপতি চক্রবর্তী খালি গায়ে ও গলায় গামছা নিয়ে ছাদে আসেন।
তবে পুলিশের এই বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ইয়াবা সেবনের জন্য পাশের নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনের পুরো ফাঁকা জায়গা ও ছাদ থাকার পরও তারা কেন গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে গেলেন—সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনারের কাছে এমন প্রশ্ন করা হয়।
জবাবে পুলিশ কমিশনার বলেন, অল্প সময়ে মামলার তদন্তে যতটুকু অগ্রগতি হয়েছে, তাতে তিনি সন্তুষ্ট। একই সঙ্গে পুলিশের ইতিবাচক কাজের প্রশংসা এবং নেতিবাচক কাজের সমালোচনা করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি তদন্তে আস্থা রাখার কথাও বলেন তিনি।
রোববার বিকেল ৫টার দিকে গ্রেপ্তার দুই যুবককে আদালতে হাজির করা হয়। মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি।
তিনি বলেন, দুই যুবক আদালতে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা নিজেদের দায় স্বীকার করায় তাদের আর রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।
এ ঘটনায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী রোববার কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
তবে গ্রেপ্তার দুই যুবকের স্বীকারোক্তি, ঘটনাস্থল এবং হত্যাকাণ্ডের সময় তাদের গতিবিধি নিয়ে ওঠা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর তদন্তে কতটা পরিষ্কার হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।


