বিজ্ঞাপন

অপহরণ: ‘শুটার শামীম’ বাহিনীর বিরুদ্ধে মামলা, নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাব?

নেত্রকোনার দুর্গাপুরে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণের দাবিতে শফিকুল ইসলাম (৩৫) নামের এক যুবককে অপহরণের ঘটনায় শীর্ষ সন্ত্রাসী শামীম আহমেদ ওরফে ‘শুটার শামীম’ ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। অপহৃতের বড় ভাই মো. ফারুক আহমদের (৪৮) দায়ের করা চাঁদাবাজি ও অপহরণ মামলায় শুটার শামীমসহ আট জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত আরও সাত-আট জনকে আসামি করা হয়েছে। ডিআইজির নির্দেশে দুর্গাপুর থানা পুলিশ মামলাটি গ্রহণ করেছে বলে জানায় পুলিশ।

মামলার এজাহারনামীয় অন্য আসামিরা হলেন- খোকন মিয়া (৩০), সোহেল ওরফে চাকু সোহেল (৩৫), আবু ইমরান (৪০), মামুন মিয়া (৩০), জোনায়েদ মিয়া (৩২), রবিন মিয়া (৩৭) এবং সিদ্দিক মিয়া (৩০)।

অন্যদিকে মামলার বাদী হলেন- উপজেলার খুজিউড়া গ্রামের মৃত রজমান আলীর ছেলে মো. ফারুক আহমেদ (৪৮)।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দুপুরের দিকে দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার (২৪ আগস্ট) রাত আনুমানিক ১০টার দিকে শিবগঞ্জ বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলেন শফিকুল। পশ্চিম খুজিউড়া এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে পৌঁছালে আগে থেকে ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা তার পথরোধ করে। এ সময় মামলার প্রধান আসামি শুটার শামীম ও চাকু সোহেল জোরপূর্বক শফিকুলের মুখ চেপে ধরে। পরে খোকন মিয়ার চালানো মোটরসাইকেলে করে তাকে অজ্ঞাত স্থানে তুলে নিয়ে যায় অপহরণকারীরা।

অপহরণের পর শফিকুলকে ধোবাউড়া থানাধীন রণসিংহপুর বাজারে আটকে রেখে হত্যার হুমকি দিয়ে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে শুটার শামীম। একপর্যায়ে ধোবাউড়া থানার টহল পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে শফিকুলকে ফেলে পালিয়ে যায় অপহরণকারীরা। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।

বাদীর অভিযোগ, আসামিরা এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী ও মানব পাচারকারী চক্রের সদস্য। ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাস হওয়ায় তারা দীর্ঘদিন ধরে চোরাচালানসহ নানা অপরাধে জড়িত। তাদের এসব অপকর্মের প্রতিবাদ করায় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য পাচারের সন্দেহে তারা এর আগেও শফিকুলকে একাধিকবার প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছিল।

ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, “ডিআইজি স্যারের নির্দেশে শুটার শামীমের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা রুজু করা হয়েছে। তবে এখনও কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইতোপুর্বে শুটার শামীমের বিরুদ্ধে দুই ডজনের বেশি মামলা রয়েছে। তবে কয়েকটি মামলা থেকে সে খালাসও পেয়েছে। এলাকাবাসীর কাছে আতঙ্কের অপর নাম শামীম আহমেদ ওরফে শুটার শামীম। অবৈধ অস্ত্রসহ ইতিপূর্বে র‍্যাবের হাতেও গ্রেফতার হয়েছিল সে।

স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সাথে কথা বলে জানা যায়, দুর্গাপুরের কুল্লাগড়া ইউনিয়নসহ সীমান্তবর্তী এলাকার পুরো চোরাচালান নেটওয়ার্ক এখন শামীমের দখলে। ভারত থেকে অবৈধভাবে আসা মাদক, কম্বলসহ বিভিন্ন পণ্যের চোরাকারবার তার ইশারায় পরিচালিত হয়। এই সিন্ডিকেটের বাইরে গিয়ে কেউ ব্যবসা করার চেষ্টা করলে বা শামীমের অবাধ্য হলে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া বা আটকে রাখার মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছে সে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুর্গাপুরের একাধিক ব্যক্তি জানান, শুটার শামীম দুর্গাপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কুল্লাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়ালের ভাই। প্রভাবশালী এই রাজনৈতিক নেতার ভাই হওয়ায় এলাকায় সে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। শামীমের এসব অপকর্ম ও বেপরোয়া চলাফেরার বিষয়টি তার ভাই আব্দুল আউয়াল জানলেও তিনি কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। অনেকেই মনে করছেন, ভাইয়ের রাজনৈতিক প্রভাবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেই শামীম তার আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে।

শামীমের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন জানান, “চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল, বদিউজ্জামান বদি এবং শামীম আহমেদ (শুটার শামীম)- এই তিন ভাইয়ের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা রয়েছে। এরমধ্যে রাজনৈতিক মামলা রয়েছে বড়জোর ১০টির মতো। বাকিগুলো বিস্ফোরক, চোরাচালান, অপহরণ ও হত্যা মামলা। শুধু শামীমের বিরুদ্ধেই কাওসার, সুব্রত এবং দাউদ মজিবরসহ তিনটি হত্যা মামলা রয়েছে। ২০১৯ সালে কাওসার হত্যার মধ্য দিয়ে কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরে হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতি তৈরি করে সে। পরবর্তীতে ২০২২ সালে র‍্যাব তাকে গ্রেপ্তারও করেছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর তাদের বেশ কিছু রাজনৈতিক মামলা মওকুফ করা হয়েছিল, তবে সব মিলিয়ে তিন ভাইয়ের নামে এখনো শতাধিক মামলা রয়েছে।”

মামলার বিষয়টি জানতে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়ালের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি বর্তমানে ময়মনসিংহে অবস্থান করছি। কে কাকে অপহরণ করেছে বা কেন মামলা হয়েছে, সে বিষয়ে আমি আগে থেকে কিছুই জানি না। আমার ভাই আসলেই এমন কোনো অপরাধের সাথে যুক্ত কি না, নাকি এটি একটি সাজানো ও মিথ্যা মামলা, সে বিষয়েও আমি নিশ্চিত নই।”

অভিযুক্ত শামীমের সাথে নিজের সম্পর্কের বিষয়টিও প্রতিবেদকের কাছে স্পষ্ট করেন এই জনপ্রতিনিধি। তিনি বলেন, “আমার মায়ের মৃত্যুর পর বাবা আমার আপন খালাকে বিয়ে করেন। সেই হিসেবে সে (শামীম) আমার সৎ ভাই আবার খালাতো ভাই।”

পুলিশ ও আদালত সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চিহ্নিত শুটার শামীমের বিরুদ্ধে নেত্রকোনার দুর্গাপুর থানায় হত্যা, হত্যাচেষ্টা, বিস্ফোরক দ্রব্য আইন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন এবং বিশেষ ক্ষমতা আইনে অন্তত ২৪টি মামলা তালিকাভুক্ত রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক মামলা (২০২৩ সালের ৯ জুন, ২৬ মার্চ এবং ১৮ জানুয়ারি দায়েরকৃত), যেগুলোতে বর্তমানে তার বিচার চলমান রয়েছে। এছাড়া ২০১৯ সালের ১৭ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হলেও সেটি থেকে সে খালাস পেয়েছে। অন্যদিকে, ২০১৫ ও ২০১৮ সালে দায়ের করা বিশেষ ক্ষমতা আইন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের একাধিক মামলা আদালতে বিচারাধীন।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : বিএনপি কোনোদিন পোষ্য বিরোধী দল পাবে না: সারজিস আলম

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন