বিজ্ঞাপন

বিবিসির বিশ্লেষণ: তারেক রহমানকে দিল্লি নিতে মরিয়া কেন ভারত?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লি সফরে নিতে জোরালো আগ্রহ দেখাচ্ছে ভারত। বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে নয়াদিল্লি। তবে গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার দেশত্যাগ করে ভারতে অবস্থান এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করেছে।

বিজ্ঞাপন

চলতি মাসের শুরুতে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে একটি ই-মেইল পাঠানো হয়। এতে সপ্তাহের শেষ দিকে রাষ্ট্রপতি ভবনে অনুষ্ঠেয় ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান বাতিলের কথা জানানো হয়েছিল। ই-মেইল থেকে ধারণা পাওয়া যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ওই অনুষ্ঠানের মহড়া চলছিল।

তবে সে সময় তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ই-মেইলটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এরপরও ঘটনাটি তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে জল্পনা আরও বাড়িয়ে দেয়।

তারেক রহমান এখনো ভারত সফরে সম্মতি দেননি। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এএএম সালেহ জানিয়েছেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বড় জয় পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন এবং দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। তিনি এখনো সেখানেই অবস্থান করছেন।

শেখ হাসিনার পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে। এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে উদ্যোগী হয়েছে দিল্লি।

তবে ভারতের জন্য বড় অস্বস্তির বিষয়গুলোর একটি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ। বাংলাদেশ তাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করেছে। গণঅভ্যুত্থানের সময় বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশের একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। এসব অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেছেন শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এএম সালেহ জানিয়েছেন, ঢাকা অনুকূল পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছে এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ভারতের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের অনুরোধটি তারা বিবেচনা করছে।

কেন তারেক রহমানকে কাছে চাইছে দিল্লি

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ বাড়ানোর পেছনে ভারতের একাধিক কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ভাষা ও সংস্কৃতির ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। গত বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল, যার বড় অংশই ভারতের রপ্তানি।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে দুই দেশ সড়ক, রেল ও বন্দর ব্যবহারের সুযোগ সম্প্রসারণ করেছিল। এতে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দেশটির মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ এবং পণ্য পরিবহন সহজ হয়।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও হাসিনা সরকারের সঙ্গে দিল্লির ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ছিল। বাংলাদেশে অবস্থান করা ভারতের কথিত বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধেও অভিযান চালিয়েছিল তৎকালীন সরকার।

তবে শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাংলাদেশে ধীরে ধীরে বিতর্কের জন্ম দেয়। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, দিল্লি গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগের চেয়ে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

হাসিনার অবস্থান নিয়ে অস্বস্তি

ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা এখনো বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। ৫ আগস্ট দিল্লিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি ভার্চুয়ালি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার কথা জানান এবং তারেক রহমানের সরকারের বিরুদ্ধে তার সমর্থকদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ তোলেন।

হাসিনাকে ভারতে বসে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় ঢাকা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।

তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই অনুষ্ঠানে তাদের কোনো ভূমিকা থাকার কথা অস্বীকার করেছে। একই সঙ্গে অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সরকার নিয়ে করা মন্তব্যগুলোর কোনোটি ভারত সমর্থন করে না বলেও জানিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিনের মতে, তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে যখন আলোচনা চলছিল, তখন হাসিনার ওই বক্তব্য বাংলাদেশে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। এতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের বিষয়ে নয়াদিল্লির আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

পাকিস্তানের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কও নজরে ভারতের

ভারতের উদ্বেগ শুধু শেখ হাসিনাকে ঘিরে নয়। হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে।

ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সামরিক সফর হয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও দুই দেশ প্রকাশ্যে আলোচনা করছে। এসব অগ্রগতির দিকে গভীর নজর রাখছে ভারত।

২০০০ সালের দিকে ভারত অভিযোগ করেছিল, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণ ও সীমান্ত পারাপারে সহায়তা করেছে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ তখন ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছিল।

সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়েও বাংলাদেশ আগ্রহ দেখিয়েছে। ফলে ঢাকার পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তনও ভারতের নজরে রয়েছে।

তারেক রহমানকে সৌদি আরবও দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মুসলিম দেশগুলোর নিরাপত্তা সহযোগিতার উদ্যোগেও আগ্রহ দেখানো হয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে উঠলে তাতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ বিবেচনা করতে পারে।

অধ্যাপক ইয়াসমিন মনে করেন, সতর্কতার সঙ্গে ঢাকার এগোনো উচিত। তিনি বলেন, ‘কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কিছুটা সতর্ক থাকা উচিত। বিষয়টি শুধু ভারতকে ক্ষুব্ধ করার নয়; বাংলাদেশকে কিছুদিন অপেক্ষা করে দেখতে হবে পরিস্থিতি কোন দিকে যায় এবং সেটি আমাদের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।’

সম্পর্ক কি আগের জায়গায় ফিরবে?

শেখ হাসিনার আমলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যে মাত্রায় ঘনিষ্ঠ ছিল, তারেক রহমানের সরকারের সময়ে সেই সম্পর্ক একই জায়গায় থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ঢাকাও চাইছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও কৌশলগত ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে।

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণ মনে করেন, হাসিনাকে হস্তান্তর না করেই ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের সামনে হতাশার কিছু কারণ তৈরি হয়েছে।

তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, চিকিৎসা ভিসা এবং বাণিজ্য সহজীকরণের মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে দিল্লি নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

এদিকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে তারেক রহমানের দিল্লি সফর হতে পারে বলে মনে করছেন কিছু বিশ্লেষক। এরপর ভারতের আয়োজনে ব্রিকস সম্মেলনেও বাংলাদেশকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

সব মিলিয়ে গত কয়েক সপ্তাহের আমন্ত্রণ, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং ভুল করে প্রকাশিত সেই ই-মেইল থেকে তারেক রহমানকে দিল্লিতে নিতে ভারতের আগ্রহ স্পষ্ট হয়েছে। তবে সফরের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো ঢাকার হাতেই রয়েছে।

পড়ুন: দেশে স্বর্ণের দামে বড় পতন

আর/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন