বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রে আওয়ামী লীগের বিক্ষোভের ডাক, ঘরের কোন্দলে কী দুর্বল বিএনপি?

যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক লড়াই এখন আর শুধু রাজপথে সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কূটনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মেও চলছে তৎপরতা। এমন বাস্তবতায় বিএনপির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রে একটি ঐক্যবদ্ধ ও কার্যকর সাংগঠনিক কাঠামো।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—যে সময় জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐক্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, ঠিক সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধই কি সংগঠনকে দুর্বল করে দিচ্ছে?

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতৃত্বে একাধিক গ্রুপের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। বিভিন্ন সময়ে কর্মসূচি, নেতৃত্ব ও কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে এসেছে বিভক্তি। এমনকি ২০২৫ সালেও যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির দুই পক্ষের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে হাতাহাতির ঘটনা ঘটার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

এর মধ্যেই আলোচনায় এসেছে বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন খোকনের ভূমিকা। প্রবাসী বিএনপির নেতাকর্মীদের একটি অংশ তাকে ‘জুম খোকন’ নামে অভিহিত করে অভিযোগ করছে—লন্ডন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সাংগঠনিক কাঠামোকে তিনি মূলত ভার্চুয়াল বৈঠকনির্ভর করে ফেলেছেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, নেতৃত্বের এই বিভক্তি শুধু সাংগঠনিক দুর্বলতা তৈরি করছে না, বরং প্রবাসে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচির গ্রহণযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর কিংবা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পরিসরে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার সময় যদি দলীয় নেতাকর্মীরাই বিভক্ত থাকেন, তাহলে সেই সুযোগটি প্রতিপক্ষের জন্য আরও বড় হয়ে উঠতে পারে।

এমনকি খোকনকে ঘিরে অতীতেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশ্য বিরোধের ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে। ২০২৪ সালে নিউইয়র্কে একটি বিএনপি-সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতি সভাকে কেন্দ্র করে তার সঙ্গে কয়েকজন নেতাকর্মীর হাতাহাতির অভিযোগ প্রকাশিত হয়। একই প্রতিবেদনে তাকে ঘিরে কমিটি গঠন ও প্রবাসী বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধের নানা অভিযোগও তোলা হয়। তবে এসব অভিযোগের সবকটির স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি।

এখন প্রশ্ন উঠছে—একদিকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রচারণা মোকাবিলার দাবি, অন্যদিকে নিজেদের সংগঠনের ভেতরেই যদি বিভাজন থাকে, তাহলে এই লড়াই কতটা কার্যকর হবে?

সমালোচকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বিএনপিকে অঞ্চল, ব্যক্তি কিংবা বলয়ের ভিত্তিতে নয়—দলের আদর্শ, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ কোনো অঞ্চলের নেতাকর্মীকে কেন্দ্র করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ সত্য হলে সেটিও দলের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।

কারণ প্রবাসী রাজনীতিতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা আঞ্চলিক নেতৃত্ব যত শক্তিশালী হবে, দলীয় কাঠামো তত দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

অন্যদিকে বিএনপির জন্য যুক্তরাষ্ট্র কেন গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অংশীদার এবং দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দেশটির নীতিনির্ধারকদের আগ্রহ রয়েছে। ফলে সেখানে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম শুধু দলীয় কর্মসূচির বিষয় নয়; আন্তর্জাতিক পরিসরে দলের রাজনৈতিক বক্তব্য তুলে ধরার ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব রয়েছে।

সেই জায়গায় যদি যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতারাই নিজেদের মধ্যে বিভক্ত থাকেন, তাহলে দলটির আন্তর্জাতিক প্রচারণা কতটা শক্তিশালী হবে—এ প্রশ্ন উঠতেই পারে।

তাই এখন বিএনপির নীতিনির্ধারকদের সামনে মূল প্রশ্ন একজন ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; বরং পুরো সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্র বিএনপিতে কি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব কাঠামো তৈরি হবে? কমিটি গঠনে কি স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে? ব্যক্তি বা আঞ্চলিক বলয়ের পরিবর্তে কি দলীয় সাংগঠনিক কাঠামোকে প্রাধান্য দেওয়া হবে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—আন্তর্জাতিক বিষয়ক দায়িত্বে থাকা নেতাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠছে, সেগুলোর কি দলীয়ভাবে নিরপেক্ষ তদন্ত হবে?

কারণ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রচারণা মোকাবিলা করতে হলে শুধু প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিলেই হবে না। নিজেদের ঘরও হতে হবে ঐক্যবদ্ধ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও কার্যকর।

যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির বর্তমান সংকট তাই কেবল একটি কমিটি বা কয়েকজন নেতার বিরোধের প্রশ্ন নয়। এটি এখন দলের আন্তর্জাতিক সাংগঠনিক সক্ষমতার প্রশ্ন।

আর যদি অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে আসন্ন আন্তর্জাতিক কর্মসূচির আগে সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস, দায়িত্বের পুনর্মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনে বিতর্কিত দায়িত্বশীলদের বিষয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি আরও জোরালো হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—প্রতিপক্ষ যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংগঠিতভাবে সক্রিয়, তখন বিএনপির মতো একটি বড় রাজনৈতিক দলের যুক্তরাষ্ট্র শাখা কি অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ব্যস্ত থাকবে, নাকি জাতীয় স্বার্থ ও দলীয় লক্ষ্যকে সামনে রেখে এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াবে?

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ ২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আমেরিকায় আগমন নিয়ে প্রচারপত্র বিলি করা শুরু করেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে ২১ সেপ্টেম্বর জেএফকে বিমানবন্দরে বিক্ষোভ সমাবেশ করা হবে। এছাড়া হোটেল, জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনেও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত দলটি। এ বিষয়ে নিউইয়র্ক স্টেট যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির প্রধান উপদেষ্টা শেখ জামান নাগরিক টেলিভিশনকে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে সার্থক এবং অর্থবহ করতে আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ যুক্তরাষ্ট্রে নানা ধরনের বিক্ষোভের খবর প্রচার করলেও যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধ করতে আমরাও প্রস্তুত। সুতরাং নিউইয়র্কে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার চেষ্টা হলে আমরা সেটা প্রতিহত করবো।

পড়ুন: গুম-খুনের শিকার পরিবারের সদস্যের চাকরির নিয়োগপত্র দিলেন প্রধানমন্ত্রী

আর/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন