সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছে। এবার এই জোটে বাংলাদেশ যোগ দেবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। সামরিক তাৎপর্যের পাশাপাশি জোটটি সম্প্রসারণের উদ্যোগকেও ইতিবাচকভাবে দেখছে ঢাকা। তবে এখনো বাংলাদেশকে এ বিষয়ে কোনো আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানান, বাংলাদেশ এখনো চুক্তিতে যোগ দেওয়ার কোনো আমন্ত্রণ পায়নি। তবে চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশের ‘ইতিবাচক অবস্থান’ রয়েছে বলে জানান তিনি।
সংসদ অধিবেশনে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমনি ফারহানা মক্কা জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করেন। জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, ‘এতে যোগদান করার বিষয়টি এখানো আসেনি। কারণ এটা নির্ভর করছে যারা এই প্যাক্টের সদস্য, তাদের অভিপ্রায়ের ওপর। তারা যদি অভিপ্রায় প্রকাশ করেন বাংলাদেশকে এই প্যাক্টে নেওয়ার জন্য, তাহলে আমরা নিশ্চয়ই সেটা ইতিবাচকভাবেই বিবেচনা করব।’
‘মক্কা প্যাক্ট হচ্ছে বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার একটা ব্যবস্থা এবং এটা আমাদের মুসলিম পরিবারের আভ্যন্তরীণ বিষয়। সুতরাং এটা নিয়ে কারো, অন্যদের উদ্বেগের কোনো অবকাশ নাই।’ একই সঙ্গে তিনি জানান, বাংলাদেশ এখনো এই জোটের অংশ না হওয়ায় এতে যোগ দিলে কী লাভ হবে, তা নিয়ে আলোচনার সময়ও আসেনি।
এই জোটের গুরুত্ব কী
মুসলিম বিশ্বের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মিলে গড়ে তুলেছে এই জোট। সৌদি আরব বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারকদের একটি এবং একই সঙ্গে বড় অর্থনৈতিক শক্তি। তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনীর অধিকারী। দেশটির প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিও অত্যন্ত উন্নত। আধুনিক যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও মিসাইলসহ শক্তিশালী সেনাবাহিনী রয়েছে তুরস্কের। অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ পাকিস্তান।
তিন দেশ যে চুক্তি সই করেছে, তার আনুষ্ঠানিক নাম মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। মুসলিমদের সর্বোচ্চ পবিত্র নগরী মক্কায় চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। এটিকে মুসলিম দেশগুলোর একটি সম্ভাব্য সম্মিলিত জোট হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সামরিক জোটের অংশ হিসেবে সামরিক প্রশিক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ব্যয় এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে কোন দেশ কতটুকু অবদান রাখবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সামরিক তাৎপর্যের কারণে তিন দেশের এই যৌথ প্রতিরক্ষা জোট বৈশ্বিক রাজনীতিতেও আলোচনা তৈরি করেছে। অনেকেই এটিকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ নামেও অভিহিত করছেন।
চুক্তি অনুযায়ী, স্বাক্ষরকারী তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরোধিতায় মার্কিন নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ন্যাটোতেও একই ধরনের ধারা রয়েছে।
বাংলাদেশের লাভ কতটা
মক্কা প্যাক্ট মূলত একটি প্রতিরক্ষামূলক চুক্তি। চুক্তিতে এই জোটের যৌথ সামরিক সক্ষমতার বিষয়টিই গুরুত্ব পাচ্ছে। সেখানে তুরস্ক ও পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জোটভুক্ত দেশগুলো সামরিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের পাশাপাশি অস্ত্র প্রযুক্তি বিনিময়ের দিকেও যেতে পারে।
তিন দেশের তিন ধরনের সক্ষমতা রয়েছে, যা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে। সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল অর্থ, তেল, ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধা ও রাজনৈতিক শক্তি। তুরস্কের রয়েছে অত্যাধুনিক সামরিক শিল্প, ড্রোন প্রযুক্তি, মিসাইল, সেন্সর, নৌশক্তি ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধের সক্ষমতা। রয়েছে উন্নত মানের অস্ত্র প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ। পাকিস্তানের রয়েছে দক্ষ সৈন্য, বিশাল পেশাদার সেনাবাহিনী ও অবকাঠামো, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা এবং পরমাণু অস্ত্র।
এই চুক্তির ফলে সৌদি আরবের জন্য আমেরিকার বাইরে অস্ত্র সংগ্রহের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। দেশটি তুরস্ক ও পাকিস্তান থেকে প্রয়োজনীয় অস্ত্র আমদানি করতে পারবে।
অন্যদিকে তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রয়োজন অর্থ। তারা অস্ত্র ও প্রযুক্তি বিক্রির মাধ্যমে তা পাবে এবং সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে নতুন বিনিয়োগ করতে পারবে।
এই দেশগুলো নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতা নিয়ে যৌথভাবে কাজ করলে তা দেশগুলোর জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের ঝুঁকি কী
বাংলাদেশ এই চুক্তিতে যোগ দিলে বেশ কিছু ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রথমত, জোটের নীতিতে বলা হয়েছে, কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে সেটিকে জোটের বাকি দেশগুলোর ওপরও হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ফলে ন্যাটোর আদলে এমন জোটে বাংলাদেশ থাকলে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির বিষয়টি। মক্কা জোটে পাকিস্তান থাকায় তার প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত শুরু থেকেই এই জোটকে একধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। ভবিষ্যতে ভারত-পাকিস্তান কোনো সংঘাত হলে মক্কা জোটের ভূমিকা কী হবে এবং তাতে বাংলাদেশের জড়িয়ে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় প্রক্সি ফোর্সের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও বলা হচ্ছে।
মক্কা জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া কতটা জরুরি
মক্কা জোটে যোগ দিলে ভূরাজনৈতিক নানা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। ফলে জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের লাভ কী এবং এতে কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক হাসিব আজিজ বলেন, ‘এই জোটে বাংলাদেশের প্রাপ্তির অনেক কিছুই আছে। সেটা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে হতে পারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে পার্টনারশিপ হতে পারে, ইন্টেলিজেন্স বা গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের সম্পর্ক সৃষ্টি হতে পারে যেটা আসলে বড় বড় সামরিক জোটে এধরনের তথ্য আদান-প্রদান হয়ে থাকে।’
ঢাকাভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সঙ্গে যুক্ত হাসিব আজিজ বলেন, ‘আমরা তুরস্ক থেকে বায়রাক্তার ড্রোন, আরমার্ড ভেহিকেল এরকম অনেক কিছুই আমদানি করি। এই অংশীদারত্বটা আরও বড় হতে পারে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের একটা সুযোগও আসে যে, তুরস্কের মতো একটা দেশের সঙ্গে আমরা জয়েন্ট কোলাবরেশনে গিয়ে কোনো কিছু উন্নত করতে পারি কি না, বিশেষ করে মিলিটারি টেকনোলজির ক্ষেত্রে। এ ছাড়া এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের নৌপথের কৌশলগত সাপ্লাই চেইনকেও শক্তিশালী করবে।’
মক্কা জোটে যোগ দেওয়ার আগে সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনায় নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ড. লাইলুফার ইয়াসমিন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রায়োরিটি অনেকগুলো আছে। সেগেুলো মাথায় রেখে আমাদের চিন্তা করতে হবে যে, আমি একটি সামরিক জোটে জয়েন করতে চাই কি না। একই সঙ্গে আমাকে চিন্তা করতে হবে যে, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের জন্য আমার দক্ষিণ এশিয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ নাকি একটি সামরিক জোটে যোগ দেওয়া বেশি প্রয়োজন।’
‘এখানে অবশ্য বিষয়টা এমন না যে, যেকোনো একটি পথ বেছে নিতে হবে। এখানে দুটোই একই সঙ্গে সম্ভব। কিন্তু চুক্তিতে ডিফেন্স কথাটা যেহেতু আছে এবং ডিফেন্স প্যাক্টের মতো করে এটা চিন্তা করা হচ্ছে, সুতরাং এই এলাকায় এর প্রভাবটাও বিবেচনা করতে হবে,’ বলেন তিনি।
অধ্যাপক ড. লাইলুফার ইয়াসমিনও মনে করেন, মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সমুদ্রে নৌ-চলাচল এবং নিরাপত্তা একটা বড় উদ্দেশ্য। তা ছাড়া সৌদি আরবে বহুসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি আছেন। দেশটি বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের একটি প্রধানতম উৎস। সৌদি আরব বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগীও বটে। ফলে চুক্তিতে থাকলে সেটা বাংলাদেশের শ্রমিক পাঠানো থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ সহায়তারও নতুন দ্বার খুলতে পারে।’
সূত্র: বিবিসি বাংলা
পড়ুন: ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য নতুন অস্ত্র প্রস্তুত করেছে ইরান’
আর/


