পদ নেই সরকারি গেজেটে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অনুমোদনও নেই—এরপরও ওই পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ। তার ওপর নিয়োগের সময় প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণ প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকায় নতুন নিয়োগে বিধিনিষেধ থাকার কথাও উঠে এসেছে। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে মাদারীপুরের ডাসার সরকারি মহিলা মহাবিদ্যালয়ে ‘ইন্সট্রাক্টর, প্রকৌশল অঙ্কন ও প্র্যাকটিস’ পদে হুমায়ুন কবির নামে এক ব্যক্তির নিয়োগ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর হুমায়ুন কবিরকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ সংশ্লিষ্ট সময়ে কলেজটি জাতীয়করণের প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল এবং ‘প্রকৌশল অঙ্কন ও প্র্যাকটিস’ বিষয়েরও অনুমোদন ছিল না বলে দাবি করেছেন কলেজের একাধিক শিক্ষক।
শুধু নিয়োগই নয়, ওই ব্যক্তিকে বর্তমানে কলেজের বিভিন্ন কাজে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি কলেজের তহবিল থেকে পারিশ্রমিক দেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। ফলে নিয়োগের বৈধতা, পদটির অনুমোদন, জনবল কাঠামো এবং কলেজের অর্থ ব্যয়ের নিয়মনীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জাতীয়করণের প্রক্রিয়ার মধ্যেই নিয়োগের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, তৎকালীন শেখ হাসিনা একাডেমি অ্যান্ড উইমেন্স কলেজ জাতীয়করণের লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি পরিপত্র জারি করা হয়। জাতীয়করণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে ওই পরিপত্রে প্রতিষ্ঠানটির নিয়োগ, পদোন্নতি এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।এসব বিধিনিষেধ কার্যকর থাকার সময়ই ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর হুমায়ুন কবিরকে ‘ইন্সট্রাক্টর, প্রকৌশল অঙ্কন ও প্র্যাকটিস’ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
কলেজের একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ইন্টারমিডিয়েট পর্যায়ে ‘প্রকৌশল অঙ্কন ও প্র্যাকটিস’ বিষয়ের অনুমোদনই ছিল না। ফলে অনুমোদনহীন একটি বিষয়ের জন্য ইন্সট্রাক্টর পদে নিয়োগ কীভাবে হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।তবে নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অনুমোদন, পদটি জনবল কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল কি না—এসব বিষয় যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি।
হুমায়ুন কবিরের পদটি নিয়েও রয়েছে বড় প্রশ্ন। স্থানীয়দের দাবি, ‘ইন্সট্রাক্টর, প্রকৌশল অঙ্কন ও প্র্যাকটিস’ পদটি সরকারি গেজেটভুক্ত অনুমোদিত জনবল কাঠামোর মধ্যে নেই। এরপরও তাঁকে কলেজ থেকে অর্থ দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইন্সট্রাক্টর হিসেবে নিয়মিত পাঠদান না করলেও তাঁকে কলেজের ডাইনিংয়ের কাজ দেখা, পরীক্ষার খাতা দেখা, পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালনসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রাজু মিয়া বলেন, “যদি পদটি অনুমোদিত জনবল কাঠামোর বাইরে হয়, তাহলে কোন বিধি বা কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে তাঁকে কলেজের তহবিল থেকে অর্থ দেওয়া হচ্ছে—তা পরিষ্কার করা দরকার। জাতীয়করণের পর তাঁর চাকরির অবস্থান কী এবং দেওয়া অর্থ কোন খাতে দেখানো হচ্ছে, সেটিও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”
একাধিক জায়গা থেকে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার অভিযোগ, হুমায়ুন কবির কলেজের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। পাশাপাশি তিনি সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের গ্রামের বাড়ির সম্পত্তি দেখাশোনার কাজও করেন বলে দাবি তাঁদের।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, তিনি দুটি কলেজ থেকে বেতন নেন এবং বাইরে সম্পত্তি দেখাশোনার জন্যও সৈয়দ আবুল হোসেনের স্ত্রীর কাছ থেকে পারিশ্রমিক পান।অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।এসব নথি পর্যালোচনা করা হলে হুমায়ুন কবিরের নিয়োগ কোন প্রক্রিয়ায় এবং কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে হয়েছিল, তা স্পষ্ট হতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
তবে নিয়োগের বৈধতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিপত্র যাচাই এবং নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজনও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘আমার সাবজেক্ট নেই’—বলছেন হুমায়ুন কবির
নিজের নিয়োগের বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, “আমাকে প্রিন্সিপাল স্যার রেখেছেন। তিনি আমার কাজের জন্য টাকা দেন। আমার সাবজেক্ট নেই। আমাকে কেন নিয়োগ দেওয়া হলো—এ কারণে আমি হাইকোর্টে আপিল করেছি। এখন হাইকোর্টের রায়ের অপেক্ষায় আছি।”
‘কনস্ট্রাকশন সাইট দেখি, তাই পারিশ্রমিক দিই’
অভিযোগের বিষয়ে ডাসার সরকারি মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জাকিয়া সুলতানা বলেন, “তার তো কোনো ক্লাস নেওয়া নেই। সে আমাদের কলেজের কনস্ট্রাকশন সাইটগুলো দেখে। এজন্য তাকে কিছু পারিশ্রমিক দিই।”
অধ্যক্ষের এই বক্তব্যের পরও প্রশ্ন উঠেছে—যদি তাঁর কোনো ক্লাস না থাকে এবং তিনি মূলত নির্মাণকাজের সাইট দেখাশোনা করেন, তাহলে ‘ইন্সট্রাক্টর, প্রকৌশল অঙ্কন ও প্র্যাকটিস’ পদে তাঁর নিয়োগের ভিত্তি কী এবং কলেজের তহবিল থেকে তাঁকে কোন খাতে পারিশ্রমিক দেওয়া হচ্ছে?
তৎকালীন কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
হুমায়ুন কবিরের নিয়োগের ক্ষেত্রে তৎকালীন অধ্যক্ষ ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির প্রভাব ছিল বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দা।
মাদারীপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামাল হোসাইন বলেন, “ওই কলেজে কোনো বিষয়ে যদি সাবজেক্ট না থেকে থাকে, তাহলে নতুন করে ওই সাবজেক্টের পদ সৃষ্টি করে, তারপরে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। আর যদি তা না হয়, তাহলে তার থাকার কোনো সুযোগ নেই। এরকম কেউ হয়ে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।”
তাই হুমায়ুন কবিরের নিয়োগ, বর্তমান অবস্থান ও কলেজের অর্থ থেকে তাঁকে দেওয়া পারিশ্রমিকের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে প্রশাসনিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
পড়ুন:নদীপথে রাজবাড়ী মন্দিরে নেওয়া হচ্ছে শ্রী শ্রী শান্তজীউ-বিগ্রহ
ইমি/


