মৃত্যু মানুষের জীবনের সবচেয়ে নির্মম অথচ অবধারিত সত্য। পৃথিবীর যে প্রান্তেই মানুষ বসবাস করুক, যত বড় পরিচয়ই তার থাকুক, জীবনের শেষ ঠিকানা একদিন মাটির নিচেই। অথচ আমাদের নিকুঞ্জ টানপাড়া এলাকায় একজন মানুষের মৃত্যুর পর তার মরদেহ কোথায় দাফন করা হবে—এই মৌলিক প্রশ্নটিরও অনেক সময় সহজ উত্তর পাওয়া যায় না। একটি আধুনিক, ঘনবসতিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকায় বসবাস করেও আমাদের জন্য একটি সার্বজনীন কবরস্থান নেই—এটি শুধু একটি অব্যবস্থাপনার বিষয় নয়, বরং দীর্ঘদিনের একটি সামাজিক বাস্তবতা।
নিকুঞ্জ টানপাড়া এমন একটি এলাকা, যার ভৌগোলিক গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। একদিকে নিকুঞ্জ ১, নিকুঞ্জ-২, অন্যদিকে টানপাড়া ও জামতলা; আর এর একেবারে পাশে দেশের প্রধান বিমানবন্দর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সীমানা।
রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বারের কাছাকাছি এমন একটি এলাকায় বসতি, মানুষের সংখ্যা, ভবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নাগরিক কার্যক্রম ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু এলাকার মানুষের একটি মৌলিক প্রয়োজন—নিজস্ব একটি সার্বজনীন কবরস্থান—এখনো পূরণ হয়নি।
প্রশ্ন হচ্ছে, একজন মানুষ মারা গেলে আমরা কোথায় যাব?
কখনো কোনো পরিবারের নিজস্ব কবরস্থানে জায়গা পাওয়া যায়, কখনো আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় দূরের কোনো স্থানে দাফনের ব্যবস্থা করতে হয়। আবার অনেক পরিবারকে শেষ মুহূর্তে এমন একটি জায়গার সন্ধানে ছুটতে হয়, যেখানে তাদের প্রিয়জনকে সম্মানের সঙ্গে চিরনিদ্রায় শায়িত করা সম্ভব। মৃত্যুর সময় একটি পরিবার এমনিতেই শোকের ভারে ভেঙে পড়ে। তার ওপর যদি দাফনের জায়গা খুঁজতে তাদের ছোটাছুটি করতে হয়, সেটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
এই বাস্তবতা আমি বহু বছর ধরেই অনুভব করছি। ব্যক্তিগতভাবে অনেক আগে থেকেই আমার মনে একটি সার্বজনীন কবরস্থান প্রতিষ্ঠার চিন্তা ছিল। কিন্তু চিন্তা থাকা আর বাস্তবে একটি বড় সামাজিক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা এক বিষয় নয়।
প্রয়োজন জায়গা, প্রয়োজন সংগঠিত উদ্যোগ, প্রয়োজন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সহযোগিতা, প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সবচেয়ে বড় কথা—প্রয়োজন মানুষের সম্মিলিত ঐক্য।
বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে এতদিন সেই উদ্যোগ বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়নি। কারও জমি থাকলে যোগাযোগ করা কঠিন, কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা গেলেও জমির উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন থাকে, আবার কোথাও জমি পাওয়া গেলেও সেটি কবরস্থানের জন্য উপযোগী কি না, ভবিষ্যতে কতটা জায়গা প্রয়োজন হবে—এসব বিষয় সামনে আসে।
কিন্তু সময় কখনো থেমে থাকে না। নিকুঞ্জ টানপাড়াও থেমে নেই। এলাকা বড় হচ্ছে, জনবসতি বাড়ছে, নতুন নতুন মানুষ এখানে বসবাস শুরু করছেন। ফলে এখন আর বিষয়টিকে ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখার সুযোগ নেই।
নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটি সরকারি অনুমোদন পাওয়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। একটি সংগঠিত প্ল্যাটফর্ম তৈরি হওয়ায় এলাকার মানুষের নানা নাগরিক সমস্যা নিয়ে সম্মিলিতভাবে কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আর সেই জায়গা থেকেই সার্বজনীন কবরস্থান প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে।
আমাদের সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সৈকত সরকার এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার নাম হয়ে সামনে এসেছেন। স্থানীয় একজন ব্যক্তি, আমাদের পরমাত্মীয় সাদেক হুজুরের মৃত্যুর পর তাঁর দাফনের সময় সরকার বাড়ি কবরস্থানে দাঁড়িয়ে সৈকত সরকার আমাকে একটি কথা বলেছিলেন—এই এলাকায় একটি সার্বজনীন কবরস্থান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে।
কথাটি হয়তো কয়েক মিনিটের একটি কথোপকথন ছিল। কিন্তু আমার কাছে সেটি ছিল অনেক বড় একটি দায়িত্বের কথা।
সেদিন আবারও মনে হলো, এতদিন যে বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে ভাবছিলাম, সেটিকে এখন সামাজিক ও সাংগঠনিক উদ্যোগে পরিণত করার সময় এসেছে।
এরপর আমরা এলাকার বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো—মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। অনেকেই বলেছেন, একটি সার্বজনীন কবরস্থান হলে সেটি শুধু আজকের মানুষের জন্য নয়, আগামী প্রজন্মের জন্যও একটি বড় সামাজিক সম্পদ হয়ে থাকবে।
আমাদের বুঝতে হবে, কবরস্থান কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; একটি সার্বজনীন কবরস্থান একটি এলাকার সামাজিক নিরাপত্তার অংশ। হাসপাতাল যেমন মানুষের জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজন, বিদ্যালয় যেমন শিক্ষার জন্য প্রয়োজন, খেলার মাঠ যেমন সুস্থ প্রজন্মের জন্য প্রয়োজন, তেমনি একটি কবরস্থানও মানুষের জীবনের শেষ বিদায়ের জন্য প্রয়োজন।
এখানে আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কবরস্থান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ কোনো ব্যক্তি বা একটি সংগঠনের একার পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এটি হতে হবে সবার উদ্যোগ। এখানে মতের পার্থক্য থাকতে পারে, রাজনৈতিক পরিচয় আলাদা হতে পারে, সামাজিক অবস্থান আলাদা হতে পারে, পেশা আলাদা হতে পারে; কিন্তু মৃত্যুর ক্ষেত্রে আমরা সবাই সমান।
আজ যে মানুষটি অন্যের দাফনের জায়গা খুঁজছেন, কাল হয়তো তাঁর নিজের পরিবারেরই সেই প্রয়োজন হতে পারে।
তাই সার্বজনীন কবরস্থান প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ভাবতে হবে। নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির অতীত কর্মকাণ্ডও আমাদের আশাবাদী করে।
প্রায় ১৬ মাস আগে নিকুঞ্জ টানপাড়ায় ব্যাটারিচালিত ঝুঁকিপূর্ণ অটোরিকশার বিরুদ্ধে যে জনঐক্যের বিস্ফোরণ ঘটেছিল, সেটি ছিল আমাদের এলাকার নাগরিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। দীর্ঘদিনের একটি সমস্যার বিরুদ্ধে মানুষ যখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, তখন অসম্ভব মনে হওয়া একটি বিষয়ও বাস্তবায়নের পথ তৈরি হয়েছিল।
সেই অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়—মানুষ চাইলে পরিবর্তন সম্ভব।
আজ আমাদের সামনে নতুন একটি লক্ষ্য, নতুন একটি চ্যালেঞ্জ। সেটি হলো নিকুঞ্জ টানপাড়ায় একটি সার্বজনীন কবরস্থান প্রতিষ্ঠা করা।
এই উদ্যোগের প্রথম কাজ হবে সম্ভাব্য জায়গা খুঁজে বের করা। জায়গাটি কোথায় হতে পারে, কতটুকু জমি প্রয়োজন, জমির মালিকানা কী, জমিটি কবরস্থানের জন্য আইনগত ও পরিবেশগতভাবে উপযোগী কি না—এসব বিষয় যাচাই করতে হবে। কোনো ব্যক্তির জমি হলে তাঁর সঙ্গে সম্মানজনক ও স্বচ্ছ আলোচনায় বসতে হবে। প্রয়োজন হলে জমি ক্রয়, দান, ওয়াক্ফ বা অন্য কোনো আইনসম্মত ব্যবস্থার বিষয়ও বিবেচনা করা যেতে পারে।
সবকিছু করতে হবে স্বচ্ছতার সঙ্গে।
কারণ এই উদ্যোগের সঙ্গে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি যেমন জড়িত, তেমনি জড়িত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ। তাই কোনো ধরনের ব্যক্তিগত মালিকানা, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা আর্থিক অস্পষ্টতার সুযোগ এখানে থাকা উচিত নয়।
আমি মনে করি, সার্বজনীন কবরস্থান প্রতিষ্ঠার জন্য একটি পৃথক পরিচালনা কাঠামোও প্রয়োজন হতে পারে। সেখানে নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির প্রতিনিধিদের পাশাপাশি এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি, আলেম, সমাজকর্মী, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব থাকতে পারে।
প্রয়োজনে একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা যেতে পারে। প্রতিটি অনুদানের হিসাব প্রকাশ করা যেতে পারে। জমি কেনা হলে দলিল, মূল্য এবং অন্যান্য খরচের তথ্যও স্বচ্ছভাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
এভাবে একটি সামাজিক প্রকল্পকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া সম্ভব।
আমাদের লক্ষ্য শুধু কয়েক বছর কবর দেওয়ার জায়গা তৈরি করা হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কত বছর পর জায়গা প্রয়োজন হবে, কীভাবে কবরের জায়গা সংরক্ষণ করা হবে, হাঁটার রাস্তা, পানি নিষ্কাশন, সীমানাপ্রাচীর, গেট, নিরাপত্তা, আলো, অজুখানা, মরদেহ গোসলের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য অবকাঠামো কীভাবে তৈরি হবে—সবকিছু পরিকল্পনার মধ্যে রাখতে হবে।
কারণ আজ আমরা যে জায়গাটি তৈরি করব, আগামী কয়েক দশক সেই জায়গা আমাদের সন্তানদেরও প্রয়োজন হবে।
আর এই কারণেই এখনই উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। নিকুঞ্জ টানপাড়ার অবস্থানও এ উদ্যোগের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সীমানার লাগোয়া এই এলাকায় দেশ-বিদেশের মানুষের চলাচল রয়েছে। রাজধানীর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে। দ্রুত নগরায়ণের কারণে ভবিষ্যতে এই এলাকার গুরুত্ব আরও বাড়বে। এমন একটি এলাকায় একটি পরিকল্পিত, পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল সার্বজনীন কবরস্থান থাকা শুধু প্রয়োজনই নয়, সময়ের দাবি।
আমরা যদি এখন উদ্যোগ না নিই, তাহলে কয়েক বছর পর জায়গা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
শুধু কবরস্থানের জায়গা পাওয়া নয়, জায়গাটি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নগরায়ণের চাপে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যেভাবে খোলা জায়গা কমে যাচ্ছে, তাতে আজকের একটি ছোট জায়গার মূল্য আগামী দিনে বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। তাই এখন থেকেই একটি দীর্ঘমেয়াদি জমি সংরক্ষণ পরিকল্পনা দরকার।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই উদ্যোগের মালিক কোনো ব্যক্তি নন। এর মালিক হবে নিকুঞ্জ টানপাড়ার মানুষ।
আমি শুধু একজন উদ্যোগী মানুষ হিসেবে পাশে থাকতে চাই। সৈকত সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যে কথাটি বলেছিলেন, সেটিকে বাস্তব উদ্যোগে রূপ দিতে চাই। আর নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটিকে আমি এই কাজের একটি সংগঠিত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখতে চাই।
তবে সোসাইটি একা পারবে না।
প্রয়োজন এলাকার বাড়ির মালিকদের সহযোগিতা। প্রয়োজন ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা। প্রয়োজন প্রবাসীদের সহযোগিতা। প্রয়োজন তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ। প্রয়োজন আলেম-ওলামা ও সমাজের প্রবীণদের দিকনির্দেশনা। প্রয়োজন প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা।
সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানুষের আন্তরিকতা।
একজন মানুষ মারা গেলে তাঁর পরিচয় আর সম্পদ দিয়ে কবরের জায়গা নির্ধারণ করা উচিত নয়। তিনি ধনী না গরিব, পরিচিত না অপরিচিত, প্রভাবশালী না সাধারণ—এসবের কোনো গুরুত্ব নেই। একটি সার্বজনীন কবরস্থানের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্যই হলো সেখানে সবাই সমান।
আজ হয়তো আমরা একজন অচেনা মানুষের দাফনে জায়গা করে দেব। কাল আমাদেরই কোনো প্রিয়জনের জন্য সেই জায়গা প্রয়োজন হতে পারে।
এই উপলব্ধি থেকেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
আমি বিশ্বাস করি, নিকুঞ্জ টানপাড়ার মানুষ একবার যদি কোনো লক্ষ্যকে নিজেদের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে সেটি বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে জনঐক্য তার একটি বড় উদাহরণ। নাগরিক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আমাদের সম্মিলিত কার্যক্রমও তার প্রমাণ।
এবার আমাদের সামনে আরও মানবিক একটি কাজ। মৃত মানুষের জন্য একটি স্থায়ী ঠিকানা তৈরি করা।
এটি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়। এটি কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের প্রচারণার বিষয় নয়। এটি কোনো নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রতিশ্রুতিও নয়। এটি মানুষের জন্য মানুষের একটি উদ্যোগ।
আমি চাই, এই উদ্যোগের শুরুটা হোক আজ থেকেই।
আমরা সম্ভাব্য জায়গা খুঁজব। মানুষের সঙ্গে কথা বলব। জমির মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করব। আইনগত বিষয়গুলো যাচাই করব। প্রয়োজনীয় অর্থের সম্ভাব্য উৎস খুঁজে বের করব। তারপর সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য পরিকল্পনা তৈরি করব।
যদি প্রয়োজন হয়, এক বাড়ি এক অনুদান, এক পরিবার এক অংশগ্রহণ—এমন সামাজিক উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে। কেউ টাকা দেবেন, কেউ শ্রম দেবেন, কেউ জমির সন্ধান দেবেন, কেউ আইনগত পরামর্শ দেবেন, কেউ প্রশাসনিক সহযোগিতা করবেন। যার যতটুকু সামর্থ্য, সে ততটুকু অংশ নেবেন।
কারণ বড় কোনো কাজ একা একজন মানুষ করেন না। বড় কাজ তৈরি হয় বহু মানুষের ছোট ছোট অবদানে।
আজ যদি আমরা উদ্যোগ নিই, হয়তো কয়েক মাস বা কয়েক বছর সময় লাগবে। হয়তো অনেক বাধা আসবে। হয়তো জমি পাওয়া কঠিন হবে। হয়তো অর্থের সংকট দেখা দেবে। কিন্তু আমরা যদি লক্ষ্য থেকে সরে না যাই, একদিন না একদিন একটি জায়গা আমরা তৈরি করতেই পারব।
আর সেই দিনটি হবে নিকুঞ্জ টানপাড়ার ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন।
সেদিন হয়তো আমরা থাকব না। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম থাকবে। তারা যখন সেই কবরস্থানের পাশ দিয়ে হাঁটবে, তখন হয়তো জানবেও না—কত মানুষের চিন্তা, শ্রম, অর্থ, সময় এবং ভালোবাসায় এই জায়গাটি তৈরি হয়েছিল।
তবু সেটিই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। কারণ মানুষের জন্য রেখে যাওয়া ভালো কাজের চেয়ে বড় কোনো স্মৃতি নেই।
সাদেক হুজুরের মৃত্যুর পর সরকার বাড়ি কবরস্থানে দাঁড়িয়ে সৈকত সরকারের সেই কথাটি তাই শুধু একটি কথাই নয়; আমার কাছে এটি একটি সামাজিক দায়িত্বের আহ্বান। সেই আহ্বানকে সামনে রেখে আমরা এগিয়ে যেতে চাই।
নিকুঞ্জ টানপাড়ার মানুষকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে চাই।
কেউ যেন মৃত্যুর পর তাঁর প্রিয়জনকে দাফন করার জায়গা খুঁজতে অসহায় হয়ে না পড়েন—এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
আমরা এমন একটি কবরস্থান চাই, যেখানে একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের জন্য যেমন জায়গা থাকবে, তেমনি থাকবে একজন শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, কৃষক, রিকশাচালক কিংবা প্রবাসীর জন্যও। যেখানে পরিচয়ের আগে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা হবে।
আমাদের সন্তানদের জন্য আমরা বাড়ি করছি, স্কুল করছি, রাস্তা করছি, খেলার মাঠ চাইছি। এবার তাদের জন্য একটি স্থায়ী কবরস্থানের জায়গাও নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ জীবন যতই আধুনিক হোক, মৃত্যুর শেষ ঠিকানা এখনো সেই মাটিই।
আর সেই মাটিতে যেন আমাদের মানুষগুলো সম্মানের সঙ্গে শায়িত হতে পারেন—এই মানবিক দায়িত্ব থেকে নিকুঞ্জ টানপাড়ায় একটি সার্বজনীন কবরস্থান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ আর বিলম্বিত করা উচিত নয়।
আসুন, আমরা সবাই মিলে উদ্যোগ নিই।
আজকের এই চিন্তাটিকে আগামী দিনের বাস্তবতায় পরিণত করি। নিকুঞ্জ টানপাড়ার জন্য একটি সার্বজনীন কবরস্থান—এবার সেটিই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।
লেখক পরিচিতি: সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটি।
পড়ুন : ভোটার এলাকা পরিবর্তনের সময় বেঁধে দিল ইসি


