রাজধানীর খিলক্ষেতের ৩০০ ফিট মহাসড়কে র্যাবের পরিচয় দিয়ে মোটরসাইকেল আরোহীদের তুলে নিয়ে টাকা, মুঠোফোন ও মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে একটি চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে খিলক্ষেত থানা পুলিশ।
তাঁদের কাছ থেকে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত একটি টয়োটা প্রাইভেটকার, পাঁচটি ডামি পিস্তল, চারটি ডামি ম্যাগাজিন, তিনটি পিস্তলের কাভার, ইলেকট্রিক শক মেশিন, ছুরি, স্টিলের বাটনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ছিনতাই হওয়া একটি এপাচি ফোরভি মোটরসাইকেল ও একটি আইফোন ১৩ প্রো ম্যাক্স।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে একজন নিজেকে সাবেক সেনা কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অপর দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে কুমিল্লার মুরাদনগরের বাসিন্দা মো. শাওন হোসেন (২০) তাঁর বন্ধু রাহাত বিন রিগান, জামিল ও মামুনকে নিয়ে দুটি মোটরসাইকেলে ৩০০ ফিট মহাসড়কে ঘুরতে যান। একপর্যায়ে তাঁরা খিলক্ষেত থানাধীন স্বদেশ প্রোপার্টিজের সামনে ২ নম্বর সেতুর নিচে মোটরসাইকেল রেখে ছবি তুলছিলেন।
এ সময় একটি রুপালি রঙের প্রাইভেটকার এসে তাঁদের সামনে থামে। গাড়ি থেকে তিন থেকে চারজন ব্যক্তি নেমে নিজেদের র্যাব সদস্য পরিচয় দেন। তাঁরা শাওন ও তাঁর বন্ধুদের নাম-ঠিকানা এবং মোটরসাইকেলের কাগজপত্র দেখতে চান। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তাঁরা কাগজপত্র ও মোটরসাইকেলের চাবি দিতে অস্বীকৃতি জানান।
পুলিশ বলছে, এরপর ওই ব্যক্তিরা জোর করে মোটরসাইকেলের চাবি নেওয়ার চেষ্টা করেন। শাওন ও রাহাত বাধা দিলে তাঁদের ভয়ভীতি দেখানো ও মারধর করা হয়। পরে তাঁদের জোর করে প্রাইভেটকারে তুলে নেওয়া হয়। মোটরসাইকেলটি থানায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হলেও তাঁদের একটি নির্জন জায়গায় নিয়ে পিস্তল দেখিয়ে সঙ্গে থাকা টাকা ও মানিব্যাগ নিয়ে নেওয়া হয়।
প্রায় এক ঘণ্টা ৩০০ ফিট মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ঘোরানোর পর তাঁদের পিংক সিটির গেটের সামনে নামিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় শাওন কৌশলে অভিযুক্তদের ব্যবহৃত প্রাইভেটকারের চাবি নিয়ে দৌড় দেন। তখন রাহাতকে একজন পিস্তলের বাঁট দিয়ে মাথার পেছনে আঘাত করেন। এতে তিনি আহত হন।
শাওন দৌড়ে স্বদেশ চত্বরে থাকা পুলিশের গাড়ির কাছে গিয়ে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের ঘটনাটি জানান। এরপর দ্রুত অভিযান শুরু করে খিলক্ষেত থানা পুলিশ।
পুলিশ জানায়, ভুক্তভোগীদের সঙ্গে নিয়ে পিংক সিটি গেটের সামনে গিয়ে অভিযুক্তদের ফেলে যাওয়া রুপালি রঙের টয়োটা প্রাইভেটকারটি জব্দ করা হয়। গাড়িটির নিবন্ধন নম্বর ঢাকা মেট্রো-গ-২৯-৬৯৪২।
তল্লাশি করে গাড়ি থেকে দুটি হেলমেট, একটি স্টিলের বাটন, একটি ইলেকট্রিক শক মেশিন, দুটি সানগ্লাস, দুই জোড়া গ্লাভস ও একটি কালো কটি উদ্ধার করা হয়।
এরপর গাড়িতে পাওয়া কাগজপত্র যাচাই ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অভিযান চালিয়ে ৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে খিলক্ষেতের বরুয়া এলাকা থেকে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর কাছ থেকে একটি ডামি পিস্তল উদ্ধার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে ওই ব্যক্তি নিজেকে সাবেক সেনা কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাত সাড়ে ১১টার দিকে পল্লবীর সেকশন-১২, ব্লক-ডি, রোড-২ এলাকার একটি ছয়তলা ভবনের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়।
সেখান থেকে চারটি ডামি পিস্তল, চারটি ডামি ম্যাগাজিন, তিনটি পিস্তলের কাভার, একটি রান চাকু, একটি স্টিলের বাটন, দুটি চাকু, একটি ওয়ালেট, একটি মানিব্যাগ ও একটি চামড়ার ছোট ব্যাগ উদ্ধার করা হয়। ভবনের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় ছিনতাই হওয়া কালো রঙের এপাচি ফোরভি মোটরসাইকেল, যার নিবন্ধন নম্বর ঢাকা মেট্রো-ল-৩০-৮৮২৯। একই স্থান থেকে একটি আইফোন ১৩ প্রো ম্যাক্সও উদ্ধার করা হয়।
পরে গ্রেপ্তার ব্যক্তির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পল্লবীর ডি-ব্লক এলাকা থেকে রাত সাড়ে ১১টার দিকে চক্রটির আরও দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তির বিরুদ্ধে পল্লবী থানাসহ ডিএমপির বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
এ ঘটনায় শাওন হোসেনের অভিযোগের ভিত্তিতে ৬ সেপ্টেম্বর খিলক্ষেত থানায় মামলা হয়েছে। মামলাটির এফআইআর নম্বর ৮ এবং জিআর নম্বর ১৪৪। দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ১৭০ ও ৩৯৪ ধারায় মামলাটি করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনারের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নির্দেশনায় এসআই মো. শামীম হকের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল এ অভিযান পরিচালনা করে বলে জানিয়েছে খিলক্ষেত থানা।
পড়ুন: রোহিঙ্গা সংকট আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
আর/


