মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে রাষ্ট্রের যাবতীয় উন্নয়ন ও অর্জন বিফলে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার মুশফিকুর রহমান। রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
এসএসসি, দাখিল ও এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষা-২০২৬ উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ‘শিক্ষা সাফল্য সম্মাননা ও অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থী সম্মাননা’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, শিক্ষক, অভিভাবক ও কৃতী শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, “শিক্ষা হলো জাতির মূল ভিত্তি। যেকোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আমি শিক্ষাকেই সবার আগে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছি।” শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গঠনে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, “প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটি বড় স্বপ্ন থাকতে হবে। প্রথমে স্বপ্ন দেখতে হবে, এরপর সেই লক্ষ্যের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমেই সফলতা অর্জন সম্ভব।”
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. এ পি জে আবদুল কালামের উদ্ধৃতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, “স্বপ্ন সেটা নয় যা মানুষ ঘুমিয়ে দেখে, স্বপ্ন সেটাই যা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না।”
শিক্ষা ব্যবস্থার অগ্রগতিকে একটি ‘টিমওয়ার্ক’ হিসেবে উল্লেখ করে ডিসি জানান, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অভিভাবকদের সমন্বয়ে কাজ করতে হবে। ময়মনসিংহ বিভাগে এবার নেত্রকোনা প্রথম স্থান অর্জন করেছে এবং জেলায় কোনো প্রতিষ্ঠানে শতভাগ অনুত্তীর্ণের ঘটনা নেই- যা একটি ইতিবাচক অর্জন। যেসব প্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিত ফল করতে পারেনি, তাদের আত্মসমালোচনা করে নতুন উদ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর তাগিদ দেন তিনি।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুন মুন জাহান লিজা তার বক্তব্যে জাতীয় পর্যায়ে শীর্ষস্থান অর্জন এবং শতভাগ পাসের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য জাতীয় পর্যায়ে প্রথম হওয়া এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্তির দিক থেকেও শীর্ষে থাকা।” খারাপ ফল করা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান যেন শতভাগ পাস করে সেই লক্ষ্যে কাজ করার তাগিদ দেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের শুধু জিপিএ-৫ এর পেছনে না ছুটিয়ে নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে লিজা বলেন, “আমরা শুধু ভালো ফলাফলের কথা ভাবছি, ভালো মানুষ তৈরির নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের জায়গা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। শিক্ষার্থীদের মোবাইল আসক্তি থেকে দূরে রাখতে হবে এবং শিক্ষক-অভিভাবকের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তিবোধ জাগ্রত করতে হবে।” আনন্দদায়ক পাঠদানের আহ্বান জানিয়ে তিনি শিক্ষকদের শাসন ও ভালোবাসার সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের ভরসার জায়গা হওয়ার পরামর্শ দেন।
নেত্রকোনার জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর কবীর আহাম্মদ গণিত ও ইংরেজির মতো বিষয়ে দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে বিদ্যালয়েই বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, “কমিটির সমস্যা, শিক্ষক সংকট কিংবা ক্লাসের ঘাটতি-এগুলোকে অজুহাত হিসেবে দেখলে চলবে না। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করতে পারে।” কোচিং বা প্রাইভেট টিউশনির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যালয়ের ভেতরেই বাড়তি সহায়তার পরিবেশ তৈরি এবং ঘন ঘন ক্লাস টেস্ট ও মাসিক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার মান ধরে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
নেত্রকোনা সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিজা খাতুন শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে সুসম্পর্ক ও মিথস্ক্রিয়ার ওপর জোর দেন। পিছিয়ে পড়া স্কুলগুলোকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর উদ্যোগকে ইতিবাচক উল্লেখ করে তিনি বলেন, “অন্যদের পুরস্কার পেতে দেখলে পিছিয়ে পড়াদের মধ্যেও ভালো করার ইচ্ছে জাগ্রত হবে।” বর্তমান সময়ের ডিজিটাল চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে শিক্ষার্থীরা মোবাইলে ব্যাপকভাবে আসক্ত। আগের তুলনায় এখন পড়াশোনায় ফোকাস রাখাটা অনেক কঠিন।” তবে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই পরিস্থিতি উত্তরণ সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে বাছাইকৃত ১১ জন অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থীকে অনুষ্ঠানে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়। চরম দারিদ্র্য, ভূমিহীন পরিবার কিংবা শারীরিক প্রতিবন্ধকতার মতো বাধাকে জয় করে তারা প্রত্যেকেই জিপিএ-৫ অর্জন করেছে।
সম্মাননাপ্রাপ্তদের মধ্যে অন্যতম হলো- সালমান ফারসি: বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থী, দত্ত উচ্চ বিদ্যালয় (নেত্রকোনা সদর)। পার্বন রাণী কর্মকার: পেশায় কামারের সন্তান, গোপালাশ্রম ভৈরব চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় (আটপাড়া)। অর্পনা রানী শিল: পেশায় নাপিতের সন্তান, বাকলজোড়া নয়াপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় (দুর্গাপুর)। রোমানা আক্তার শশী: ভূমিহীন কৃষকের সন্তান, প্রতিদিন ৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে গিয়ে জিপিএ-৫ অর্জনকারী, জয়হরি স্প্রাই সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় (কেন্দুয়া)। এছাড়াও বারহাট্টা, মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী, কলমাকান্দা ও পূর্বধলা উপজেলার আরও সাতজন দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীকে তাদের কৃতিত্বের জন্য পুরস্কৃত করা হয়।
অনুষ্ঠানে সর্বোচ্চ পাসের হারের ভিত্তিতে জেলার শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও সম্মাননা জানানো হয়। এসএসসি পরীক্ষায় শতভাগ পাসের হার নিয়ে জেলার শীর্ষে রয়েছে কেন্দুয়ার শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ। ৯৬.৯৭% ও ৯৩.০২% পাসের হার নিয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে নেত্রকোনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং কেন্দুয়ার সাজিউড়া উচ্চ বিদ্যালয়। দাখিল পরীক্ষায় ৮৫.২৯% পাসের হার নিয়ে সেরা হয়েছে কলমাকান্দার রামনাথপুর ডি.এস দাখিল মাদ্রাসা এবং ভোকেশনালে শতভাগ পাস নিয়ে শীর্ষে রয়েছে পূর্বধলার ইকরা টেকনিক্যাল এন্ড বি এম কলেজ।
পড়ুন : সরাইলে রায়হান হত্যা মামলার আসামির কারাগারে মৃত্যু


