মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সংস্কার ও নতুন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে দেশটির ওপর ফের হামলা হলে আরও দ্রুত, কঠোর ও ‘বেদনাদায়ক’ জবাব দেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ইরানের অর্থমন্ত্রী আলী মাদানিজাদেহ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের জবাব সংস্কারের মাধ্যমে দেওয়া হবে। নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান তার নীতি পরিবর্তন করবে—এমন ধারণাও তিনি নাকচ করেন।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে মাদানিজাদেহ বলেন, দেশের অর্থনীতি সংস্কারের দায়িত্ব ইরান সরকার ও জনগণের, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের নয়।
এর আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী মোর্তেজা জামানিয়ান জানান, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সমস্যাগুলো সমাধানে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ সদর দপ্তর’ আরও জোরালোভাবে কাজ করছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম এ তথ্য জানিয়েছে।
রোববার পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝতে হবে যে পরিস্থিতি আগের মতো নেই।
তিনি বলেন, এখন থেকে ইরানের স্বার্থ ও নিরাপত্তার ওপর যেকোনো হামলার জবাব আরও দ্রুত, শক্তিশালী ও কঠোরভাবে দেওয়া হবে।
আগস্টের বেশির ভাগ সময় সামরিক হামলা বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, শনিবার তারা ইরানের তিনটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এর আগে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর দুটি মার্কিন নৌযান লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে।
রোববার ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই জানান, হরমুজ প্রণালির বাইরে একটি নতুন নিয়ন্ত্রিত এলাকা ঘোষণা করা হবে। এর আওতায় পারস্য উপসাগরের কিছু অংশও থাকবে। নতুন ওই এলাকায় প্রবেশকারী যেকোনো জাহাজকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং তেল রপ্তানি বন্ধে চাপ বাড়তে থাকায় ইরানের অর্থনীতির ওপর সংকটও গভীর হচ্ছে। রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে দেশটির তিনজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই চাপ মোকাবিলা করা ইরানের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
গালিবাফ বলেন, সামরিক লড়াইয়ের পাশাপাশি ইরানের প্রধান লড়াই এখন উৎপাদন ও মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে। মুদ্রার দামে বড় ধরনের ওঠানামা, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং বাজার ব্যবস্থাপনাকে তিনি দেশের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তার ভাষ্য, ইরানের জনগণ কঠিন পরিস্থিতি সহ্য করতে পারে; কিন্তু অব্যবস্থাপনা বা নিষ্ক্রিয়তা মেনে নিতে পারে না। তারা সরকারের কাছ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ আশা করছে।
ইরান বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদক দেশ। যুদ্ধ শুরুর আগে দেশটির অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ খার্গ দ্বীপের রপ্তানি কেন্দ্র দিয়ে বিদেশে পাঠানো হতো। এপ্রিলের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানির ওপর অবরোধ শুরু করার পর ওই তেল সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে।
ইরানের তেলমন্ত্রী মোহসেন পাকনেজাদ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, গত কয়েক মাসে খার্গ দ্বীপে প্রায় ৫৫০ বার হামলা হয়েছে। তবে এত হামলার পরও দ্বীপটির কার্যক্রম চালু রয়েছে বলে জানান তিনি।
গত ৩১ আগস্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খার্গ দ্বীপ ধ্বংসের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। এরপর ইরানি কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলেছিল, দ্বীপটিতে হামলা হলে তারা কঠোর জবাব দেবে।
ইরান হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট দাবি করেছেন, এখনো হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৯০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হচ্ছে। প্রণালির বাইরে থাকা বিকল্প পাইপলাইনগুলো বিবেচনায় নিলে যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি তেল সরবরাহ এখনো অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে শনিবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর দুটি মার্কিন নৌযান লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের তিনটি জাহাজে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে একটি জাহাজ খার্গ দ্বীপের উপকূলের কাছে ছিল।
পড়ুন: কেপ ভার্দেতে বাস খাদে পড়ে ২৫ শিশু-কিশোর নিহত
আর/


