নারিকেল, পান আর সুপারি—এই তিনে মিলেই দ্বীপজেলা ভোলার চরফ্যাশনের চিরচেনা গ্রামীণ অর্থনীতির পরিচয়। তবে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীবেষ্টিত উপকূলীয় এই উপজেলায় কৃষির চিত্রে এখন যুক্ত হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। পাকার অপেক্ষা না করে কাঁচা ডাব বিক্রি করেই ভাগ্যের চাকা ঘুরছে উপকূলীয় কৃষকদের। স্বাদ, পুষ্টি ও চাহিদার কারণে চরফ্যাশনের মিষ্টি ডাব এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে বেশ জনপ্রিয়। কম খরচ, তুলনামূলক কম পরিচর্যা এবং সারা বছর আয়—সব মিলিয়ে ডাব চাষেই নতুন স্বপ্ন দেখছেন কৃষকরা।
একসময় নারিকেল গাছ ছিল মূলত বাড়ির উঠোনের সৌন্দর্য কিংবা মৌসুমি আয়ের উৎস। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। বাজারে পাকা নারিকেলের তুলনায় কাঁচা ডাবের চাহিদা ও দাম বেশি হওয়ায় কৃষকরাও এখন নারিকেল পাকার জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেন না। গাছ থেকেই কাঁচা ডাব সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন তারা।
রসুলপুর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল খালেক ব্যাপারী আমারদেশকে জানান, তাঁর প্রায় ৪০০টি নারিকেল গাছ রয়েছে। এসব গাছ থেকে বছরে প্রায় ৫ লাখ টাকারও বেশি ডাব বিক্রি করছেন তিনি। একই এলাকার কৃষক মতিন মোল্লাও অনুকূল আবহাওয়া ও সঠিক পরিচর্যার কারণে চলতি মৌসুমে লক্ষাধিক টাকার ডাব বিক্রি করেছেন।
অন্যদিকে চরমানিকা ইউনিয়নের কৃষক সিয়াম উদ্দিন বলেন, আগে নারিকেল চাষে তেমন লাভ হতো না। বর্তমানে এক একর জমিতে থাকা প্রায় ১৫০টি নারিকেল গাছ থেকে সারা বছর ডাব বিক্রি করে তিনি স্বাবলম্বী হয়েছেন। তাঁর মতে, ধান চাষের তুলনায় ডাব চাষে খরচ ও পরিশ্রম কম, অথচ আয় তুলনামূলক বেশি। ফলে সারা বছরই গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ সচল থাকছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চরফ্যাশনের ২১টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে নারিকেলের আবাদ হচ্ছে। চলতি বছর এ খাত থেকে প্রায় ৪০ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। শুধু কৃষকরাই নন, ডাবের বাণিজ্যকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বড় ধরনের কর্মসংস্থানও। উপজেলার ১৩০টির বেশি আড়তের আওতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ জন হকার বিভিন্ন এলাকা থেকে ডাব সংগ্রহ করেন। পাশাপাশি পরিবহন শ্রমিক, মাঝি, পাইকার, আড়তদারসহ হাজারো মানুষের জীবিকা এখন এই খাতের সঙ্গে যুক্ত।
মাঠপর্যায়ে কৃষকরা প্রতিটি ডাব ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি করলেও ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বড় শহরের খুচরা বাজারে একই ডাব ১২০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। গাছে ওঠার মজুরি, পরিবহন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীরাও ডাবপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত লাভ করছেন বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
বিশেষ করে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের সময় ডাবের পানির চাহিদা বেড়ে যায়। চিকিৎসকরাও অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের পর্যাপ্ত তরল গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ফলে বছরের বিভিন্ন সময়ে ডাবের বাজারে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। বর্তমানে প্রতিদিন ট্রাক ও লঞ্চযোগে চরফ্যাশন থেকে হাজার হাজার ডাব ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যাচ্ছে।
শুধু প্রচলিত বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই ডাবের বাণিজ্য। প্রযুক্তির ব্যবহার করে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন চরফ্যাশনের তরুণ উদ্যোক্তারা। ফেসবুক পেজ, অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি অর্ডার নিয়ে গ্রাহকের বাড়িতে টাটকা ডাব পৌঁছে দিচ্ছেন তারা। এতে একদিকে যেমন ভোক্তারা সহজে তাজা ডাব পাচ্ছেন, অন্যদিকে উদ্যোক্তারাও তৈরি করছেন নতুন ব্যবসার ক্ষেত্র।
বিশ্বজুড়ে ডাবের পানি স্বাস্থ্যকর পানীয় হিসেবে জনপ্রিয়তা পাওয়ায় ভবিষ্যতে ডাব ও নারিকেলভিত্তিক বিভিন্ন পণ্য প্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানিরও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে চরফ্যাশনের কিছু উদ্যোক্তা ডাব ও নারিকেলভিত্তিক পণ্য দেশের বাইরের বাজারে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন।
চরফ্যাশন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নাজমুল হুদা বলেন, “রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে চরফ্যাশন তথা ভোলার ডাবের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এখানকার ডাব আকারে যেমন বড়, তেমনি এর ভেতরের পানির পরিমাণ ও মিষ্টতাও বেশি। ধীরে ধীরে চরফ্যাশনের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারিকেল ও ডাব গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিচ্ছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে উন্নত জাতের নারিকেল চারা বিতরণ, বালাই ব্যবস্থাপনাসহ কৃষকদের প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।”
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় উপকূলীয় অঞ্চলে ডাব ও নারিকেল চাষ একটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষি মডেল হতে পারে। উপকূলের মাটি ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে চরফ্যাশনে পরিকল্পিতভাবে ডাব উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি একটি আধুনিক ‘ডাব প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল’ গড়ে তোলা সম্ভব।
সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা গেলে চরফ্যাশনের ডাব শুধু দেশের বাজারেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও জায়গা করে নিতে পারে। এতে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান এবং শক্তিশালী হবে স্থানীয় অর্থনীতি। আর সেই সম্ভাবনার হাত ধরেই চরফ্যাশনের ডাব একদিন হয়ে উঠতে পারে উপকূলীয় অর্থনীতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি।
পড়ুন : ভ্রাতৃত্বের মেলবন্ধনকে ধ্বংসের অপ্চেষ্টা চালাচ্ছে চক্রান্তকারীরা: রিজভী
সা/


