বিজ্ঞাপন

প্রশ্নের মুখে ‘পিংক বাস’: মেয়াদহীন গাড়ীতে নতুন রং, মাসে লোকসান ১২ লাখ!

বিজ্ঞাপন

নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করতে গত ১৮ আগস্ট চালু করা হয় ‘পিংক বাস’ সার্ভিস। ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ তথা ‘পিংক বাস সার্ভিস’ এর উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। গোলাপি রঙের বাস দিয়ে শুরু হওয়া এই বিশেষ সার্ভিস উদ্বোধনের দিনই ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে পরিণত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা হলেও নারীদের নিরাপত্তায় সরকারের উদ্যোগটি প্রশংসিত হয়। তবে চালুর এক মাস না পেরোতেই পিংক বাস সার্ভিস নিয়ে উঠে এসেছে নানা প্রশ্ন। গণমাধ্যমের এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৪টি বাসের মধ্যে ছয়টিরই আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে। অন্য আটটি বাসের আয়ুষ্কাল রয়েছে মাত্র পাঁচ বছর। অর্থাৎ পুরোনো বাসে নতুন রং ও মোড়ক লাগিয়ে সড়কে নামানো হয়েছে। পাশাপাশি এই সার্ভিস পরিচালনা করতে গিয়ে মাসে প্রায় ১২ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) নথি অনুযায়ী, ‘নারায়ণগঞ্জ-ব-১১-০০৮৪’ বাসটি তৈরি হয় ২০১১ সালে। বাসটির নির্ধারিত আয়ুষ্কাল ১৫ বছর। বিআরটিএ থেকে এর ফিটনেস সনদ দেওয়া হয় ২০১১ সালের ২০ নভেম্বর। সে হিসাবে ২০২৬ সালে বাসটির আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে। এরপরও নতুন রং ও মোড়ক দিয়ে বাসটি সড়কে নামানো হয়েছে।

নারীদের নিরাপত্তার জন্য চালু করা ১৪টি বাসের প্রায় অর্ধেকেরই আয়ুষ্কাল শেষ। তথ্য অনুযায়ী, ছয়টি বাসের ১২ বছরের আয়ুষ্কাল ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বাকি আটটি বাসের আয়ুষ্কাল রয়েছে মাত্র পাঁচ বছর।

আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া বাসগুলো পরিচালনার পাশাপাশি সার্ভিসটি লোকসানেও চলছে। নথির তথ্য বলছে, গত ২৭ ও ৩০ আগস্ট দেশের ১০টি ডিপো থেকে ১৪টি পিংক বাস মোট ৩০টি ট্রিপ পরিচালনা করে। এ সময়ে ১ হাজার ৭৯২টি টিকিট বিক্রি করে আয় হয় ২৭ হাজার ৪২ টাকা। বিপরীতে দুই দিনে জ্বালানি, টোল, বেতনসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ১৪৯ টাকা। ফলে লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ১০৭ টাকা। অর্থাৎ দিনে গড়ে লোকসান হয়েছে প্রায় ৬১ হাজার টাকা।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান বলেন, পিংক বাসের আয়ুষ্কাল শেষের যে অভিযোগ উঠেছে, এতে এমন একটা উদ্যোগ হোঁচট খেয়েছে। চাহিদার সঙ্গে যোগানের সমন্বয় করে আরও পরিকল্পিতভাবে যদি উদ্যোগটা চালু করতে পারতাম, তাহলে এই বাস সার্ভিস টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা থাকতো।

বেসরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া হলে পিংক বাস সার্ভিস আরও ফলপ্রসূ উদ্যোগে পরিণত হবে বলে মত দেন তিনি।

তিনি জানান, সরকার রুট নির্ধারণ করাসহ অবকাঠামোগত সাপোর্ট দেবে। বাস স্টপেজ, কাউন্ডার ও টিকিটিং সিস্টেমটা মেনটেইন করবে। এদিকে বেসরকারিভাবে আরও বাস যুক্ত করতে হবে। কারণ, তাদের মাথায় ব্যথা থাকবে কীভাবে সেবা দিয়ে উদ্যোগটি ধরে রাখতে হবে। শুধুমাত্র বিআরটিসির ডাবল ডেকার দিয়ে এই সার্ভিসে দীর্ঘমেয়াদী টেকসই সম্ভব নাও হতে পারে।

পিংক বাস সার্ভিসে আয়ুষ্কালহীন বাস চালানোর বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা। গণমাধ্যমকে তিনি জানান, ‘২০১৮ ও ১০১৯ সালের পর আমার বহরে কোনো নতুন গাড়ি আসেনি। এটা সরকারের সর্বোচ্চ মহল পর্যন্ত জানেন।’

সড়কে এমন বাস কেন নামানো হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রয়োজনের খাতিরে এ গাড়িগুলো চালু করা হয়েছে। আবার যখন নতুন বাস আসবে তখন রিপ্লেসমেন্ট করে ফেলব।

লোকসানের বিষয়টিও স্বীকার করেছেন আব্দুল লতিফ মোল্লা। বিআরটিসির চেয়ারম্যান বলেন, লাভে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। ব্যর্থ হলে ফের টাকা চাওয়া হবে সরকারের কাছে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের জন্য পৃথক বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগটি প্রয়োজনীয় ও ইতিবাচক। তবে বাসের মান, নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা এবং পরিচালনাগত দক্ষতা নিশ্চিত না করে শুধু নতুন নামে পুরোনো বাস চালু করা হলে এর মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে শুধু নারীচালক ও নারী কন্ডাক্টর নিয়োগ যথেষ্ট নয়। বাসের ফিটনেস, বয়স, যান্ত্রিক সক্ষমতা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে যাত্রী সহায়তার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া বাস ব্যবহার করলে মাঝপথে বিকল হওয়া কিংবা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এতে নারীদের নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে চালু করা সেবাটিই অনিরাপত্তার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

তাদের মতে, গণপরিবহন সেবায় যাত্রীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি নির্ভরযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ। পুরোনো বাস বারবার বিকল হলে নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়বে। এতে ধীরে ধীরে যাত্রীদের মধ্যে এই সেবার প্রতি আস্থা কমে যেতে পারে।

তথ্যসূত্র: স্টার নিউজ

পড়ুন: আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েই চলেছে জ্বালানি তেলের দাম

আর/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন