বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক কফি দিবস আজ

সকালের ঘুম কাটাতে এক কাপ গরম কফি, কাজের ফাঁকে আড্ডা কিংবা বৃষ্টির দিনে জানালার পাশে বসে কফিতে চুমুক—অনেকের দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ হয়ে উঠেছে জনপ্রিয় এই পানীয়। বিশ্বজুড়ে কফিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। একসময় যার উৎপাদন মূলত ব্রাজিল, কলম্বিয়া, ইথিওপিয়া কিংবা ভিয়েতনামের মতো দেশের সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত ছিল, সেই কফি এখন ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে বাংলাদেশের পাহাড়েও।

বিজ্ঞাপন

আজ ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কফি দিবস। কফির অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত কৃষকদের জীবন ও জীবিকার বিষয়টি সামনে আনতেই দিবসটি পালিত হয়। কফির একটি কাপের পেছনে যে দীর্ঘ কৃষি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা রয়েছে, আন্তর্জাতিক কফি দিবসে সেই শ্রম ও সম্ভাবনার কথাও নতুন করে আলোচনায় আসে।

এক কাপ কফি হাতে নেওয়ার আগে এর পেছনের দীর্ঘ পথের কথা অনেকেরই মনে থাকে না। কফির বীজ থেকে চারা, চারা থেকে গাছ, এরপর ফল উৎপাদন ও সংগ্রহ—সবশেষে বীজ আলাদা করা, শুকানো, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ভাজাইয়ের পর কফি পৌঁছে যায় ভোক্তার কাপে। এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের শ্রম।

আন্তর্জাতিক কফি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ কৃষক পরিবার কফি চাষের সঙ্গে যুক্ত। ফলে কফি শুধু জনপ্রিয় একটি পানীয় নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বহু পরিবারের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ক্ষুদ্র কৃষক, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতেও কফি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশে কফি চাষের ইতিহাসও নতুন নয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রকল্পসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, ১৯৬১ থেকে ১৯৬২ সালের দিকে চট্টগ্রাম পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আফ্রিকা থেকে সংগ্রহ করা কফির চারা অন্যান্য ফলের চারার সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় রোপণ করেছিল। তবে সে সময় কফি বিক্রি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় অনেক কৃষক পরবর্তী সময়ে কফির গাছ কেটে ফেলেন।

দীর্ঘ সময় পর আবারও দেশের পাহাড়ি এলাকায় কফি চাষ নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সরকারি গবেষণা ও প্রকল্পসংক্রান্ত বিভিন্ন নথিতে বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি অঞ্চলকে কফি চাষের জন্য সম্ভাবনাময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব এলাকার মাটি, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি পরিবেশ কফি চাষের জন্য উপযোগী হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

কফি নিয়ে গবেষণাও এগিয়ে চলছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের আওতায় পাহাড়ি এলাকায় কফির বিভিন্ন জাত ও বংশগত উপাদান নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। খাগড়াছড়ির পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে রোবাস্তা কফির একাধিক বংশগত উপাদান নিয়ে গবেষণা হয়েছে। রাঙামাটির রাইখালী এলাকাতেও কফি নিয়ে গবেষণা পরিচালিত হয়েছে।

বিশ্বে কফির অসংখ্য জাত থাকলেও আরবিকা ও রোবাস্তা সবচেয়ে পরিচিত দুই ধরনের কফি। বাংলাদেশেও এই দুই ধরনের কফি নিয়ে গবেষণা চলছে। দেশের মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে কোন জাত বেশি মানানসই, কোন জাত থেকে ভালো ফলন পাওয়া যেতে পারে এবং রোগবালাইসহ বিভিন্ন সমস্যা কীভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব—গবেষণার মাধ্যমে সেসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশে রোবাস্তা ধরনের একটি কফির জাত ‘বারি কফি-১’ নামে অবমুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি আরবিকা ধরনের আরেকটি জাত নিয়েও গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে।

কফি চাষের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে গত কয়েক বছরে পাহাড়ি এলাকার কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে কফি চাষের এলাকা সম্প্রসারণ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

২০২৫ সালেও রাঙামাটিতে কফি ও কাজুবাদাম চাষ সম্প্রসারণ নিয়ে কৃষি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। রাঙামাটি সদর, নানিয়ারচর, কাপ্তাই ও কাউখালীসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষি কর্মকর্তারা এতে অংশ নেন। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকাতেও কফি চাষে কৃষকদের সহায়তা দেওয়ার কার্যক্রম রয়েছে।

তবে সম্ভাবনা থাকলেই কফি চাষ বড় পরিসরে সফল হবে—এমন নয়। কফি গাছের পরিচর্যা, ছায়া ব্যবস্থাপনা, পানি ও সার প্রয়োগ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক সময়ে ফল সংগ্রহের মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ি অঞ্চলের ঢালু জমি, ভারী বৃষ্টিতে মাটিক্ষয়, মাটির অম্লতা এবং সেচের সীমাবদ্ধতার মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন পাওয়া কঠিন হতে পারে।

বাংলাদেশের কফির বাজার এখনো মূলত আমদানিনির্ভর। মানুষের কফি পানের অভ্যাস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর চাহিদাও বাড়ছে। ফলে দেশের পাহাড়ি এলাকায় কফি উৎপাদন বাড়ানো গেলে স্থানীয় কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি পাহাড়ি কৃষিতে আসতে পারে নতুন বৈচিত্র্য।

তবে উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, মানসম্মত চারা সরবরাহ, প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ তৈরি এবং বাজারের সঙ্গে কৃষকদের কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলাও জরুরি। কারণ শুধু কফি উৎপাদন করলেই হবে না; উৎপাদিত কফি যথাযথভাবে প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করতে পারলেই কৃষক এর প্রকৃত অর্থনৈতিক সুফল পাবেন।

একসময় পর্যাপ্ত বাজার ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগের অভাবে বাংলাদেশের পাহাড়ে কফি চাষের সম্ভাবনা বড় পরিসরে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। কয়েক দশক পর সেই কফিকে ঘিরেই আবার তৈরি হয়েছে নতুন আগ্রহ। গবেষণা, সরকারি সহায়তা, কৃষকের প্রশিক্ষণ এবং বাজারব্যবস্থা সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে পারলে পাহাড়ি কৃষিতে কফি হয়ে উঠতে পারে নতুন সম্ভাবনার একটি খাত।

আন্তর্জাতিক কফি দিবসে তাই কফির কাপের পাশাপাশি সামনে আসছে সেই কাপের পেছনে থাকা কৃষকের গল্পও। বাংলাদেশের পাহাড়ি কৃষকেরা যদি কফি চাষের মাধ্যমে স্থায়ী আয় ও ন্যায্য বাজার পান, তাহলে দেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে এই কফি।

পড়ুন:ড. আবু কালাম শামসুদ্দীনের একক চিত্রপ্রদর্শনী শুরু ২ অক্টোবর

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন