চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার নায়েরগাঁও খাদ্য গুদাম (এলএসডি) যেন অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির এক নীরব চিত্র। সরকারি খাদ্যশস্য সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ এ স্থাপনার একদিকে দুর্বল ও জরাজীর্ণ সীমানা প্রাচীর, অন্যদিকে পুরোনো প্রধান ফটক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনবল সংকট, সিসিটিভি ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সমস্যা এবং গুদামের প্রবেশপথের সামনে ইজিবাইক-অটোরিকশার অবাধ অবস্থান। সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি খাদ্যশস্যের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত নায়েরগাঁও খাদ্য গুদামে?
ধনকতা নদীর পাড়ে প্রায় এক একর ছয় শতাংশ জমির ওপর ১৯৮৩ সালে নায়েরগাঁও বাজার এলাকায় গড়ে ওঠে এ খাদ্য গুদাম। প্রায় ৫০০ টন ধারণক্ষমতার এ গুদামটি মতলব দক্ষিণ উপজেলার খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার চার দশক পেরিয়ে গেলেও অবকাঠামোগত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
দুর্বল সীমানা প্রাচীর, ঝুঁকিতে সংরক্ষিত এলাকা
সরেজমিনে দেখা যায়, গুদামের চারপাশের সীমানা প্রাচীর দীর্ঘদিনের পুরোনো। কোথাও কোথাও প্রাচীরের অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্তমানে প্রাচীরের উচ্চতা প্রায় সাড়ে ৬ থেকে ৭ ফুট হলেও আশপাশে অট্টালিকা ও অন্যান্য স্থাপনা গড়ে ওঠায় আগের তুলনায় নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে।
স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিদের প্রশ্ন, একটি সরকারি খাদ্য গুদাম যদি ‘সংরক্ষিত এলাকা’ হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে তার সীমানা প্রাচীর দুর্বল অবস্থায় পড়ে থাকবে কেন?
তাদের দাবি, বর্তমান প্রাচীর সংস্কারের পাশাপাশি উচ্চতা বাড়িয়ে প্রায় ১০ ফুট করা এবং ওপরের অংশে নিরাপত্তা বেষ্টনী স্থাপন করা প্রয়োজন।
গেটে তালা, সামনে ইজিবাইক—‘সংরক্ষিত এলাকার’ নিরাপত্তা কোথায়?
খাদ্য গুদামের প্রধান ফটকের পাশে ‘সংরক্ষিত এলাকা—বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ’ লেখা সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সেই ফটকের সামনেই নিয়মিত ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে।
ফলে সরকারি খাদ্যশস্য বহনকারী ট্রাক বা অন্য কোনো যানবাহন গুদামে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে পারে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে গুদামের সামনের জায়গাটি কার্যত অনানুষ্ঠানিক যানবাহন স্ট্যান্ডে পরিণত হয়েছে।
এতে শুধু যান চলাচলই ব্যাহত হচ্ছে না, সংরক্ষিত সরকারি স্থাপনার প্রবেশপথের নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
সিসিটিভি আছে, কিন্তু নজরদারি কতটা কার্যকর?
গুদামের নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবস্থা থাকার কথা থাকলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সিসিটিভি ক্যামেরা সংক্রান্ত সমস্যা কয়েক বছর ধরে বিদ্যমান এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
জানা গেছে, ‘বেক্সিমকো’ নামের একটি কোম্পানি ক্যামেরা সংযোগের কাজ করে। তবে দীর্ঘদিন ধরে যদি ক্যামেরা ব্যবস্থা নিয়ে সমস্যা থেকে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কারণ খাদ্য গুদামের মতো স্পর্শকাতর সরকারি স্থাপনায় সিসিটিভি শুধু আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নয়; কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তা শনাক্ত ও তদন্তের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দুই নিরাপত্তা প্রহরীর পদ, দায়িত্বে একজন
নায়েরগাঁও খাদ্য গুদামের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরেকটি বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা দিয়েছে জনবল সংকট।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এখানে নিরাপত্তা প্রহরীর দুটি পদ রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন। নিরাপত্তা প্রহরী আব্দুর রহমান প্রায় চার বছর ধরে এখানে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে।
একজন নিরাপত্তাকর্মী দিয়ে ৫০০ টন ধারণক্ষমতার একটি সরকারি খাদ্য গুদামের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব—এ প্রশ্নের উত্তরও খুঁজছেন স্থানীয়রা।
পরিদর্শক-উপসহকারী পরিদর্শক পদেও সংকট
গুদামে একজন পরিদর্শক ও একজন উপসহকারী পরিদর্শকের পদ রয়েছে। এর মধ্যে উপসহকারী পরিদর্শকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অর্থাৎ প্রশাসনিক তদারকি থেকে শুরু করে খাদ্যশস্য সংরক্ষণ, মজুত ও বিতরণ কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় জনবল ঘাটতি রয়েছে। এ অবস্থায় অতিরিক্ত দায়িত্বের ওপর নির্ভর করেই চলছে গুদামের কার্যক্রম।
মূল দায়িত্ব মতলব উত্তরে, অতিরিক্ত দায়িত্ব নায়েরগাঁওয়ে
নায়েরগাঁও খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে বর্তমানে ওসমান গনি দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তার মূল দায়িত্ব মতলব উত্তর উপজেলার খাদ্য গুদামে। তিনি গত ১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে নায়েরগাঁও খাদ্য গুদামে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
একজন কর্মকর্তাকে একই সঙ্গে একাধিক গুদামের দায়িত্ব পালনের ফলে নিয়মিত তদারকি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে কোনো ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
রাস্তা কাঁচা, বৃষ্টিতে কাদা—খাদ্য পরিবহনেও ভোগান্তি
গুদামের নিরাপত্তার পাশাপাশি অবকাঠামোগত সমস্যাও প্রকট। গুদামের সামনের রাস্তা কাঁচা হওয়ায় বৃষ্টির সময় কাদায় পরিণত হয়। এতে খাদ্যশস্য পরিবহনকারী ট্রাকসহ ভারী যানবাহন চলাচলে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি খাদ্য গুদামের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সামনে দীর্ঘদিনেও একটি ভালো যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়া দুঃখজনক।
চার দশকের পুরোনো গুদাম, নজরদারি কতটা?
১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত নায়েরগাঁও খাদ্য গুদামটি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থায় ভূমিকা রেখে আসছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে আশপাশের এলাকায় জনবসতি ও স্থাপনা বাড়লেও গুদামের নিরাপত্তা অবকাঠামো সেই অনুপাতে আধুনিকায়ন হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিশেষ করে দুর্বল সীমানা প্রাচীর, পুরোনো গেট, সিসিটিভি নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যা, নিরাপত্তাকর্মীর ঘাটতি এবং প্রবেশপথে যানবাহনের জট—এই পাঁচটি বিষয়কে একই সঙ্গে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
দ্রুত পদক্ষেপের দাবি
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, বিষয়টি কেবল একটি গুদামের সৌন্দর্যবর্ধনের প্রশ্ন নয়; এটি সরকারি খাদ্যশস্যের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
তাদের দাবিগুলো হলো—
- জরাজীর্ণ সীমানা প্রাচীর দ্রুত সংস্কার ও শক্তিশালী করা;
- প্রাচীরের উচ্চতা বাড়িয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী স্থাপন;
- প্রধান ফটক সংস্কার ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা;
- কার্যকর সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করা;
- শূন্য পদে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ;
- দুই নিরাপত্তা প্রহরীর পদে পূর্ণ জনবল নিশ্চিত করা;
- গুদামের প্রধান ফটকের সামনে ইজিবাইক ও অটোরিকশা পার্কিং বন্ধ করা;
- গুদামের সামনের রাস্তা দ্রুত পাকাকরণ করা।
স্থানীয়দের প্রশ্ন একটাই—সরকারি খাদ্য গুদামে বড় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার আগেই কি কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে, নাকি ঝুঁকি আরও বাড়ার অপেক্ষা করবে?
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট খাদ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
পড়ুন : রাজধানীতেও কিছুটা লোডশেডিং মেনে নিতে হবে: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা
সা/


