বিজ্ঞাপন

ভাতের চাকাই যেন মৃত্যুফাঁদ!

বিজ্ঞাপন

বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, রোড অ্যাকসিডেন্টে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়াদের মধ্যে শতকরা ১৬ দশমিক ৫ শতাংশই অটোরিক্সায় দূর্ঘটনায় পতিত। আর সাম্প্রতিক সময়ে ইলেকট্রিক থ্রি হুইলার দুর্ঘটনায় আহতের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা ২১ দশমিক ০১ শতাংশ।

ঢাকার অলিগলি থেকে রাজপথ – যেদিকেই চোখ যায়, ব্যাটারিচালিত রিকশার ছুটে চলা। কেউ বলছেন, এটি স্বল্প আয়ের মানুষের জীবিকার আশ্রয়। কেউ বলছেন, গণপরিবহনের ঘাটতি মেটানোর সস্তা সমাধান। আবার কারও কাছে এই বাহন এখন সড়কের নতুন আতঙ্ক। কারণ, শুধু যানজট নয় – বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও।

একসময় যাদের দেখা মিলতো মূলত পাড়া-মহল্লার সরু রাস্তায় – আজ তারাই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ঢাকার প্রধান সড়ক। সিগন্যালের ফাঁক গলে ছুটে চলা, হঠাৎ লেন পরিবর্তন, কখনো কখনো গতি যেন থামতেই চায় না। ঢাকার রাস্তার এই নতুন বাস্তবতার নাম – বাংলার টেসলার কিংবা ব্যাটারিচালিত রিকশা।

২০২৫ সালে ঢাকায় ৪০৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ২১৯ জনের, আহত হন ৫১১ জন। এর মধ্যে নিহতদের ৪৭ দশমিক ০৩ শতাংশ পথচারী আর ৪৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী। বাস, রিকশা, সিএনজি ও অন্যান্য যানবাহনের চালক-যাত্রী মিলে নিহতের হার ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

তবে ঢাকার সামগ্রিক দুর্ঘটনার হিসাব ব্যাটারিচালিত রিকশার আলাদা চিত্র পুরোপুরি তুলে ধরে না। কারণ, এসব বাহনের বড় একটি অংশই এখনো নিবন্ধন ও কেন্দ্রীয় ডাটাবেজের বাইরে। CPD-এর গবেষণা বলছে, ২০২৪ সালে দেশের মোট সড়ক দুর্ঘটনার ১৬ দশমিক ৫ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত ছিল ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার। আর সড়ক দুর্ঘটনায় মোট মৃত্যুর ২১ দশমিক ০১ শতাংশ এসেছে এই যানবাহন সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনা থেকে।

আদতে ঢাকায় কতগুলো ব্যাটারিচালিত রিকশা চলছে? ২০২৫ সালে BRTA-এর হিসাব উদ্ধৃত করে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা ৬০ লাখের বেশি। এর মধ্যে ঢাকায় ১০ থেকে ১২ লাখ পর্যন্ত থাকতে পারে।

অন্যদিকে CPD-এর গবেষণায় ঢাকায় ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলারের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ পর্যন্ত বলে অনুমান করা হয়েছে – যার প্রায় ৯৫ শতাংশই নিবন্ধনের বাইরে। সংখ্যার এই বিশাল পার্থক্যই যেন বলে দেয় – শহরের রাস্তায় বাহন বেড়েছে, কিন্তু হিসাবের খাতায় তার ছায়াটুকুও পুরোপুরি নেই।

অটোরিক্সা বিস্তারের বড় একটি বাঁক এসেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর। BUET-এর একটি গবেষণার তথ্য উদ্ধৃত করে TBS জানিয়েছে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ঢাকার রাস্তায় প্রায় চার লাখ অতিরিক্ত ব্যাটারিচালিত রিকশা যুক্ত হয় এবং পরে সেই সংখ্যা ছয় লাখের ওপরে চলে যায় – যদিও অন্যান্য সংস্থার হিসাব আরও বেশি।

কেন এত মানুষ এই পেশায়? উত্তরটা খুব কঠিন নয়। কেউ গ্রাম থেকে এসেছেন। কেউ কাজ হারিয়েছেন। কেউ শহরে এসে নতুন করে জীবন শুরু করেছেন। আর কেউ কেউ বলছেন – রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের পর আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে জড়িতদের নিজ এলাকায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ায় রাজধানীতে এসে এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন।

অটোচালকদের জন্য এটা জীবিকার চাকা হলেও এটাই এখন অনেকের জন্য হঠাৎ ছুটে আসা বিপদের চাকা হয়ে দাড়িয়েছে। আর এসব দুর্ঘটনার গল্প শুধু সংখ্যায় নয় – প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি অপেক্ষা, একটি অসমাপ্ত জীবনের গল্প।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রধান ঝুঁকি – অতিরিক্ত গতি, দুর্বল বা অনুপযুক্ত ব্রেকিং ব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, অনিয়ন্ত্রিত লেন পরিবর্তন, প্রধান সড়কে বেপরোয়া কিংবা লেন না মেনে চলাচল, নিবন্ধন ও ডাটাবেজের ঘাটতি, মানসম্মত নকশার অভাব, অনিয়ন্ত্রিত চার্জিং ব্যবস্থা।

CPD-এর গবেষণাতেও দুর্বল ব্রেক, ভারসাম্যহীনতা এবং মানসম্মত নকশার অভাবকে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

২০২৪ সালের নভেম্বরে হাইকোর্ট ঢাকার সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধে নির্দেশ দিয়েছিল। পরে উচ্চ আদালতের আদেশে সেই নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে স্থগিত হয়। ২০২৫ সালে DNCC ঘোষণা দেয় – ব্যাটারিচালিত রিকশা প্রধান সড়কে নয়, চলবে অভ্যন্তরীণ সড়কে। একই সঙ্গে BUET-এর নকশায় নিরাপদ ই-রিকশা চালু, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

২০২৬ সালের আগস্টেও সরকার প্রস্তাবিত নীতিতে ঢাকার প্রধান সড়কে ব্যাটারি ও ইলেকট্রিক রিকশা না রাখার কথা জানিয়েছিলো। CPD-এর গবেষণা বলছে, দেশের প্রায় ৪০ লাখ চালক এই খাতের সঙ্গে জীবিকার কারণে যুক্ত এবং প্রতিদিন প্রায় ১১ কোটি ২০ লাখ যাত্রী ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলারের ওপর নির্ভর করেন।

ঢাকার রাস্তা শুধু গাড়ির নয় – এ শহর লাখো মানুষের জীবন-জীবিকারও পথ। একজনের কাছে ব্যাটারিচালিত রিকশা তার পরিবারের ভাতের নিশ্চয়তা। আরেকজনের কাছে সেটা হয়ে উঠতে পারে হাসপাতালের জরুরি দরজা। একজনের কাছে এটি সস্তা যাতায়াত। অন্যজনের কাছে হঠাৎ আসা মৃত্যুভয়।

শহরের চাকা থামানো নয়, চাকার গতি নিয়ন্ত্রণ করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ – জীবিকার চাকা চলুক, কিন্তু সেই চাকার নিচে যেন আর কোনো জীবন না থেমে যায়।

পড়ুন : রাজবাড়ীতে অস্ত্র ও গুলিসহ সন্ত্রাসী মঞ্জুসহ গ্রেপ্তার ২,

ভিডিও : https://www.youtube.com/watch?v=9RK17JPHYjs

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন