ভোলার সাব রেজিস্ট্রার অফিসের বিরুদ্ধে মাসে কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। ভোলার সকল থানার সাব রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে বিশাল সিন্ডিকেট চক্র গঠন করে সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ভুয়া কাগজপত্র বৈধকরণ ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে ৷ এই সিন্ডিকেট চক্র সবসময় ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের সহযোগিতায় পরিচালিত হয়ে আসছে। সাব রেজিস্ট্রার মামুন সিকদারের বিরুদ্ধেও সেই ধারায় শক্তিশালী সিন্ডিকেট গঠন করার অভিযোগ উঠেছে৷
ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়ন বাংলা বাজার এলাকার শরীফ তালুকার নামের এক ভুক্তভোগী জানান, সিন্ডেকেট সদস্য শরীফ পাটাওয়ারীর মাধ্যমে সাফ কাবলা দলিলের জন্য সরকার নির্ধারিত ফির বাহিরেও অতিরিক্ত টাকা দিয়ে তিনি প্রতারিত হয়েছেন৷ তিনি বলেন, ১শতাংশ জমি ১৬ লাখ টাকা বয়মূল্যে সাফ কাবলা দলিলের জন্য ১লাখ ৭১ হাজার টাকা দিয়েছি দলিল লেখক শরীফকে৷ দলিল লেখক আমাকে সাব কাবলার নকল সইমহোর দিয়ে পাঠিয়েছেন কিন্তু মূল দলিল উত্তলনের সময় তিনি দেখেন সাফ কাবলা দলিলের বিপরীতে হেবা -বিল এওয়াজ মূলে দলিল দেওয়া হয়েছে। যেখানে দাতা এবং গ্রহীতার মধ্যে পারিবারিক সম্পর্ক নেই এবং হেবা-বিল এওয়াজ দলীলের নিয়মনীতির মধ্যেও পরে না৷ হেবা বিল এওয়াজ যেখানে সরকারের রাজস্বও বয়মূল্যের ১শতাংশ সেখানে তার কাছ থেকে ১লাখ ৭১ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে৷ ভুক্তভোগী রিয়াজ সিকদার জানান, পূনরায় গ্রহীতার কাছ থেকে তিনি সাফ কাবলা দলীল নিতে অতিরিক্ত ৫ লাখ টাকা বেশি দিতে হয়েছে এবং বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। ভুক্তভোগী আরো জানান, এই প্রতারণার বিষয়ে সাব রেজিস্ট্রার মামুন সিকদারকে জানালে তিনি তার সাথে আরো খারাপ আচরণ করেন৷ এবিষয়ে ভুক্তভোগী শরীফ তালুকদার তার হয়রানির বিচার চেয়েছেন। শরীফ তালুকারের মত এমন অনেক ভুক্তভোগীর একই অভিযোগ পাওয়া গেছে।
চরফ্যাশন দক্ষিণ আইচা চর মানিকা ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের ফরিদ উদ্দিন নামের আরেক ভুক্তভোগী জানান, গেলো মাসে তার ভাই-বোনের মধ্যে হেবা-বিল এওয়াজ দলিল করতে গেলে অতিরিক্ত টাকার জন্য দীর্ঘসময় ঘুরানো করা হয়। পরে সাব রেজিস্ট্রার মামুন সিকদারের সিন্ডিকেট সদস্যের মাধ্যমে দুই ধাপে ৩০ হাজার করে মোট ৬০ হাজার টাকা দিয়ে দলিল করতে হয়েছে তাকে। ওই ভুক্তভোগী জানান, জেলায় মাত্র দুজন সাব রেজিস্ট্রার থাকায় দক্ষিণ আইচা থানায় নিয়মিত অফিস করতে পারেন না ফলে যেসময় করেন তখনও তার চাহিদা মত টাকা দিয়েই দলিল নিবন্ধন করতে হয়৷
এছাড়াও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দলিল লেখক জানান, সরকার নির্ধারিত ফির বাহিরে দলিলের বয় মূল্যের উপর ০.৫ থেকে ১ শতাংশ টাকা দেওয়ার পাশাপাশি ছোট খাটো ত্রুটি দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করেন৷ এসকল অতিরিক্ত টাকা কেরানি বা পেশকারের মাধ্যমে সাব রেজিস্ট্রার মামুন সিকদার নিয়ে থাকেন দলিল লেখকের কাছ থেকে৷ সকল দলিল লেখকের কাছ থেকে একইভাবে টাকা নেওয়ার দাবি তাদের। তারা আরো বলেন, ঘুষের বিরুদ্ধে কথা বললে দলিল লেখকের সনদ বাতিলের হুমকি এবং তার গঠিত সিন্ডিকেট দ্বারা চাপে রাখা হয়, একজন্য ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করেন না৷
অনুসন্ধানে জানা যায়, শুধু ভোলা সদরই নয়, দৌলতখানের বাংলাবাজার, বোরহানউদ্দিন, তজুমদ্দিন, শষীভুষন ও দক্ষিণ আইচা থানার সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে অধিনস্ত পেশকার বা কেরানি, দলিল লেখক ও চিহ্নিত দালালদের সমন্বয়ে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গঠন করেন সাব রেজিস্ট্রার মামুন সিকদার। এসকল থানায় তিনি একাই সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে অফিস করে দলিল নিবন্ধন করেন ৷ সিন্ডিকেট চক্র দলিল নিবন্ধনের প্রতিটি ধাপে সেবাগ্রহীতাদের জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেন। সোর্সদের মাধ্যমে জানা যায়, এই ৬টি থানার অফিসে অভিযুক্ত সাব রেজিস্ট্রার মামুন সিকদার যেদিন অফিস করেন সেইদিন গড়ে ১৫০ থেকে ২০০টি দলিল নিবন্ধিত হয়। সোর্সদের তথ্য মতে জানা যায়, এসকল দলিল নিবন্ধনে সরকারি কমিশনের বাইরে দলিল বয়মূল্যের উপর ০.৫% থেকে ১% অতিরিক্ত “অফিস খরচ” বাবদ আদায় করা হয়। যা থেকে মাসে কোটি টাকারও অধিক ঘুষ বানিজ্য হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে৷
শুধু এই প্রক্রিয়ায় নয়, কাগজপত্রের ত্রুটির নাম ভাঙিয়ে অর্থ আদায় যেমন,এনআইডি বা নামে অসংগতি, প্রয়োজনীয় টিন (TIN) সার্টিফিকেট বা আয়কর রিটার্ন না থাকলে ফাইল আটকে রেখে অতিরিক্ত টাকার আদায়ের পাশাপাশি বেশি মূল্যে নিবন্ধিত দলিলের তথ্য গোপনে কম মূল্যে সাফ-কবলা দলিল সম্পাদনের সুযোগ দিয়ে ও জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ারও অভিযোগ তার বিরুদ্ধে রয়েছে। এই প্রক্রিয়াও ৬টি থানা থেকে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগে আরো জানা যায়, হেবা দলিল নিবন্ধনে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক মর্টগেজ দলিলে ঋণের টাকার অংক অনুযায়ী পার্সেন্টেজ দাবি এবং বালাম বই থেকে নকল বা সত্যায়িত অনুলিপি তুলতে সরকারি ফির অতিরিক্ত ৩হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা ক্ষেত্র বিশেষ বড় অঙ্কের উৎকোচ দিতে বাধ্য করা হয়।
এসকল অভিযোগ পাওয়ার পর প্রতিবেদক ভোলা সদর সাব রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে গেলে প্রকাশ্যে অবৈধ টাকা লেনদেন দেখতে পেয়ে ভিডিও ধারণ করে রাখে৷ পরে অভিযুক্ত সাব-রেজিস্ট্রার মোঃ মামুন সিকদারের উপরোক্ত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তার অফিসে কোনো ধরনের ঘুষ বা অনিয়ম হয় তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। তবে অনুসন্ধানী দলের কাছে থাকা ঘুষ গ্রহণের সুনির্দিষ্ট ভিডিও ফুটেজ প্রদর্শনের পর তিনি কথার সুর পরিবর্তন করেন। পরে ফুটেজ দেখে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন এবং নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে জানান, “আমি অতিরিক্ত টাকা নিয়ে থাকলে বিষয়টি জেলা রেজিস্ট্রারকে (ডিআর) অবহিত করেন৷ তিনি আমার উপরের কর্মকর্তা।
নিয়মিত সেবা নিতে এসে চরম হয়রানি ও অর্থদণ্ডের শিকার হওয়া ভুক্তভোগীরা জানান, সিন্ডিকেটের চাহিদা মতো টাকা না দিলে ফাইল অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখা হয়। ভোলা জেলা ও সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ফিরিয়ে আনতে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযান এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও দালালদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তাদের৷
এবিষয়ে জেলা রেজিস্ট্রার মোঃ আনিসুর রহমান বলেন, তিনি অসুস্থজনিত কারণে ছুটিতে রয়েছেন৷ ঘুষ গ্রহনের ভিডিও এবং সাংবাদিকের সাথে সাব রেজিস্ট্রার মামুন সিকদারের বক্তব্য তার নজরে পড়েছে। ছুটি শেষে অফিসে আসলে তিনি তদন্ত সাপেক্ষে এবিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন৷
পড়ুন : নরসিংদীতে মানব পাচার মামলার আসামি জাকির হোসেন কারাগারে


