জীবনের পড়ন্ত বিকেল। বয়সের ভার আর সংসারের নিত্য টানাপোড়েন- সব মিলিয়ে জীবন এখন বেশ কঠিন। এত শত অভাব-অনটনের মাঝেও একটি জিনিস কখনো থেমে থাকেনি, তা হলো তার সৃষ্টি। সুযোগ পেলেই হাতে তুলে নেন কাগজ-কলম; মনের গহিনে জমে থাকা কথাগুলোকে পরম মমতায় সাজান শব্দের পর শব্দে। কখনো আনমনে সুর তোলেন, কখনোবা নিজেই গেয়ে শোনান নিজের লেখা গান। গানই যেন তাঁর কাছে জীবনের অপর নাম। তিনি নেত্রকোনার মাটি ও মানুষের প্রিয় বাউল কবি সালাম সরকার।
সম্প্রতি নেত্রকোনা কেন্দুয়া পৌরশহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকার নিজ বাড়িতে বসে এই নিভৃতচারী শিল্পীর সঙ্গে কথা হয়। কথায় কথায় তিনি ফিরে যান তার ফেলে আসা দীর্ঘ জীবনের পথে। যে পথের একমাত্র সঙ্গী ছিল গান। তিন দশকেরও বেশি সময়ের সাঙ্গীতিক যাত্রায় তিনি পেয়েছেন অগণিত মানুষের ভালোবাসা আর তুমুল জনপ্রিয়তা। তবে আক্ষেপের বিষয় হলো, দেশের লোকসংগীতে এত বড় অবদান রাখার পরও আজও তার ভাগ্যে জোটেনি কোনো বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।
১৯৬৭ সালের ৪ আগস্ট নেত্রকোনার মদন উপজেলার জয়পাশা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সালাম সরকার। জন্মভূমি মদন হলেও তার জীবনের সিংহভাগ সময় কেটেছে কেন্দুয়ায়। এখানেই তিনি সংসার পেতেছেন, এখানেই তিনি গান লিখেছেন এবং সুরের মূর্ছনায় মাতিয়েছেন শ্রোতাদের। সময়ের আবর্তনে বয়স বেড়েছে, চারপাশের অনেক কিছুই বদলেছে; কিন্তু গানের প্রতি তার নাড়ির টান এতটুকুও বদলায়নি।
গত ত্রিশ বছরেরও বেশি সময়ে তার কলম থেকে জন্ম নিয়েছে দুই হাজারেরও বেশি গান। তার রচিত গান দেশের অসংখ্য জনপ্রিয় শিল্পী কণ্ঠে ধারণ করেছেন। লোকগানের শ্রোতাদের কাছে তার সৃষ্টি ব্যাপকভাবে সমাদৃত। বাউল সালাম সরকারের গানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার সহজ-সরল ও সাবলীল ভাষা। গ্রামীণ মানুষের জীবনবোধ, প্রেম-বিরহ, সুখ-দুঃখ, মানবিক সম্পর্ক এবং লোকজ জীবনের অতি চেনা ছবি তিনি পরম দক্ষতায় গানের কথায় ফুটিয়ে তুলেছেন। ফলে তার গান কেবল মঞ্চ বা নির্দিষ্ট শিল্পীর কণ্ঠে আবদ্ধ থাকেনি, বরং সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে।
জনপ্রিয়তার এত দীর্ঘ পথ পেরোলেও রাষ্ট্রীয় সম্মাননার দরজা তার জন্য আজও খোলেনি। একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার কিংবা স্বাধীনতা পুরস্কারের মতো কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিই এই গুণী শিল্পীর ঝুলিতে নেই। বিষয়টি নিয়ে তার অগণিত ভক্ত-অনুরাগী ও এলাকাবাসীর মনে চাপা আক্ষেপ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বাংলা লোকসংগীতে এই প্রবীণ বাউল ও গীতিকারের দীর্ঘদিনের যে অনবদ্য অবদান, তার যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। সরকার যেন দ্রুত তাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করে, এটাই এখন সবার প্রত্যাশা।
অপ্রাপ্তি নিয়ে চারপাশের মানুষের আক্ষেপ থাকলেও সালাম সরকার নিজে এ বিষয়ে নির্বিকার। নিজের বর্তমান জীবনের রূঢ় বাস্তবতার কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে অনেকটাই কষ্ট করে সংসার চালাতে হচ্ছে। তবু এসবের মধ্যেও গানই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।’
পুরনো আত্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘জীবনে ভক্তদের যে অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছি, হয়তো তার জন্যই এখনো বেঁচে আছি। এখনো নতুন গান লিখছি, গাইছি এবং শ্রোতাদের আরও নতুন কিছু উপহার দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রসঙ্গে তার কণ্ঠে কোনো আক্ষেপ বা অভিযোগ নেই, বরং আছে এক ধরনের দীর্ঘ অপেক্ষা। তিনি বলেন, ‘পুরস্কার বা সম্মাননার আশায় তো কখনো গান করিনি। গান আমার জীবন। জীবনের তাগিদেই গান করি। তবে সরকার যদি আমার সৃষ্টিকে যোগ্য মনে করে, তাহলে অবশ্যই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেবে- আমি সেই অপেক্ষাতেই আছি।’
জীবনের কঠিন বাস্তবতা আর বয়সের ছাপ তার শরীরে দৃশ্যমান হলেও সৃষ্টির জগতে তিনি এখনো অপরাজিত। সময় হয়তো তার শরীরের গতি কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে, কিন্তু কলমকে থামাতে পারেনি। দুই হাজার গান লেখার পরও নতুন সৃষ্টির তৃষ্ণায় তার ভেতর এখনো শব্দরা ভিড় করে। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কবে আসবে বা আদৌ আসবে কি-না, তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। কিন্তু শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থান পাওয়া বাউল সালাম সরকারের গান থামেনি, শুধু বদলে গেছে তার জীবনের সুর।
পড়ুন : বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট: কতটুকু দায় বিএনপি সরকারের? কতটুকু অন্যদের?


