আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে প্রভাবশালী জোট হিসেবে ব্রিকসের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই জোটে বর্তমানে মিশর, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আরও কয়েকটি দেশ যুক্ত হয়েছে। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। এবারের সম্মেলনে সভাপতিত্ব করছে ভারত। আয়োজক দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্রাজিল, রাশিয়া, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি অংশীদার দেশগুলোর প্রতিনিধিদের স্বাগত জানাবেন।
তবে এবারের সম্মেলনে থাকছে না বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এতে অংশ নিচ্ছেন না। এমনকি বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধিও সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন না।
বাংলাদেশের নতুন সরকারপ্রধানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা ছিল। ভারতও এ সফরকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছিল। দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটিয়ে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও সফরটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ব্রিকস সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। এর পেছনে আমন্ত্রণের ধরন এবং দুই দেশের বর্তমান কূটনৈতিক পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে সরকারের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
কেন যাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরকে সামনে রেখে নয়াদিল্লির কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে ঢাকার অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসে। বিশেষ করে ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভার্চুয়ালি সভা করার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়। এ ঘটনায় ঢাকায় নিযুক্ত দিল্লির কূটনীতিককে ডেকে উষ্মা প্রকাশ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এরপর থেকেই তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে নতুন করে কৌতূহল তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী অংশ নিচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকসে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। অনুকূল পরিবেশ হলেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতে দ্বিপক্ষীয় সফরে যাবেন।
ভারত সফর নিয়ে ঢাকার অবস্থান
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতে দ্বিপক্ষীয় সফরে যেতে পারেন। অর্থাৎ ব্রিকসের মতো বহুপাক্ষিক কোনো সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় সফরকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে আন্তরিকতার কথা বলে এলেও দেশটির কিছু সিদ্ধান্তে ঢাকা বিব্রত হয়েছে। একদিকে সম্পর্কোন্নয়নের বার্তা দেওয়া হলেও অন্যদিকে বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে ভারতে স্পেস দেওয়ার বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়িয়েছে। এ অবস্থায় তাড়াহুড়ো করে কোনো বহুপাক্ষিক অনুষ্ঠানে যোগ না দিয়ে অনুকূল পরিবেশ তৈরির পর দ্বিপক্ষীয় সফরের মাধ্যমে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ।
এর আগে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের সঙ্গে ভারতের দিল্লি বিমানবন্দরে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ উঠে। তাকে দীর্ঘক্ষণ বসিয়ে রেখে হয়রানি করা হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে এবং আত্মসম্মানবোধের কারণে তিনি দিল্লিতে প্রবেশ না করে অন্য একটি ফ্লাইটে বাংলাদেশের পথে রওয়ানা হন। কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, ডা. জাহেদ উর রহমান দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছালে সেখানে দায়িত্বরতরা তার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং তাকে দীর্ঘক্ষণ বসিয়ে রাখেন। পরবর্তীতে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তাকে দিল্লিতে প্রবেশের অনুমতি দেয় এবং এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে। তবে ডা. জাহেদ আর ভারতে প্রবেশ না করার সিদ্ধান্ত নেন এবং অন্য একটি ফ্লাইটে দেশের পথে রওয়ানা হন।
ব্রিকস সম্মেলনে গেলে কী সুবিধা
ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার অন্যতম বড় সুযোগ হলো সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করা। চীন, রাশিয়া ও ভারতের মতো বড় শক্তির সঙ্গে সরাসরি আলোচনা বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অন্যান্য সহযোগিতার সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া ব্রিকসের নিজস্ব অর্থনৈতিক কাঠামো এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB) রয়েছে। সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে উন্নয়নমূলক প্রকল্পে অর্থায়ন বা ঋণের সুযোগ তৈরির পথও সুগম হতে পারে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণকারী একটি দেশের অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রেও এ ধরনের সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ইস্যুতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হয়।
না গেলে কী হতে পারে
অন্যদিকে সম্মেলনে অনুপস্থিত থাকলে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা এবং নতুন কোনো চুক্তি বা বিনিয়োগের সম্ভাবনা থেকে একটি দেশ বঞ্চিত হতে পারে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় কোনো সম্মেলনে অনুপস্থিতির মধ্য দিয়ে বিশেষ রাজনৈতিক বার্তাও যেতে পারে। কখনো তা আয়োজক দেশ বা সংশ্লিষ্ট জোটের সঙ্গে কূটনৈতিক দূরত্বের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হয়।
এ ছাড়া বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক কোনো সংকট, বাণিজ্যনীতি কিংবা ঋণনীতির মতো বিষয়ে সরাসরি নিজের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগও সীমিত হয়ে যায়।
তবে কোনো দেশের জন্য সব সময় সম্মেলনে অংশ নেওয়াই একমাত্র কৌশল নয়। জাতীয় স্বার্থ, কূটনৈতিক প্রটোকল কিংবা অন্য পরাশক্তির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজনেও কোনো দেশ এমন সম্মেলন এড়িয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য সিদ্ধান্তটির যৌক্তিকতা
বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয় এবং ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের নিয়মিত সুবিধাভোগীও নয়। ফলে এবারের সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার কারণে বড় ধরনের অর্থনৈতিক বা ব্যবসায়িক ক্ষতির আশঙ্কা নেই বলে সরকারের অবস্থানে ইঙ্গিত রয়েছে। বরং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে দ্বিপক্ষীয় সফরের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ করে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানসহ বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে তাড়াহুড়ো করে বহুপাক্ষিক সম্মেলনে যোগ না দিয়ে পারস্পরিক সম্মান ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত হওয়ার পর ভারত সফরের সিদ্ধান্তকে কৌশলগত অবস্থান হিসেবেই দেখছে বাংলাদেশ।
সব মিলিয়ে, ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি কেবল একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়; বরং আমন্ত্রণের ধরন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ ভারত সফরের কাঠামো নিয়ে ঢাকার শক্ত অবস্থানেরও একটি প্রকাশ।
পড়ুন: ভয়াল ৯/১১ হামলার ২৫ বছর: উদ্ঘাটন হয়নি হামলার রহস্য, ক্ষোভ স্বজনদের
আর/


