সাত বছর পর ভারত সফরে আসছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। দিল্লিতে ১২ ও ১৩ই সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে চলা ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেবেন তিনি।
তার দিল্লি সফর হবে, সে বিষয়টি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করলেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তিনি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন কি না তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এর আগে ২০১৯ সালে ভারতে এসেছিলেন শি জিনপিং। সে সময় তিনি চেন্নাইয়ের কাছে মামাল্লাপুরমে অনুষ্ঠিত এক অনানুষ্ঠানিক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন।
তার এই আসন্ন সফরকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা এশিয়ার এই দুই পরাশক্তির মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চলমান প্রচেষ্টার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। পাশাপাশি ব্রিকসে সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই সফর এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হতে চলেছে যখন মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক পরিস্থিতি ইতোমধ্যে জটিল এবং ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার উপর তার প্রভাব পড়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে উষ্ণতা লক্ষ্য করা গিয়েছে এবং শি জিনপিংয়ের এই সফর সে ক্ষেত্রে আরো বেশি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
চীনের প্রেসিডেন্টের ভারত সফর সম্পর্কে ব্লুমবার্গ-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, “২০১৯ সালের পর শি জিনপিংয়ের প্রথম ভারত সফর, মোদীর দিকে বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করছে।”
তবে রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্কের উন্নতি হবে এমনটা আশা করলে খুব হয়তো খুব তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে। দুই দেশের ব্যবসায়ীরা এখনো নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
এর নেপথ্যে কঠোর বিধিনিষেধের ফলে বিনিয়োগ স্থগিত হওয়া, ভিসা পাওয়ায় বিলম্ব এবং শিল্প সরঞ্জামের উপর বিধিনিষেধ আরোপের মতো কারণ রয়েছে।
২০২০ সালে ভারত-চীন সীমান্তের কাছে গালওয়ানে সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছিলেন। এরপর দুই দেশের সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটে। সংঘর্ষে তাদের মাত্র চারজন সেনার মৃত্যু হয়েছিল বলে চীন দাবি করেছিল।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। গত বছর নরেন্দ্র মোদী সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) বৈঠকে যোগ দিতে চীনে তিয়ানজিন সফর করেন। সেই সময় শিরোনামে উঠে এসেছিল রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে তার বৈঠকের প্রসঙ্গ।
প্রধানমন্ত্রী মোদী ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও হয়।
সেই সময় আরো একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল এবং তা হলো, ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের তরফে ভারতের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা যা ভারতীয় অর্থনীতির জন্য একটা বড় ধাক্কার চেয়ে কম ছিল না।
আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং দিল্লি-ভিত্তিক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হর্ষ ভি পন্থের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ভরসার যোগ্য নয়’ এমন নীতি দুই দেশকে একটা জায়গা দিয়েছে যেখানে তাদের নিজেদের মতপার্থক্য সরিয়ে রেখে দেশের মানুষের স্বার্থের জন্য আলোচনার টেবিলে বসতে পারে।
মি. পন্থ বিবিসি নিউজ হিন্দিকে বলেন, “দুই প্রতিবেশী দেশেরই একে অন্যকে প্রয়োজন এবং সেই কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত বিরোধ নিয়ে দুই পক্ষই নরম মনোভাব দেখিয়েছে।”
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন চলতি সপ্তাহের ছয়ই সেপ্টেম্বর প্রথম সিনিয়র মিলিটারি কমান্ডার পর্যায়ের ফ্ল্যাগ মিটিং ভারতের অরুণাচল প্রদেশের ওয়াচাতে অনুষ্ঠিত হয় এবং সাতই সেপ্টেম্বর সীমান্তে চীনের দিকে থাকা দামাইয়ে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় বৈঠক।
গত বছর, ভারত ও চীনের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালু হয়। দুই দেশের ব্যবসায়ী ও পেশাদারদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়াও শিথিল করা হয়েছিল।
২০২৪ সালে রাশিয়ার কাজানে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং শি জিনপিং প্রায় পাঁচ বছর পরে বৈঠক করেছিলেন। সেই সময় তারা লাইন অব কন্ট্রোল বা এলএসি থেকে সেনা প্রত্যাহার এবং ২০২০ সালে যে বিবাদ শুরু হয়েছিল তা সমাধানের জন্য চুক্তিকে স্বাগত জানান।
একই সঙ্গে ধারণা করা হয়েছিল, দুই দেশের সম্পর্কে বরফ গলতে শুরু করেছে। তবে হর্ষ ভি পন্থ মনে করেন সীমান্ত বিরোধ এত তাড়াতাড়ি শেষ হবে না এবং এটা এমন কোনো বিষয়ও না যাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
তার কথায়, “এখন দু’পক্ষের তরফে চেষ্টা করা হচ্ছে যাতে সমস্যা আর না বাড়ে। ২০২০ সালের মতো ঘটনা যেন আর না ঘটে এবং সীমান্ত সম্পর্কের ওপর আস্থা তৈরি হয়। এজন্য ওয়াং ই এবং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের মধ্যে বৈঠকও হয়েছিল। এরপর কমান্ডারদের মধ্যেও বৈঠক হয়।”
মি. পন্থ ব্যাখ্যা করেছেন, দুই দেশের সম্পর্ক নতুন মোড় নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আস্থার ঘাটতি এবং বাণিজ্য ঘাটতি দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে।
তার মতে, “মিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, শি জিনপিং এই সফরে ৪০০ জন প্রতিনিধির একটা বড় প্রতিনিধি দলকে সঙ্গে নিয়ে আসছেন, যাদের বেশিরভাগই ব্যবসা ও বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত।”
“এর অন্যতম কারণ হলো গালওয়ানের ঘটনার পর ভারত খুব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিল যে সীমান্তে যে কোনো রকম সমস্যা সামগ্রিক সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলবে, বাণিজ্য অংশীদারিত্বের উপরও প্রভাব ফেলবে।”
দেখা গিয়েছে যে, একদিকে যেমন সীমান্তে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, তেমনই দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্কেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।
চলতি বছরের মার্চ মাসে চীনা বিনিয়োগের ওপর আরোপ করা কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করে ভারত। গালওয়ানে সংঘর্ষের পর এই সমস্ত বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিধিনিষেধের মধ্যে ইলেক্ট্রনিক্স, ক্যাপিটাল গুডস এবং সোলার সেল সেক্টর ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ক্যাপিটাল গুডস বা মূলধনী পণ্য বলতে ভৌত, মানবসৃষ্ট সম্পদকে বোঝায় যা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি উপভোক্তাদের কাছে বিক্রি না করে অন্যান্য পণ্য ও পরিষেবা উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করে।
কয়েকটা নির্দিষ্ট শিল্পের ক্ষেত্রে ভারত দুই দেশের সংস্থাগুলোর মধ্যে যৌথ উদ্যোগের দ্রুত অনুমোদনেরও অপেক্ষা করছে।
সম্প্রতি, নয়াদিল্লি স্মার্টফোন উৎপাদনের জন্য ভারতের ডিক্সন টেকনোলজিস এবং চীনা স্মার্টফোন নির্মাতা ভিভো মোবাইলের মধ্যে যৌথ উদ্যোগ-সহ কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অনুমোদন জানিয়েছে।
তবে কিছু বড় বিনিয়োগ এবং প্রকল্পের ক্ষেত্রে এখনো কিছু বাধা রয়ে গিয়েছে।
ভারত সরকারের এক সূত্রকে উদ্ধৃত করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বিওয়াইডি এবং গ্রেট ওয়াল মোটরের মতো বড় চীনা সংস্থাগুলোর জন্য এই শিথিলতা যথেষ্ট নয়। এই গাড়ি নির্মাতারা দিল্লির তরফে ক্রমবর্ধমান তদন্তের মুখোমুখি হওয়ার পর ভারতে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিকল্পনা স্থগিত রাখে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, সম্প্রতি কিরগিস্তানে আয়োজিত সম্মেলনের সময় শি জিনপিং ও নরেন্দ্র মোদী একটা সংক্ষিপ্ত বৈঠক করেন এবং সে সময় তারা জানিয়েছিলেন, দুই দেশ “প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার এবং তারা একে অপরের উন্নয়নের জন্য হুমকি নয়, বরং সুযোগ”।
আসলে দুই দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিজেদের অস্থিতিশীল সম্পর্ককে কেন্দ্র করে লড়ছে।
হর্ষ ভি পন্থ ব্যাখ্যা করেছেন, “সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের দ্রুত অবনতি হয়েছে। এমনকি ইউরোপও চীনের প্রতি কঠোর হতে শুরু করেছে। চীনের অর্থনীতি মূলত রফতানি-ভিত্তিক অর্থনীতি এবং তাদের বাজার প্রয়োজন। ভারত তাদের কাছে একটা বড় বাজার হয়ে উঠতে পারে।”
সূত্র : বিবিসি বাংলা
পড়ুন : ব্রিকসে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে ভারতকে কী বার্তা দিল বাংলাদেশ?


