নরসিংদীর শিল্প-বাণিজ্যে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০২২ সালে জেলার মাধবদীর মহিষাশুড়া ইউনিয়নে বালুচর গ্রামে ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিদ্যুৎ এর উপকেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জমি অধিগ্রহণ করে পাওয়ার প্ল্যান্টের স্টেশন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করেছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের জন্য ১৬টি টাওয়ার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব টাওয়ারের প্রতিটির জন্য চারটি করে পিলার স্থাপন করতে হবে। ফলে স্থানীয় কৃষকদের ফসলি জমি এবং কারও কারও বসতবাড়ির ওপর দিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে কৃষকদের জমি ব্যবহারের বিষয়ে সমঝোতার চেষ্টা করেও সমাধান না হওয়ায় শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাতে শেখেরচর এলাকার হোটেল এক্সে স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসন, পাওয়ার প্ল্যান্ট কর্তৃপক্ষ এবং ভুক্তভোগী জমির মালিকেরা বৈঠকে বসেন। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে আলোচনা শেষে বিষয়টির সমাধানে উদ্যোগ নেন নরসিংদী-১ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এবং জেলা বিএনপির সভাপতি খায়রুল কবীর খোকন।
এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, নরসিংদী জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু সালেহ চৌধুরী, নরসিংদী চেম্বারের সবেক প্রেসিডেন্ড সিআইপি আব্দুল মোমেন মোল্লা, সভাপতি ও রমনী গ্রুপের চেয়ারম্যান মো: নিজামউদ্দিন ভূইয়া লিটন (সিআইপি), জেলা বিএনপির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মফিজুল ইসলাম, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির সাব-ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল্লাহ আল-মামুন সহ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা বৃন্দ।
এ বৈঠকে আলোচনার একপর্যায়ে কৃষকদের ক্ষোভের কারণ হিসেবে উঠে আসে ২০১৮ সালে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের আমলে প্রণীত বিদ্যুৎ আইন। জেলা প্রশাসনের পক্ষে স্থানীয় কৃষকদের সামনে আইনটির বিষয়টি তুলে ধরেন নরসিংদী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা জাহান সরকার।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ আইনে টাওয়ার নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত জমির মূল্য সরকারি মৌজা মূল্য অনুযায়ী পরিশোধের বিধান রয়েছে। নির্ধারিত মূল্যের বেশি অর্থ দেওয়ার সুযোগ নেই। এ সময় তিনি আইনকে সম্মান জানিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের টাওয়ার নির্মাণের কাজে সহযোগিতা করতে এবং জমিতে কাজ করার সুযোগ করে দিতে কৃষকদের প্রতি আহ্বান জানান।
এ সময় স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক ও ব্যবসায়ীরা বলেন, বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের কারণে মাধবদীর শিল্পমালিকেরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। ৮০০ মেগাওয়াটের নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ হলে মাধবদীর মানুষ বিদ্যুৎ সংকট থেকে অনেকটা মুক্তি পাবেন। তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রের টাওয়ার নির্মাণে বাধা না দিয়ে শিল্প রক্ষার স্বার্থে কৃষকদের এগিয়ে আসার জন্য তাঁরা বিনীত অনুরোধ জানান।
এ সময় স্থানীয় কৃষকেরা অভিযোগ করে বলেন, তাঁদের কত টাকা দেওয়া হবে কিংবা কবে দেওয়া হবে, এসব বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য না দিয়েই স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে তাঁদের কৃষিজমিতে টাওয়ার নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে। প্রকল্পে কর্মরত কিছু ব্যক্তির প্রভাব, চাপ ও নানা ধরনের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা। বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্যকে জানানো হলে তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে বৈঠকে বসেন।
কৃষকেরা বলেন, এলাকায় এক শতাংশ জমির বাজারমূল্য পাঁচ লাখ টাকারও বেশি। অথচ সরকারি মৌজা মূল্যে সেই জমির মূল্য অনেক কম নির্ধারিত। এ সময় ক্ষোভ প্রকাশ করে কৃষকেরা বলেন, ‘এ কেমন আইন? হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে কৃষকেরা কেন ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন?’
এ সময় কৃষকেরা সংসদ সদস্যের কাছে তাঁদের জমির ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানান। তবে শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংকট নিরসন এবং ব্যবসায়ীদের স্বার্থে বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের জন্য টাওয়ার নির্মাণের জন্য জমি দিতে রাজি হন ভুক্তভোগী কৃষকেরা।
সংসদ সদস্য খায়রুল কবীর খোকন বলেন, কৃষকদের স্বার্থ বিবেচনায় রেখেই সংশ্লিষ্ট সবাইকে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট নিরসনের বিষয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁকে একাধিকবার কথা বলতে হয়েছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে নরসিংদীর বিদ্যুৎ সংকট অনেকটাই কমবে। শিল্প-বাণিজ্যেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।
তিনি কৃষকদের আশ্বস্ত করে বলেন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন টাওয়ার নির্মাণের জন্য যে জমি ব্যবহার করা হবে, সে ক্ষেত্রে কোনো ধরনের হয়রানি করা যাবে না। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাব যাতে না থাকে, সে বিষয়েও তিনি নজর রাখবেন। কৃষকদের ন্যায্য দাবির বিষয়টি সংসদেও তুলে ধরার আশ্বাস দেন তিনি। এ সময় তিনি চলমান উন্নয়নকাজে সহযোগিতা করার জন্য কৃষকদের প্রতি আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, এ বৈঠকে প্রকল্পের ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে। তবে কর্তৃপক্ষ জানায়, সরকারি মৌজা মূল্যের চেয়ে এক টাকাও বেশি দেওয়ার সুযোগ নেই।
এ ছাড়া ১৬টি টাওয়ার নির্মাণের জন্য জমি ব্যবহারের অর্থ জেলা প্রশাসকের এলএ শাখায় জমা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত তারিখের মধ্যে জমির মালিকদের অর্থ পরিশোধ করা হবে বলে জানান পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির সাব-ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল্লাহ আল মামুন।
পড়ুন : ফটিকছড়িতে ডেভিড ইমনের সহযোগী শুটার ডাবা হারুন গ্রেপ্তার


