জাতীয় শুটিং ফেডারেশনের গোলাবারুদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, তার প্রতিটি আলাদা করে পরীক্ষা করার আগে বর্তমান কমিটির প্রকৃত প্রেক্ষাপটটা জানা জরুরি। এটি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) কর্তৃক গঠিত একটি এডহক কমিটি, যার মেয়াদ এখনও দুই মাসও পূর্ণ হয়নি। কমিটিতে আছেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ, আর সদস্যদের একটি বড় অংশই এখানে নতুন। কোনো সিদ্ধান্তই এককভাবে নেওয়া হয় না, বোর্ডে আলোচনার মাধ্যমে সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতেই প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দায়িত্ব নেওয়ার একদম শুরুতেই কমিটি সব গোলাবারুদ গুনে সিলগালা করে রেখেছে, যা স্বচ্ছতার প্রতি তাদের অবস্থানই প্রমাণ করে। পূর্ববর্তী কমিটির আমলের কোনো দায় এই এডহক কমিটির ওপর বর্তায় না। তারপরও অতীতের ঘাটতির কথা তারা অস্বীকার করছে না—বরং তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করছে এবং করার মানসিকতা নিয়েই এগোচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের অভিযোগগুলো পরীক্ষা করলে দেখা যায়, অভিযোগগুলোর অধিকাংশই অনুমানের উপর নির্ভরশীল এবং ঠিকমত যাচাইবাছাই ছাড়াই ফেডারেশনের জেনারেল সেক্রেটারিকে জড়িয়ে অপপ্রচার চালানোর একটি প্রয়াস। এখানে অভিযোগ যতটা জোরালো শোনাচ্ছে, প্রমাণ ততটা শক্ত নয়। মূল অভিযোগগুলোকে তিনটি স্তরে বিভক্ত করা যায়: এক, ফেডারেশনের গোলাবারুদ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম; দুই, তদন্তাধীন ব্যক্তিদের উপকমিটিতে বসিয়ে সাধারণ সম্পাদক সাকিফ শামীম তাঁদের পুনর্বাসন করেছেন, এমন ইঙ্গিত; তিন, এই পুরো প্রক্রিয়ায় বর্তমান নেতৃত্ব দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে। প্রতিটি অভিযোগ এখানে আলাদাভাবে যাচাই করা হলো।
প্রথম অভিযোগ: “তদন্তাধীনদের পুনর্বাসন” সময়ক্রমটাই এখানে ভুল
সবচেয়ে জোরালো অভিযোগ এটাই যে, তদন্তাধীন ব্যক্তিদের উপকমিটিতে যুক্ত করে পুনর্বাসন করা হয়েছে। এই অভিযোগ দাঁড়িয়ে আছে একটি অনুমানের ওপর: উপকমিটি গঠন আর তদন্ত শুরু একই সময়ে, বা তদন্তের প্রতিক্রিয়াতেই হয়েছে। কিন্তু তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। বর্তমান উপকমিটিগুলো গঠিত হয়েছে বোর্ডের সিদ্ধান্তে ১৮ জুলাই অর্থাৎ গোলাবারুদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হওয়ারও আগে। একটি ঘটনা যদি অন্য ঘটনার আগেই ঘটে থাকে, সেটিকে পরের ঘটনার প্রতিক্রিয়া বা ফল হিসেবে দেখানো তথ্যগতভাবে ভুল। এখানে প্রশ্ন একটাই, উপকমিটি গঠনের দিন সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কি আনুষ্ঠানিক তদন্ত চলছিল? উত্তর যদি না হয়, তাহলে “পুনর্বাসন” শব্দটা এখানে খাটে না, কারণ পুনর্বাসন করতে হলে আগে কাউকে দণ্ডিত বা প্রমাণিত অভিযুক্ত হতে হয়।
দ্বিতীয় অভিযোগ: সদস্যপদকে দায় বানানোর চেষ্টা
দ্বিতীয় অভিযোগের ভিত্তি হলো, কিছু উপকমিটি সদস্য একই সঙ্গে নির্দিষ্ট ক্লাবের প্রতিনিধিও, আর সেই ক্লাবগুলোর গোলাবারুদের হিসাবে গরমিলের অভিযোগ আছে। এখান থেকে ধরে নেওয়া হচ্ছে, উপকমিটিতে থাকা মানেই ক্লাবের গোলাবারুদ হিসাব অনুমোদন বা গোপন করার ক্ষমতাও তাঁর হাতে। এই অনুমান প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। ক্লাবের গোলাবারুদ উত্তোলন, ব্যবহার ও মজুদের হিসাব রক্ষার দায়িত্ব প্রথমত ক্লাব প্রশাসনের; জেলা পর্যায়ে সেই হিসাব অনুমোদন ও যাচাইয়ের একটি অংশ পড়ে জেলা প্রশাসনের (DC) এখতিয়ারে। উপকমিটির সদস্যপদ একটি সাংগঠনিক ভূমিকা; ক্লাবের অস্ত্র-গোলাবারুদ হিসাবরক্ষণ সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব। কাউকে দ্বিতীয়টির সঙ্গে যুক্ত করতে হলে দেখাতে হবে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত, অনুমোদন বা হিসাব গোপনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। শুধু নাম আর পদ এক জায়গায় থাকাই এর প্রমাণ নয়।
তৃতীয় অভিযোগ: দায় কি এড়ানো হচ্ছে?
বর্তমান নেতৃত্ব দায় এড়াতে চাইছে। এটাও সময়রেখা দিয়েই পরীক্ষা করতে হবে। ২০২০ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে ক্লাবগুলোর গোলাবারুদ উত্তোলন ও ব্যবহার নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার সিংহভাগ ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন বর্তমান অ্যাডহক কমিটি বা সাধারণ সম্পাদক দায়িত্বেই ছিলেন না। সাকিফ শামীম দায়িত্ব নিয়েছেন মাত্র মাসখানেক আগে, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ঘোষিত ২৭টি ফেডারেশনের নতুন অ্যাডহক কমিটির অংশ হিসেবে, ১৮ জুলাই ২০২৬-এ। অতীতের অনিয়মের সময় দায়িত্বে না থাকা একজন মানুষকে সেই অনিয়মের জন্য দায়ী করা, আর তাঁর বর্তমান কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করা—এই দুটো সম্পূর্ণ আলাদা প্রশ্ন। দায় এড়ানোর অভিযোগ তখনই যৌক্তিক হতো, যদি তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর তদন্তে অসহযোগিতা করতেন বা প্রমাণ লোপাটে জড়িত থাকতেন। এখন পর্যন্ত এমন কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ সামনে আসেনি। অভিযোগের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে আছে একটি তথ্য—সাকিফ শামীম বলেছেন, গোলাবারুদ কোথায় ও কীভাবে খরচ হয় তা নিয়ে কার্যকর নজরদারির ঘাটতি ছিল। তাঁর ভাষায়—“গোলাবারুদ ব্যবস্থাপনায় অতীতে যে ঘাটতি ছিল, আমরা তা আমলে নিয়েছি এবং সংশোধনে কাজ করছি। এই ঘাটতিকে কোনো একক ব্যক্তির ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা হিসেবে দেখা এবং সমাধান করা প্রয়োজন। আমরা এই বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তকে স্বাগত জানাই এবং তাতে সম্পূর্ণ সহযোগিতা দিয়ে যাব।”
এ ধরনের স্বীকারোক্তি দোষ ঢাকতে চাওয়া মানুষের ভাষা নয়। বরং এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা মেনে নেওয়া এবং তা সংশোধনের সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি, যা তদন্ত চলাকালীন সচরাচর দেখা যায় না।
গোলাবারুদের জবাবদিহিতা যাচাই করতে হলে নথিপত্র থেকে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর বেরিয়ে আসা দরকার তা স্পষ্ট, কোন ক্লাব কত গোলাবারুদ উত্তোলন করেছে, কোন অনুমোদনে করেছে, সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের অনুমোদন ছিল কি না, ক্লাবের স্টক রেজিস্টারে কী আছে, কত ব্যবহার হয়েছে আর কত অবশিষ্ট, এবং হিসাব যাচাইয়ের দায়িত্বে বাস্তবে কারা ছিলেন। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তদন্তেই বেরোবে, কোন সংবাদপত্রের অনুমানে নয়।
দায় নির্ধারণের ন্যায্য মাপকাঠি হলো সময়কাল, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং নথিপত্র—কারও নাম দুটি আলাদা ঘটনায় থাকা মানেই তিনি দায়ী, এই সরল সমীকরণ নয়। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কাউকে অতীতের অনিয়মের মূল ব্যক্তি হিসেবে দাঁড় করানো যেমন অন্যায্য, তেমনি বর্তমান নেতৃত্বের অধীনে নতুন কোনো অনিয়ম হলে সেটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এখন দরকার তিনটি কাজ—অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত, ২০২০ সাল থেকে ক্লাবভিত্তিক গোলাবারুদের হিসাব যাচাই, আর বরাদ্দ থেকে নিরীক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ ডিজিটালি নথিভুক্ত করার মতো একটি স্বাধীন ব্যবস্থা। একজন নতুন নেতৃত্বকে বিচার করার সবচেয়ে ন্যায্য পদ্ধতি হলো তিনি পুরনো ব্যবস্থার অংশ ছিলেন কি না শুধু তা দেখা নয়—বরং দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি পুরনো সমস্যা কীভাবে চিহ্নিত, তদন্ত ও সংস্কার করছেন, সেটাই দেখা।
পড়ুন : নজরদারিতে থাকবেন ৯ ক্রিকেটার


