মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যায়, কিন্তু তাঁর কর্ম, ভালোবাসা আর স্মৃতি থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে। সেই স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে ব্যতিক্রমী এক মানবিক উদ্যোগ নিয়েছে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার আনেহলা ইউনিয়নের খায়েরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র মরহুম আব্দুস সাত্তার সিকদারের পরিবার।
নিজের শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে মরহুমের স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে আয়োজন করা হয়েছে আলোচনা সভা, শিক্ষার্থীদের মাঝে বই ও টি-শার্ট বিতরণ, খাবার পরিবেশন এবং দোয়া মাহফিলের। পরিবারের এমন উদ্যোগে একদিকে যেমন প্রিয়জন হারানোর বেদনার মধ্যেও মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝেও তৈরি হয়েছে উৎসাহ ও আনন্দের আবহ।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে খায়েরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এ ব্যতিক্রমী আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। মরহুম আব্দুস সাত্তার সিকদারের কানাডা প্রবাসী ছেলে মো. হাবিবুর রহমান সোহেল ও মেয়ে সাবিনা ইয়াসমিন সিমুর উদ্যোগে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রোকনুজ্জামান রাজু, বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি ঘাটাইল উপজেলা শাখার সভাপতি মো. হুমায়ুন খালিদ, সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল কাইয়ুম তালুকদার, খায়েরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নূরে আলম মাখন, কামালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. শফিকুল ইসলামসহ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও মরহুমের পরিবারের সদস্যরা।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় বিভিন্ন ধরনের বই ও টি-শার্ট। নতুন বই হাতে পেয়ে শিশুদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে আনন্দের ঝিলিক। এরপর শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও আমন্ত্রিত অতিথিদের মাঝে খাবার পরিবেশন করা হয়।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, আব্দুস সাত্তার সিকদার এই বিদ্যালয়েরই প্রাক্তন ছাত্র ছিলেন। তাঁর শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত সেই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর পরিবার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। একজন মানুষের মৃত্যুর পরও তাঁর স্মৃতিকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর এমন উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক বার্তা দেয়।
বক্তারা আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়া শুধু একটি উপহার নয়; এটি তাদের স্বপ্ন দেখার, জ্ঞান অর্জনের এবং ভবিষ্যৎ গড়ার পথকে আরও উৎসাহিত করার একটি সুন্দর প্রয়াস। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতেও এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মরহুম আব্দুস সাত্তার সিকদারের পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রিয় মানুষটি আজ পৃথিবীতে নেই। কিন্তু তাঁর শৈশবের স্মৃতি, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং সমাজের জন্য কিছু করার আকাঙ্ক্ষাকে বাঁচিয়ে রাখতে তাঁরা শিক্ষার্থী ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। ভবিষ্যতেও সামাজিক ও শিক্ষামূলক বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তারা।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে মরহুম আব্দুস সাত্তার সিকদারের রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। দোয়ার সময় সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ। প্রিয় মানুষটির স্মৃতিচারণে স্বজনদের চোখে ছিল অশ্রু, আর সেই স্মৃতিকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের হাতে ছিল নতুন বই ও ভালোবাসার উপহার।
একজন মানুষ হয়তো মৃত্যুর পর আর ফিরে আসেন না; কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া ভালোবাসা যদি অন্যের মুখে হাসি ফোটায়, শিক্ষার্থীর হাতে বই তুলে দেয়, কিংবা মানুষের কল্যাণে কোনো কাজের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকে—তাহলে সেই মানুষটি তাঁর কর্মের মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকেন।
খায়েরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আব্দুস সাত্তার সিকদারের স্মরণে আয়োজিত এই ব্যতিক্রমী কর্মসূচি যেন সেই কথাটিই আবারও মনে করিয়ে দিল—মৃত্যু মানুষকে কেড়ে নেয়, কিন্তু ভালো কাজ ও ভালোবাসার স্মৃতি কখনো মুছে দিতে পারে না।
পড়ুন : তালতলীতে ছাগলের পিপিআর রোগ প্রতিরোধে দুই দিনব্যাপী টিকাদান শুরু


