বিজ্ঞাপন

ঢাকার বায়ু আজ ‘অস্বাস্থ্যকর’, দূষিত শহরের তালিকায় চতুর্থ

বিজ্ঞাপন

বিশ্বের দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় আজ চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। বায়ুমান সূচকে (একিউআই) শহরটির স্কোর ১৬৭, যা ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ২২৫ স্কোর নিয়ে তালিকার শীর্ষে রয়েছে কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসা।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকাল পৌনে ৯টার দিকে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান বিষয়ক ওয়েবসাইট আইকিউ এয়ারে প্রকাশিত তথ্যে এসব জানা যায়।

দূষিত শহরের তালিকায় ২০১ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর। ১৬৮ স্কোর নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে আছে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা। আর ১৫৪ স্কোর নিয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছে মালয়েশিয়ার শহর কুচিং।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউ এয়ার কোনো শহরের বাতাসের মান কতটা ভালো বা দূষিত, তার লাইভ বা তাৎক্ষণিক সূচক প্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠানটির মানদণ্ড অনুযায়ী, বায়ুমান সূচকের স্কোর শূন্য থেকে ৫০-এর মধ্যে থাকলে বাতাসের মান ভালো হিসেবে বিবেচিত হয়।

স্কোর ৫১ থেকে ১০০ হলে বায়ুর মান মাঝারি বা সহনীয় ধরা হয়। ১০১ থেকে ১৫০ স্কোর সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত। ১৫১ থেকে ২০০ পর্যন্ত স্কোরকে ‘অস্বাস্থ্যকর’ বলা হয়। ২০১ থেকে ৩০০ স্কোর হলে বায়ু ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ এবং ৩০১-এর বেশি হলে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রকৃতির তিনটি প্রধান উপাদান মাটি, বায়ু এবং পানি মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ‘সুস্থ মাটি, নির্মল বায়ু আর বিশুদ্ধ পানি টিকিয়ে রেখেছে মানব সভ্যতাকে। এ প্রাণশক্তির আধার ফুরিয়ে আসছে ক্রমেই। যা অচিরেই হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে পৃথিবীকে।’ এ কয়েকটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বিশ্বের অন্যতম বড় বাস্তবতা। মানুষের উন্নয়ন, শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং ভোগবাদী জীবনযাত্রার কারণে প্রকৃতির মৌলিক সম্পদগুলো চরম চাপের মুখে। মাটি তার উর্বরতা হারাচ্ছে, বায়ু দূষিত হচ্ছে এবং নিরাপদ পানির উৎস দিনদিন সংকুচিত হচ্ছে। ফলে শুধু পরিবেশ নয়, মানব সভ্যতার অস্তিত্বও আজ গভীর সংকটের সম্মুখীন। তাই পরিবেশ রক্ষা কেবল একটি দায়িত্ব নয় বরং মানবজাতির টিকে থাকার শর্ত।

সুস্থ মাটি
মাটি শুধু কৃষিজ ফসল উৎপাদনের মাধ্যম নয়; এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জীবন্ত বাস্তুতন্ত্রগুলোর একটি। কোটি কোটি অণুজীব, কেঁচো, উপকারী ছত্রাক এবং নানা জীব মাটিকে জীবন্ত রাখে। এ মাটিই খাদ্য উৎপাদন, বন সৃষ্টি এবং কার্বন সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, অপরিকল্পিত চাষাবাদ, বন উজাড় এবং শিল্পবর্জ্যের কারণে মাটির স্বাস্থ্য দ্রুত অবনতি ঘটছে। উর্বর জমি অনুর্বর হয়ে পড়ছে, জৈব পদার্থ কমে যাচ্ছে এবং কৃষি উৎপাদন ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

নির্মল বায়ু
মানুষ প্রতিদিন হাজার হাজার বার শ্বাস নেয়। অথচ সেই বায়ুই আজ দূষণের শিকার। যানবাহনের ধোঁয়া, কলকারখানার নির্গমন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং বন ধ্বংসের ফলে বায়ুমণ্ডলে ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে। বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ, হৃদরোগ এবং নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রিনহাউজ গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের গতি ত্বরান্বিত হচ্ছে।

বিশুদ্ধ পানি
পানি ছাড়া জীবন কল্পনা করা যায় না। অথচ বিশ্বের বহু অঞ্চলে নিরাপদ পানির সংকট দিনদিন প্রকট হচ্ছে। নদী, খাল, বিল ও জলাশয় দূষিত হচ্ছে শিল্পবর্জ্য, প্ল্যাস্টিক এবং রাসায়নিক পদার্থের কারণে। ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। অনেক স্থানে লবণাক্ততা ও আর্সেনিক দূষণ মানুষের স্বাস্থ্য ও কৃষিকে হুমকির মুখে ফেলছে।

পরিবেশ সংকটের নতুন মাত্রা
বর্তমানে পরিবেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জলবায়ু পরিবর্তন। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে স্পষ্ট। তীব্র তাপপ্রবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত দেখা দিচ্ছে। ঘন ঘন বন্যা ও খরা হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ছে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষক ও সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।

কৃষি ও পরিবেশের গভীর সম্পর্ক
কৃষি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে সুস্থ পরিবেশের ওপর। উর্বর মাটি, পর্যাপ্ত পানি, উপযুক্ত তাপমাত্রা এবং জীববৈচিত্র্য ছাড়া কৃষি উৎপাদন সম্ভব নয়। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষকেরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। অতিরিক্ত তাপে ধানের ফলন কমছে। ফুল ও ফল ঝরে যাচ্ছে। নতুন নতুন রোগবালাই দেখা দিচ্ছে। সেচের খরচ বাড়ছে। খরা ও বন্যায় ফসল নষ্ট হচ্ছে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে পরিবেশবান্ধব কৃষিব্যবস্থার বিকল্প নেই।

জীববৈচিত্র্যের সংকট
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় জীববৈচিত্র্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মৌমাছি, প্রজাপতি, পাখি, মাছ, বনজ প্রাণী, সবাই পরিবেশের একটি অংশ। আজ বন ধ্বংস, কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বহু প্রাণী ও উদ্ভিদ বিলুপ্তির পথে। বিশেষ করে মৌমাছির সংখ্যা কমে যাওয়া একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। পৃথিবীর অধিকাংশ খাদ্যশস্যের পরাগায়ন মৌমাছির মাধ্যমে হয়। মৌমাছি হারিয়ে গেলে খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ মানে শুধু প্রাণী রক্ষা নয় বরং মানব সভ্যতার খাদ্য ও ভবিষ্যৎ রক্ষা।

প্ল্যাস্টিক দূষণ: নীরব বিপর্যয়
বর্তমানের অন্যতম বড় পরিবেশগত সমস্যা হলো প্ল্যাস্টিক দূষণ। একবার ব্যবহারযোগ্য প্ল্যাস্টিক আমাদের নদী, সমুদ্র, কৃষিজমি এবং শহরকে দূষিত করছে। প্ল্যাস্টিক মাটির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট করে, জলপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে এবং প্রাণীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়। মাইক্রোপ্ল্যাস্টিক এখন খাদ্য, পানি এবং এমনকি মানুষের শরীরেও প্রবেশ করছে। এটি ভবিষ্যতে আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।

কার্বন স্মার্ট কৃষি, ভবিষ্যতের পথ
পরিবেশ ও কৃষি রক্ষায় বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কার্বন স্মার্ট কৃষি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এ পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হলো; কার্বন নিঃসরণ কমানো। মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন। পানি সাশ্রয়। উৎপাদন বৃদ্ধি। জলবায়ু সহনশীল কৃষি গড়ে তোলা। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এ ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

উদ্ভাবনী প্রযুক্তি
কৃষিতে এআই প্রযুক্তি। স্মার্ট মাটি বিশ্লেষণ। আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা। কৃষি ড্রোন প্রযুক্তি। প্রিসিশন ফার্মিং। ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থাপনা। এসব প্রযুক্তি কৃষকদের সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে এবং পরিবেশগত ক্ষতি কমায়।

পরিবেশ রক্ষা
পরিবেশ রক্ষা শুধু সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়; এটি প্রত্যেক মানুষের দায়িত্ব। আজকের পৃথিবীতে পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নটি উন্নয়নের বিপরীতে নয় বরং টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত। যদি আমরা পরিবেশ রক্ষা না করি, তবে আগামী দিনে খাদ্য সংকট বাড়বে, পানির সংকট তীব্র হবে, স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি বাড়বে, জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাবে। তাই এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের সময়।

আমাদের করণীয়
ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমাদের করণীয় হলো, অপ্রয়োজনীয় প্ল্যাস্টিক ব্যবহার কমানো। গাছ লাগানো ও পরিচর্যা করা। পানি অপচয় রোধ করা। পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন করা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সচেতন হওয়া। কৃষি খাতে জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া। মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা। সুষম সার ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করা। পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করা। কার্বন স্মার্ট কৃষি সম্প্রসারণ করা। সামাজিক ও জাতীয় পর্যায়ে বন সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণ বৃদ্ধি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো। শিল্পদূষণ নিয়ন্ত্রণ। পরিবেশ শিক্ষা সম্প্রসারণ। জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন।

সুস্থ মাটি, নির্মল বায়ু এবং বিশুদ্ধ পানি—এ তিনটি উপাদানই মানব সভ্যতার জীবনরেখা। কিন্তু আমাদের অসচেতন কর্মকাণ্ডের কারণে এ অমূল্য সম্পদগুলো ক্রমেই ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হলে মানব সভ্যতার অগ্রগতিও থেমে যাবে। পৃথিবী আমাদের উত্তরাধিকার নয়; এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছ থেকে ধার নেওয়া একটি আমানত। আসুন সবাই প্রতিজ্ঞা করি, সুস্থ মাটি রক্ষা করি, নির্মল বায়ু নিশ্চিত করি, বিশুদ্ধ পানি সংরক্ষণ করি; প্রকৃতি বাঁচাই, পৃথিবী বাঁচাই, মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করি।

পড়ুন : জুলাই হত্যা মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ জনের রায় আজ

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন