সৌদি আরবের বিভিন্ন বেসামরিক এলাকায় ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ১৩ জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় সাতটি বাড়ি ও দুটি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার পর জেদ্দাসহ দেশটির ছয়টি শহরে সতর্কতা জারি করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ভোরে এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানান ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুরকি আল-মালকি।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সোমবার সৌদি আরবের খামিস মুশাইত, আবহা ও তাইফের বেসামরিক এলাকায় এসব হামলা চালানো হয়। হামলায় আহতদের কয়েকজনের আঘাত সামান্য থেকে মাঝারি মাত্রার।
হামলার পর দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি শহরে সতর্কতা জারি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আবহা, জেদ্দা, জাজান, তাইফ, ইয়ানবু ও আল-উলা।
সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সতর্ক থাকতে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দেওয়া নির্দেশনা মেনে চলতে বাসিন্দাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের বিবৃতিতে হুতিদের বিরুদ্ধে বেসামরিক নাগরিক ও স্থাপনা লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানোর অভিযোগ করা হয়েছে। জোটের দাবি, ধারাবাহিক এসব হামলার মাধ্যমে হুতিরা উত্তেজনা বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করছে।
সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বেসামরিক নাগরিক ও স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জোটের যৌথ বাহিনী ‘দায়িত্বশীল ও কঠোর পদক্ষেপ’ নেবে বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
এর আগে, গত সপ্তাহে হুতিদের চালানো হামলায় সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও এলাকায় ৭০ জনের বেশি মানুষ আহত হন। আহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল।
শুক্রবার রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে কয়েক দফা ড্রোন হামলার পর সৌদি আরব সাময়িকভাবে দেশটির পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন বন্ধ করে দেয়।
হুতিদের ওই হামলার নিন্দা জানিয়েছে উপসাগরীয় ও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সংগঠন। একই সঙ্গে তারা সৌদি আরবের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে।
সৌদির আরও ৪ শহরে হুতিদের হামলা
ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা (৮ সেপ্টেম্বর) মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের চারটি শহরে হামলা চালিয়েছে। এতে ৭০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন এবং কয়েকটি তেল স্থাপনায় আগুন ধরে গেছে। ছয় মাস ধরে চলা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে এটি বড় ধরনের সম্প্রসারণের ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে।
ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ দেশটির জনবহুল অধিকাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী হুতিরা জানিয়েছে, তারা সৌদি ভূখণ্ডের গভীরে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালিয়েছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে তারা দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতের একটি সৌদি বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়। পাশাপাশি কাছের আবহা শহরে সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির স্থাপনা, ইয়েমেন সীমান্তবর্তী নাজরান এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী জাজানে হামলা চালানো হয়। জাজানে একটি বড় তেল শোধনাগার ও বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। খবর রয়টার্সের।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলার পর এসব স্থাপনায় আগুন ধরে যায়। আহত ৭৩ জনের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক মানুষ আহত হওয়ার খবর থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর সৌদি আরবের ওপর চালানো সবচেয়ে বড় হামলাগুলোর একটি এটি।
হামলার পর সৌদি শহরগুলোর পরিস্থিতির সত্যতা নিশ্চিত করে এমন ছবি তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। দেশটির কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম পরিস্থিতির কারণে প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে হুতিরা এমন কিছু ছবি প্রকাশ করেছে, যেখানে ঘন ধোঁয়া ও বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখা গেছে। তাদের দাবি, সোমবার সৌদি সীমান্তের আরও পূর্বাঞ্চলে পৃথক হামলায় এসব সৌদি ট্রাকে আঘাত করা হয়েছে।
মঙ্গলবার পরে হুতিদের নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম জানায়, সৌদি যুদ্ধবিমান ইয়েমেনের রাজধানী সানার পূর্বে জুবাহ জেলায় চারটি বিমান হামলা চালিয়েছে।
আগস্টে এক মাসের আপেক্ষিক শান্তির পর উপসাগরীয় অঞ্চলে আবারও সংঘাত তীব্র হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র পরস্পরের দিকে হামলা চালাচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও। মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ ডলারের ওপরে উঠেছে, যা জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি।
সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে হুতিদের হামলা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহে নতুন করে বিঘ্ন তৈরি করতে পারে। এর ফলে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি ওই অঞ্চলের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে চলমান যুদ্ধের প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আরব জোটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে সৌদি আরব। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই সংঘাত অনেকটাই শান্ত হয়ে এসেছিল। কিন্তু ইয়েমেনে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়েছে এবং হুতিরা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে জাহাজ চলাচলে হামলার হুমকি দিচ্ছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা জানিয়েছে, গত তিন দিনে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে সংঘর্ষের কারণে ১৮ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন।
আরব আমিরাত ও হুতিদের সংঘর্ষের ঘটনাপ্রবাহ
গত ২ জানুয়ারি হুতিরা জানায়, তারা আরব আমিরাতের একটি সামরিক পণ্যবাহী নৌযানকে লোহিত সাগর থেকে আটক করেছে।
১৭ জানুয়ারি আবুধাবিতে ড্রোন হামলায় একটি তেলের ট্যাংক বিস্ফোরিত হয়ে ৩ জন নিহত হন। এ ছাড়াও তারা আবুধাবি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্মাণাধীন বর্ধিত অংশে হামলা চালায়।
সৌদি সামরিক জোট প্রত্যুত্তরে হুতিদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোর ওপর বিমান হামলার সংখ্যা বাড়ায়। তবে অভিযোগ পাওয়া গেছে, বিমান হামলায় হাসপাতাল, টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো, বিমানবন্দর, পানি সরবরাহ কেন্দ্র ও স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২১ জানুয়ারি উত্তরের সাআদা প্রদেশের একটি অস্থায়ী অপরাধী সংশোধনী কেন্দ্রে বোমা হামলায় প্রায় ৮০ জন মারা যান। পরের সপ্তাহে সানায় ২০ জন মারা যান।
২৪ জানুয়ারি আবুধাবির উদ্দেশে নিক্ষেপিত ২টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মাঝ আকাশে ধ্বংস করার দাবি জানায় আরব আমিরাত। ক্ষেপণাস্ত্র ২টি হুতিরাই ছুঁড়েছিল বলেও তারা দাবি করেন।
৩১ জানুয়ারি আরব আমিরাত আবারও দাবি করে, তারা আরেকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে। হুতিরাও নিশ্চিত করে যে তারা আবুধাবির উদ্দেশ্যে বেশ কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুঁড়েছে।
পড়ুন : ঢাকার বায়ু আজ ‘অস্বাস্থ্যকর’, দূষিত শহরের তালিকায় চতুর্থ
সা/


