আজ ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস। বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র একটি সর্বজনীন রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হলেও এ দিবস পালনের ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো নয়।
২০০৭ সালের ৮ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ১৫ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরের বছর, ২০০৮ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
গণতান্ত্রিক আদর্শ ও মূল্যবোধের বিকাশের পাশাপাশি গণতন্ত্রের চর্চা ও সম্প্রসারণে জনসচেতনতা তৈরি করাই দিবসটির মূল উদ্দেশ্য। এ উপলক্ষে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোকে জনগণের মধ্যে গণতন্ত্রের গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরার আহ্বান জানানো হয়।
আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রক্রিয়া। ১৯৯৭ সালে ‘ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন’ (আইপিইউ) গণতন্ত্র বিষয়ে ‘ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অন ডেমোক্রেসি’ নামে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে।
এর আগে ১৯৮৮ সালে ফিলিপাইনে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পরে ২০০৬ সালে কাতারের রাজধানী দোহায় আইসিএনআরডির ষষ্ঠ সম্মেলনে ‘আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস’ পালনের প্রস্তাব আসে।
পরবর্তী সময়ে প্রস্তাবটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উপস্থাপন করা হয়। ২০০৭ সালের ৮ নভেম্বর সর্বসম্মতিক্রমে ১৫ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
দিবসটি উপলক্ষে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে একত্র করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সমৃদ্ধ করা, পারস্পরিক আস্থা বাড়ানো এবং আরও শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
এদিকে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত থাকলে কোনো স্বৈরশক্তিই মাথা চাড়া দিতে পারে না।’
গণতন্ত্রের জন্য জীবন উৎসর্গকারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। একই সঙ্গে আহতদের প্রতি সমবেদনা জানান।
গণতন্ত্রের পূর্ণ চর্চা হোক বিশ্বজুড়ে
বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয় সরকারব্যবস্থাগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র অন্যতম। জনগণের অংশগ্রহণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমান অধিকার ও নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার ধারণাকে কেন্দ্র করেই বিকশিত হয়েছে এ শাসনব্যবস্থা। তবে গণতন্ত্রের বিকাশের পথ কখনোই সহজ বা সরল ছিল না।
১৯৯৭ সালে ফ্রান্সের রাজনীতিকদের মধ্যে সংলাপের মাধ্যম হিসেবে পরিচিত ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ) ‘ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অন ডেমোক্রেসি’ নামে একটি প্রস্তাব আনে। এতে গণতন্ত্রের নীতি, আদর্শ ও উপাদান, গণতান্ত্রিক সরকারের চর্চা এবং গণতন্ত্র সম্প্রসারণে আন্তর্জাতিক সুযোগ ও সম্ভাবনা তৈরির বিষয়ে ঘোষণা দেওয়া হয়।
এর আগে ফিলিপাইনে ফার্ডিনান্ড মার্কোসের ২০ বছরের স্বৈরশাসনের পতনের পর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ‘দি ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন নিউ অ্যান্ড রিস্টোর্ড ডেমোক্রেসিস’ বা আইসিএনআরডি নামে পরিচিত এ সম্মেলনের ষষ্ঠ আয়োজন হয় ২০০৬ সালে কাতারের রাজধানী দোহায়।
পরবর্তীতে কাতারের নেতৃত্বে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস পালনের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছেও এ বিষয়ে পরামর্শ ও প্রস্তাব আহ্বান করা হয়। পরে আইপিইউ ১৫ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস হিসেবে নির্ধারণের প্রস্তাব দিলে ২০০৭ সালের ৮ নভেম্বর তা সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। সে সময় গণতন্ত্রের সব ধরনের দায়-দায়িত্বের প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংসদ বা পার্লামেন্টকে ঘোষণা করা হয়।
‘Democracy’ শব্দটি এসেছে গ্রিক ‘Demos’ ও ‘Kritos/Kratos’ শব্দ থেকে। ‘Demos’ অর্থ জনগণ এবং ‘Kritos/Kratos’ অর্থ শাসনক্ষমতা বা কর্তৃত্ব। অর্থাৎ ব্যুৎপত্তিগতভাবে গণতন্ত্র হলো জনগণের শাসন। প্রাচীন গ্রিসের নগররাষ্ট্রে এর জন্ম হলেও আধুনিক গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটে ইংল্যান্ডে।
গণতন্ত্রের কোনো সর্বজনীন সংজ্ঞা নেই। সময় ও স্থানভেদে এর ধরন ও প্রয়োগে পার্থক্য দেখা যায়। তবে বহুল আলোচিত সংজ্ঞা হলো—জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য এবং জনগণের শাসনই গণতন্ত্র। আব্রাহাম লিংকনের এই ধারণা গণতন্ত্রের অন্যতম গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা হিসেবে বিবেচিত। ১৮৬৩ সালের ১৯ নভেম্বর পেনসিলভানিয়ার গেটিসবার্গের জাতীয় সমাধিস্থলে ঐতিহাসিক বক্তৃতায় তিনি গণতন্ত্রের এ সংজ্ঞা তুলে ধরেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার সংক্রান্ত সর্বজনীন ঘোষণার ২১(৩) নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জনগণের ইচ্ছাই হবে সরকারের ক্ষমতার ভিত্তি; এই ইচ্ছা সর্বজনীন ও সমান ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নৈমিত্তিকভাবে এবং প্রকৃত নির্বাচন দ্বারা ব্যক্ত হবে; গোপন ব্যালট অথবা অনুরূপ অবাধ ভোটদান পদ্ধতিতে এরূপ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’
বাংলাদেশের সংবিধানের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদেও গণতন্ত্রের ভিত্তি হিসেবে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণের কথা বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।’
তবে সংবিধানের এ অনুচ্ছেদের প্রকৃত কার্যকারিতা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা মত রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে গণতন্ত্র দিবস নিয়মিত পালিত হলেও বিশ্বের কত শতাংশ মানুষ এর সুফল পাচ্ছে, সেই প্রশ্নও থেকে যায়।
২০২২ সালে লন্ডনভিত্তিক দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গণতন্ত্র সূচকে এক ধাপ এগিয়ে ৭৫তম অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। ১৬৫টি দেশ ও দুটি অঞ্চল নিয়ে তৈরি ২০২১ সালের ওই সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৫ দশমিক ৯৯। আগের বছরও একই স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৭৬তম এবং তার আগের বছর ৮০তম।
গণতন্ত্রের সঙ্গে মানবাধিকারের সম্পর্কও গভীর। জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের সমমর্যাদা ও সম-অধিকার নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি। ধর্মচর্চা, ভোট প্রদান, চিন্তা ও বাক-স্বাধীনতার পাশাপাশি রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগও গণতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত।
তাই জনকল্যাণমূলক আধুনিক রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি হিসেবে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রকে দেখা হয়। দুটি বিষয় পরস্পরের পরিপূরক। গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা। ফলে মানবাধিকার নিশ্চিত না করে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করাও অসম্ভব।
গণতন্ত্রের পথও সহজ নয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের উপস্থিতি, সুষ্ঠু নির্বাচন, আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, সাংবিধানিক চর্চা, জবাবদিহি ও চিন্তার বহুত্ববাদিতার মতো বিষয়গুলো গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এসবের সঠিক চর্চা নিশ্চিত করা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। গণতন্ত্রের জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকেও অপরিহার্য মনে করা হয়। একই সঙ্গে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ব্যক্তি, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক দলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রই এখনো অধিকাংশ মানুষের কাছে কাম্য শাসনব্যবস্থা। তাই দেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক চেতনার আরও বিকাশ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়ানোর প্রত্যাশা রয়েছে।
গণতন্ত্রের স্বার্থে মানবাধিকারের চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করে তা মোকাবিলায় জনগণ, বিশেষ করে সুশীল সমাজকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। প্রত্যাশা—বিশ্বের প্রতিটি দেশে গণতন্ত্রের পূর্ণ চর্চা হোক, ছড়িয়ে পড়ুক এর সুফল, প্রতিষ্ঠিত হোক মানুষের অধিকার এবং মর্যাদা লাভ করুক মানবাধিকার।
পড়ুন : ৯/১১-এর পর ২৫ বছর: যুক্তরাষ্ট্র কী শিখল, বিশ্ব কী হারাল
সা./


