দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব এবার পড়েছে বেক্সিমকো ফার্মার পরিচালনা পর্ষদেও। কোম্পানিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়াতে সম্মত হয়েছেন। তাকে বাদ দিয়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বেক্সিমকো ফার্মা।
সম্প্রতি এ বিষয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) চিঠি দিয়ে জানিয়েছে কোম্পানিটি। চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বেক্সিমকো যে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছে, তা বিবেচনায় সালমান এফ রহমান পর্ষদ থেকে পদত্যাগে সম্মতি দিয়েছেন। তার কারণে যাতে কোম্পানির ব্যবসা ও শেয়ারধারীদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই বিবেচনাতেই তিনি পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়াতে রাজি হয়েছেন।
সালমান এফ রহমানকে বাদ দিয়ে বেক্সিমকো ফার্মার নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিএসইসিকে দেওয়া কোম্পানিটির চিঠি অনুযায়ী, নতুন পর্ষদে উদ্যোক্তাদের মধ্য থেকে তিনজন পরিচালক, চারজন স্বতন্ত্র পরিচালক, আইএফআইসি ব্যাংকের পক্ষ থেকে মনোনীত একজন পরিচালক এবং পদাধিকারবলে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকবেন।
এরই মধ্যে এ বিষয়ে বিএসইসির পক্ষ থেকে কোম্পানিটিকে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে নতুন পর্ষদ গঠনের প্রক্রিয়া এখন আনুষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
কোম্পানির পর্ষদ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মতামতও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, কোম্পানিটির বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও ব্যবসা ও কোম্পানির স্বার্থে সালমান এফ রহমানকে পরিচালনা পর্ষদ থেকে বাদ দেওয়ার পরিকল্পনার সঙ্গে একমত হয়েছেন।
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, বেক্সিমকো ফার্মার পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের সময় বিদেশি শেয়ারধারীদের প্রতিনিধিও পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এ প্রস্তাবে সম্মতি দেননি।
এ কারণে নতুন পর্ষদে বিদেশি শেয়ারধারীদের প্রতিনিধি রাখার পরিবর্তে স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী চারজন স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার মাধ্যমে পর্ষদকে পুনর্গঠন করার প্রক্রিয়া চলছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্ষদ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে কোম্পানির মালিকানা কাঠামো, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারের নিয়ম—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। ফলে নতুন পরিচালক নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
বেক্সিমকো ফার্মা শুধু বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়, লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেট বা এআইএমেও তালিকাভুক্ত। ফলে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়মের পাশাপাশি লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানও অনুসরণ করতে হবে।
বিএসইসিকে দেওয়া চিঠিতে বেক্সিমকো ফার্মা জানিয়েছে, লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের নিয়ম অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে কোম্পানির পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার আগে তার সম্পর্কে যথাযথ যাচাই-বাছাই করতে হয়।
এই যাচাই-বাছাই বা ডিউ ডিলিজেন্স প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় চার থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। ফলে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের ক্ষেত্রে কিছুটা সময় প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।
২০২৪ সালের আগস্টে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সালমান এফ রহমান গ্রেপ্তার হন। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন। তার গ্রেপ্তারের পর থেকেই বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়।
সালমান এফ রহমান দীর্ঘদিন ধরে বেক্সিমকো গ্রুপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। বেক্সিমকো ফার্মার পরিচালনা পর্ষদেও তিনি ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তবে বর্তমান রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক বাস্তবতায় কোম্পানিটির স্বার্থে তাকে পর্ষদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কোম্পানিটির পক্ষ থেকে বিএসইসিকে দেওয়া চিঠিতেও বলা হয়েছে, বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সালমান এফ রহমান পর্ষদে থাকলে কোম্পানির ব্যবসা এবং শেয়ারধারীদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে তিনি নিজেই পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়াতে সম্মত হয়েছেন।
শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, বেক্সিমকো ফার্মা দেশের ওষুধ খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানি। তবে সালমান এফ রহমানের মালিকানা ও প্রভাবের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে কোম্পানিটির সুনাম ও ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
তাদের মতে, সালমান এফ রহমান পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়ালে কোম্পানিটির জন্য ইতিবাচক বার্তা তৈরি হতে পারে। এতে ব্যবসা পরিচালনায় স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসার পাশাপাশি শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বাড়তে পারে।
বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে কোম্পানিটির ভাবমূর্তি পুনর্গঠন এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে নতুন পর্ষদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মুনাফায় শক্ত অবস্থানে বেক্সিমকো ফার্মা
রাজনৈতিক ও পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে নানা পরিবর্তনের মধ্যেও বেক্সিমকো ফার্মার আর্থিক কার্যক্রমে ভালো অবস্থান দেখা গেছে। কোম্পানিটির সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ প্রান্তিক শেষে কোম্পানিটি ২২২ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।
এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে, গত বছরের জুনে সমাপ্ত সময়ে কোম্পানিটি ৬৯৪ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। অর্থাৎ প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও কোম্পানিটি মুনাফা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
১৯৮৬ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় বেক্সিমকো ফার্মা। কোম্পানিটির মোট শেয়ারের প্রায় ৩০ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তাদের হাতে। উদ্যোক্তাদের মধ্যে সালমান এফ রহমানও একজন। বাকি প্রায় ৭০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক, বিদেশি এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে।
ফলে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন শুধু কোম্পানির অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারীর স্বার্থের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। নতুন পর্ষদ গঠনের পর কোম্পানিটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম আরও স্থিতিশীল হবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে—এমন প্রত্যাশাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে সালমান এফ রহমানের পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত বেক্সিমকো ফার্মার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন নতুন পরিচালনা পর্ষদে কারা যুক্ত হন এবং তাদের নেতৃত্বে কোম্পানিটি কীভাবে এগিয়ে যায়, সেদিকেই নজর থাকবে পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টদের।


