বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় বিএনপি চেয়ারম্যানের গুলশান কার্যালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
রিজভীর সহকারী একান্ত সচিব জাহেদুল আলম জানান, অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে দুই দেশের প্রতিনিধি দলের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশ ও চীনের পারস্পরিক রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সামনে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোকপাত করা হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশে চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলোর গতি আরও বৃদ্ধির বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন উভয় পক্ষ।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ায় বৈঠকে রুহুল কবির রিজভীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।
বৈঠকে চীনা দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন লিউ ইউইন ও রাজনৈতিক অ্যাটাশে লিং শুয়ান এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টার একান্ত সচিব কাজী নজরুল ইসলাম ও সহকারী একান্ত সচিব জাহেদুল আলম উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের একই কার্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক।
বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে যে ১৭ চুক্তি-সমঝোতা সই
১. চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতা বিষয়ক চুক্তি।
২. মোংলা বন্দর সুবিধা সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ প্রকল্পের কাঠামো চুক্তি।
৩. ‘২০২৬ মানবসম্পদ উন্নয়ন সহযোগিতা পরিকল্পনা’ যৌথ বাস্তবায়নের বিষয়ে সমঝোতা স্মারক।
৪. চীন এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে ‘বৈশি^ক উন্নয়ন উদ্যোগ’-এর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিতকরণ বিষয়ক সমঝোতা স্মারক।
৫. বাংলাদেশ থেকে চীনে তাজা কাঁঠাল রপ্তানির ক্ষেত্রে উদ্ভিদ স্বাস্থ্য (ফাইটোস্যানিটারি) সংক্রান্ত শর্তাবলি বিষয়ক প্রটোকল।
৬. চীন মিডিয়া গ্রুপ এবং বিটিভির মধ্যে সহযোগিতা জোরদারকরণ বিষয়ক স্মারক।
৭. চীন মিডিয়া গ্রুপ এবং বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক।
৮. ‘গ্লোবাল সাউথ মিডিয়া অ্যান্ড থিংক ট্যাংক ফোরাম’-এর কাঠামোর আওতায় চীনের সিনহুয়া নিউজ এজেন্সি এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এর মধ্যে সমঝোতা স্মারক।
৯. চীনের সিনহুয়া নিউজ এজেন্সি এবং বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক।
১০. চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চীনা ভাষা শিক্ষায় সহযোগিতা বিষয়ক চুক্তি।
১১. বৃত্তিমূলক শিক্ষায় সহযোগিতা জোরদারকরণ বিষয়ক সমঝোতা স্মারক।
১২. বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং কমিউনিস্ট পার্টি অব চায়নার মধ্যে আদান-প্রদান ও সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক।
১৩. সবুজ উন্নয়নে বিনিয়োগ সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে সমঝোতা স্মারক।
১৪. বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে যৌথ কর্মপরিকল্পনা।
১৫. চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলের ডেভেলপার ও ভূমি ইজারা চুক্তি।
১৬. চীন-বাংলাদেশ মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের লক্ষ্যে সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক।
১৭. দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ সহযোগিতা চুক্তি।
চীন ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রদ্বয়ের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক
বাংলাদেশ ও চীন এর সম্পর্ক প্রাচীন ও প্রায় তিন হাজার বছরের পুরোনো। বাঙালি সভ্যতা ও চীনা সভ্যতার মাঝে খ্রিষ্টের জন্মেরও হাজার বৎসর আগে থেকে যোগাযোগ আছে। প্রাচীনকাল থেকে ব্রহ্মপুত্র নদীর মাধ্যমে চীন এবং বাংলায় মানুষের যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ১৯৭৫ সাল থেকে চীন বাংলাদেশর আধুনিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হলেও বর্তমানে বাংলাদেশের উন্নয়নের এক অন্যতম অংশীদার চীন এবং বাংলাদেশ চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যবসায়িক পক্ষ। সম্প্রতি ২০১৭ সালে বাংলাদেশ নৌ বাহিনী চীন থেকে দুইটি সাবমেরিন তার অস্ত্রভাণ্ডারে যুক্ত করে। চীনের সাথে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক এখন ভারতসহ প্রতিবেশী অনেক দেশের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকার সংসদ ভবন এলাকায় চীনা দূতাবাসের সাথে যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশ সরকারের আয়োজিত ড্রোন প্রদর্শনী।
বাংলাদেশ চীন কূটনৈতিক সম্পর্কে বাংলাদেশের চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে একটি দূতাবাস, হং কং ও কুনমিংয়ে কনস্যুলেট রয়েছে। ঢাকায় রয়েছে চীনের এমব্যাসি। চীন ও বাংলাদেশ বাংলাদেশ চীনা মায়ানমার ও ভারত ফোরাম ফর রিজিওনাল কোঅপারেশনের সদস্য। চীন—বাংলাদেশ এখন কৌশলগত অংশীদারি চুক্তির মাধ্যমে সামরিক ও বেসামরিক ভাবে মৈত্রী চুক্তিবদ্ধ। আগামী বৎসরগুলোর মধ্যে চীনের সাথে বাংলাদেশের সরাসরি রেল ও সড়ক যোগাযোগ স্থপিত হবে।
দুই দেশের মধ্যে সর্ম্পকের শুরু
চীনা ম্যাপে যোং হে তার নৌবহর নিয়ে বাংলার রাজধানী সোনারগাঁয় এসেছিলেন বাংলাদেশকে চীনের সঙ্গে যুক্ত করেছিল যে পথ, তার নাম সিল্ক রোড নামে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। ছিল পশ্চিমা সিল্ক রোড, যার সূচনা হয়েছিল রাজধানী সিয়ান (তৎকালীন ছাংআন) থেকে। সেই পথ সিনজিয়াং হয়ে আফগানিস্তানের ভেতর দিয়ে ভারত হয়ে পৌঁছেছিল বাংলাদেশে (মংচিয়ালা)। কয়েক শতাব্দী ধরে এই মংচিয়ালাই ছিল চীন ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যকার সম্পর্কের সেতুবন্ধ। একটি পূর্ব সিল্ক রোডও ছিল, যার উৎপত্তি হয়েছিল দক্ষিণ চীনের কুনমিং থেকে। মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে তা সংযোগ স্থাপন করেছিল বাংলাদেশের সঙ্গে। এই দুটি পথ ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল, বৃদ্ধি পেয়েছিল সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান।
প্রাচীনকাল থেকেই চীন ও বাংলাদেশ উভয়ই সমুদ্র উপকূলীয় দেশ বিধায় সমুদ্রপথে তাদের মধ্যকার আদান-প্রদান ছিল চমৎকার। প্রায় ৬০০ বছর আগে চীনের মিং রাজবংশের পরাক্রমশালী সম্রাট ছিলেন ইয়ংলে। সেই সময়ের শ্রেষ্ঠ নাবিক অ্যাডমিরাল ঝেং হে ছিলেন সম্রাটের শান্তির দূত; তিনি ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর পরিভ্রমণ করেন। তিনিই সমুদ্রপথে চীনা সিল্ক রোড সৃষ্টি করেন। ১৪০৫ থেকে ১৪৩৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অ্যাডমিরাল ঝেং হে শতাধিক জাহাজের বিশাল বহর নিয়ে সাতটি আন্তসমুদ্র অভিযান পরিচালনা করেন এবং এশিয়া ও আফ্রিকার ৩০টি দেশ ও অঞ্চল পরিভ্রমণ করেন। অ্যাডমিরাল ঝেং হের নৌবহর দুবার চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছিল। বাংলার শাসক সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ তার রাজধানী সোনারগাঁয়ে সাদর অভ্যর্থনা জানান চীন থেকে আসা অ্যাডমিরালকে। সুলতান পরবর্তী সময়ে একটি দীর্ঘ গ্রীবার জিরাফসহ মূল্যবান নানা উপহার পাঠান মিং রাজার দরবারে। চীনা ঐতিহ্য অনুসারে জিরাফকে সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করা হয়।[১]
প্রাচীনকাল থেকে চীন নৌ ও স্থলশক্তিতে অত্যন্ত বলবান দেশ হওয়া সত্ত্বেও সমগ্র ইতিহাসে চীন অন্য কোনো দেশে নিজেদের উপনিবেশ স্থাপন করেনি, অন্য কোনো দেশ দখল করে নেয়নি। বরং সব দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে এসেছে।
রাজনৈতিক সম্পর্ক
চল্লিশের দশকের শেষ বছরে সংঘটিত চীনা বিপ্লবের অব্যবহিত পর থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক এক নতুন রূপ নেয়। এ সম্পর্ক রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক নিয়মের নিগড়ে আবদ্ধ ছিল না; এটা ছিল আদর্শিক সম্পর্ক। এ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বাংলাদেশের বামপন্থী আন্দোলনের শিকড়সূত্রে। বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন-লাই একাধিকবার বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) সফর করেছেন। স্বাধীনতার আগে থেকেই চীনা কমিউনিস্ট পার্টি বাংলার জাতীয়তাবাদী নেতাদের সঙ্গে, বিশেষ করে মওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। চীন-বাংলা সম্পর্কের ছন্দপতন ঘটে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামকে কেন্দ্র করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় দক্ষিণ এশিয়ায় জটিল ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চীন পাকিস্তানের পক্ষে ও বাংলাদেশের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে নানা কারণে চীনের বৈরী সম্পর্ক এবং ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধে ভারতের সঙ্গে চীনের তিক্ততা মারাত্মক রূপ ধারণ করেছিল। এ অবস্থায় সোভিয়েত রাশিয়া ও ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিলে চীন দক্ষিণ এশিয়ায়র একমাত্র রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর বহু দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলেও ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। এমনকি বাংলাদেশের জাতিসংঘের সদস্য পদপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে চীন ১৯৭৪ সাল অবধি বিরোধিতা করেছে। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ১৯৭৫ সালের শেষে ও ১৯৭৬ সালের শুরুতে চীন–বাংলাদেশ সম্পর্কের যে ভিত্তি রচিত হয়েছিল তার প্রধান অবলম্বন ছিল নিরাপত্তা ইস্যু। সেদিক থেকে এ সম্পর্ক সামরিক-রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে বৃত্তাবদ্ধ ছিল। ফলে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কের প্রাথমিক সূত্র তৈরি হয় অস্ত্র সরবরাহের মধ্য দিয়ে।[২]
অর্থনৈতিক সম্পর্ক
চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বাণিজ্যিক অংশীদার। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। চীনের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি অনেক বেশি। বাংলাদেশে চীন থেকে ৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য সামগ্রী আমদানির বিপরীতে মাত্র ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্যসামগ্রী রপ্তানি করে। তবে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে চীনের সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। এছাড়াও সম্প্রতি চীন বাংলাদেশের ৯৭শতাংশ পণ্যের উপর শুল্ক ছাড় দিয়েছে, যার ফলে বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ঘাটতি কিছুটা হলেও কমবে।
পড়ুন : আজ আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস
সা/


