মানবাধিকার ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে ফ্রান্স। জাতিসংঘে ফ্রান্সের স্থায়ী মিশন বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। গত জুলাইয়ের শেষ দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া ওই পোস্টকে কেন্দ্র করে দুই মিত্র দেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল।
পোস্টটি প্রকাশের পর ওয়াশিংটনের অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসে। এমনকি বিষয়টি এতটাই জটিল হয়ে উঠেছিল যে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বৈঠকে ফ্রান্সের প্রতিনিধি বক্তব্য দেওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা সভা থেকে বেরিয়ে যান বলে জানা গেছে।
এ ঘটনার পর ফ্রান্সের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করাকে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্প্রতি জাতিসংঘে মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্কের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে একটি ভোট অনুষ্ঠিত হয়। তার মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবের বিপক্ষে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়াসহ কয়েকটি দেশ ভোট দেয়। ওই ভোটে যুক্তরাষ্ট্রও তাদের সঙ্গে অবস্থান নেয়।
এই ভোটের পর জাতিসংঘে ফ্রান্সের স্থায়ী মিশনের পক্ষ থেকে গত ২৫ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। সেখানে মানবাধিকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
পোস্টটি ওয়াশিংটনের নজরে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের মিত্রতা এবং অভিন্ন মূল্যবোধের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এমন প্রকাশ্য সমালোচনা পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তোলে।
ফ্রান্সের ওই পোস্টের পর জাতিসংঘের বিভিন্ন কূটনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওই পোস্টকে ঘিরে দুই দেশের টানাপোড়েনের প্রভাব জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বৈঠকেও দেখা যায়। ফ্রান্সের প্রতিনিধি বক্তব্য দেওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা সভা থেকে বেরিয়ে যান বলে বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা গেছে।
একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের কারণে জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মঞ্চে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ায় এ বিরোধকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখেছেন অনেক কূটনীতিক।
তবে দুই দেশের সম্পর্ক যেন দীর্ঘমেয়াদি সংকটে না পড়ে, সে জন্য পরবর্তী সময়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ফ্রান্সের ওই পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় ওয়াশিংটনে ফ্রান্সের পরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনীত প্রার্থীর নিয়োগ আটকে দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র সরকার।
ফ্রান্সের পক্ষ থেকে অরেলিয়েঁ লেশেভালিয়েকে ওয়াশিংটনে পরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। সেপ্টেম্বরের মধ্যেই তাকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে চেয়েছিল প্যারিস।
কিন্তু ২৫ জুলাই এক্সে ওই বিতর্কিত পোস্ট প্রকাশের পর তার নিয়োগ-প্রক্রিয়া আর আগের মতো এগোয়নি বলে জানা গেছে। ফলে ফ্রান্সের কূটনৈতিক মহলে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
এ অবস্থায় ফ্রান্সের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশকে রাষ্ট্রদূতের নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে জাতিসংঘে ফ্রান্সের স্থায়ী মিশন একটি বিবৃতি দিয়েছে। এতে গত ২৫ জুলাই এক্সে প্রকাশিত ওই বার্তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জেনেভায় জাতিসংঘের কাছে ফ্রান্সের স্থায়ী মিশন মানবাধিকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রকাশ করা ওই বার্তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছে।
তবে একই বিবৃতিতে ফ্রান্স স্পষ্ট করেছে, দুই দেশের মতপার্থক্য মূলত একটি নির্দিষ্ট ভোটকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল। এটি মানবাধিকার রক্ষার বিষয় নিয়ে দুই দেশের মৌলিক মতপার্থক্য নয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মাধ্যমে ফ্রান্স একদিকে নিজেদের আগের বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মানবাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে দীর্ঘদিনের সহযোগিতার গুরুত্বও তুলে ধরেছে।
ফ্রান্সের দুঃখ প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, তারা ফ্রান্সের বিবৃতিটি লক্ষ্য করেছেন এবং এর প্রশংসা করছেন।
তিনি আরও বলেন, অভিন্ন মূল্যবোধ ও স্বার্থ সমুন্নত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ফ্রান্সের সঙ্গে মিলে কাজ করার আশা রাখে।
ওয়াশিংটনের এই প্রতিক্রিয়াকে দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন কমানোর ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রদূত নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বিষয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, দুঃখ প্রকাশের পর তা কাটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ফ্রান্সের দৈনিক ল্য মঁদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশের ফলে ওয়াশিংটনে দেশটির মনোনীত পরবর্তী রাষ্ট্রদূত অরেলিয়েঁ লেশেভালিয়ের নিয়োগ অনুমোদনের পথ প্রশস্ত হতে পারে।
ফ্রান্সের পরিকল্পনা ছিল সেপ্টেম্বরের মধ্যেই তাকে ওয়াশিংটনে পাঠানো। তবে জুলাইয়ের শেষ দিকে বিতর্কিত পোস্ট প্রকাশের পর তার নিয়োগের প্রক্রিয়া আর এগোয়নি।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই এ প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন আটকে থাকলে তা দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারত। ফ্রান্সের সাম্প্রতিক দুঃখ প্রকাশ সেই জটিলতা কাটাতে সহায়ক হতে পারে।
ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক এই বিরোধ মূলত একটি নির্দিষ্ট ভোট ও তার পরবর্তী বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে। তবে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সহযোগিতা রয়েছে।
ফ্রান্সের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে, উভয় পক্ষই বিরোধটিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে চায় না। বরং অভিন্ন স্বার্থ ও মূল্যবোধকে সামনে রেখে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য দুঃখ প্রকাশের বিষয়ে নতুন করে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। এখন অরেলিয়েঁ লেশেভালিয়ের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগের প্রক্রিয়া কত দ্রুত এগোয়, সেটিই হবে দুই দেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন কাটার অন্যতম দৃশ্যমান সূচক।
সব মিলিয়ে, মানবাধিকারবিষয়ক একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ আপাতত কূটনৈতিকভাবে সামাল দেওয়ার পথে এগোচ্ছে। ফ্রান্সের দুঃখ প্রকাশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দুই মিত্র দেশের সম্পর্ক আবারও স্বাভাবিক ধারায় ফিরবে—এমন প্রত্যাশাই এখন জোরালো হচ্ছে।
পড়ুন:মক্কা চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন, যা বলছে তুরস্ক
ইমি/


