র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের আওতাধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) এসংক্রান্ত নতুন আইনের গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার।
গেজেটে বলা হয়েছে, দেশের জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনের মাধ্যমে সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমুন্নত রাখতে পুলিশ বাহিনীকে সহায়তার উদ্দেশ্যে একটি আধুনিক, পেশাদার, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক বিশেষায়িত ইউনিট থাকা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে এই ধরনের বিশেষায়িত বাহিনীর ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, তদারকি ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমানভাবে জরুরি। মূলত এই প্রয়োজনীয়তাগুলো বিবেচনা করেই বিদ্যমান র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে নতুন এই স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।
র্যাব গঠন হয়েছিল যেভাবে
২০০৪ সালের ২৬ মার্চ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস দমনের উদ্দেশ্যে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৯’ সংশোধনের মাধ্যমে এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠিত হয়. তৎকালীন চারদলীয় ঐক্যজোট সরকারের আমলে দেশের চরমপন্থী ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দমনের প্রতিশ্রুতি পূরণে এই বিশেষায়িত ইউনিটটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
নিচে র্যাব গঠনের প্রেক্ষাপট, আইনি ভিত্তি এবং এর কাঠামোগত বিবর্তনের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:
১. গঠনের মূল প্রেক্ষাপট
আইনশৃঙ্খলার অবনতি: ২০০০ সালের শুরুর দিকে বাংলাদেশে চরমপন্থী সংগঠনগুলোর তৎপরতা, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার এবং খুন-ডাকাতির মতো অপরাধ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।
অপারেশন ক্লিন হার্ট: ২০০২ সালে অপরাধ দমনে সেনাবাহিনী নামিয়ে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ পরিচালনা করা হয়। এই অভিযান শেষ হওয়ার পর অপরাধ দমনে একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী যৌথ বিশেষ বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে সরকার।
যৌথ কমান্ডের ধারণা: প্রচলিত পুলিশ বাহিনীর একাংশের সীমাবদ্ধতা দূর করতে সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে একটি চৌকস এলিট ফোর্স তৈরির পরিকল্পনা করা হয়।
২. আইনি প্রক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিক যাত্রাআইন সংশোধন: ২০০৩ সালের ১২ জুলাই বিদ্যমান আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইন সংশোধন করে র্যাব গঠনের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করা হয়।
আনুষ্ঠানিক প্রকাশ: ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের প্যারেডে র্যাব সদস্যরা প্রথম জনগণের সামনে আত্মপ্রকাশ করে.কার্যক্রমের সূচনা: একই বছরের ১৪ এপ্রিল (পহেলা বৈশাখ) থেকে র্যাব আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের মাঠপর্যায়ের অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু করে।
৩. বাহিনী গঠন ও সাংগঠনিক কাঠামোমিশ্র সংমিশ্রণ: র্যাব একটি সমন্বিত বাহিনী। এটি বাংলাদেশ পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসার ও ভিডিপি এবং কোস্ট গার্ডের সদস্যদের ডেপুটেশনের (প্রেষণ) ভিত্তিতে নিয়ে গঠিত হয়।
মূল দায়িত্ব: শুরু থেকেই এদের প্রধান কাজের পরিধি ছিল সন্ত্রাস দমন, বিশেষ অস্ত্র অভিযান, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার, এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ও ভিআইপিদের নিরাপত্তা প্রদান।
৪. সাম্প্রতিক রূপান্তর ও বিলুপ্তি
দীর্ঘ দুই দশক কার্যক্রম পরিচালনার পর, ২০২৬ সালে বাহিনীটির একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটে:
সংস্থাটির বিলুপ্তি: বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সমালোচনার মুখে ২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর র্যাব-কে বিলুপ্ত করা হয়।
নতুন ইউনিটের আত্মপ্রকাশ: ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (SRB) আইন, ২০২৬’-এর অধীনে র্যাবের পরিবর্তে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন নামে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে সম্পূর্ণ নতুন একটি ইউনিট গঠন করে আইন পাশ করা হয়েছে।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্তির পেছনে মূল কারণ ছিল আইনি কাঠামোর অসম্পূর্ণতা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অভাব এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে ওঠা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ. ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতীয় সংসদে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে এই এলিট ফোর্সটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করা হয়।
১. আইনি কারণসমূহ (Legal Reasons)
আইনি কাঠামোর অসম্পূর্ণতা: ২০০৪ সালে র্যাব গঠনের সময় কোনো স্বতন্ত্র পূর্ণাঙ্গ আইন করা হয়নি. এটি মূলত ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৯’ (২০০৩ সালের সংশোধনী)-এর একটি বিশেষ সেকশনের অধীনে তৈরি হয়েছিল. স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, একটি বিশেষায়িত এলিট ফোর্স পরিচালনার জন্য এই আইনি কাঠামোটি যথেষ্ট বা ত্রুটিমুক্ত ছিল না।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি: পুরনো আইনি কাঠামোটিতে র্যাব সদস্যদের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে বা তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত করার জন্য কোনো শক্তিশালী ও স্বচ্ছ বিধিমালার সুনির্দিষ্ট উল্লেখ ছিল না।
আইনি সংস্কারের বাধ্যবাধকতা: ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের অংশ হিসেবে পুলিশ প্রশাসন সংস্কার বিষয়ক কমিটি র্যাব বিলুপ্তির আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়. ফলস্বরূপ, পুরনো অর্ডিন্যান্সটি রহিত করে সম্পূর্ণ নতুন আইনি কাঠামোয় পুলিশ বাহিনীর অধীনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠন করতে বাধ্য হয় সরকার।
২. প্রাতিষ্ঠানিক কারণসমূহ (Institutional Reasons)
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ‘ক্রসফায়ার’ সংস্কৃতি: দুই দশক ধরে র্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড (যা ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ নামে পরিচিত), গুম ও হেফাজতে নির্যাতনের ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। বিগত সরকারের পতনের পর গঠিত ‘গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন’-এর কাছে র্যাবের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ১৭২টি গুমের অভিযোগ জমা পড়ে, যা এই বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক বিলুপ্তির অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সামরিকীকরণের বিতর্ক (Militarisation of Policing): র্যাব মূলত একটি মিশ্র বাহিনী হলেও এর গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল কমান্ড ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আসতেন সামরিক বাহিনী (সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী) থেকে ডেপুটেশনের (প্রেষণ) মাধ্যমে. বেসামরিক পুলিশিং বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সামরিক কর্মকর্তাদের এই দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার এবং সাধারণ পুলিশ বাহিনীর সমান্তরাল আরেকটি কমান্ড চেইন থাকা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত নানা জটিলতা তৈরি হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক চাপ ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা: গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র র্যাব এবং এর তৎকালীন ও সাবেক ৭ শীর্ষ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা (Global Magnitsky Sanctions) আরোপ করে. এছাড়াও জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা (যেমন- হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল) লাগাতারভাবে এই বাহিনী সংস্কার বা বিলুপ্তির জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছিল।
রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার: র্যাব-কে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গুম বা হয়রানি এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠরোধে “সরকারি ডেথ স্কোয়াড” বা পলিটিক্যাল টুল হিসেবে ব্যবহারের যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বের হয়ে আসার লক্ষ্যেই এই সংস্কারমূলক বিলুপ্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
পড়ুন : একনেকে উঠছে তিন মেট্রোরেল প্রকল্প


