নিজস্ব অর্থায়নে ২০৩০ সালের মধ্যে সারাদেশে ৬৮৯ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিভিন্ন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
বিপিডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, “গ্রিড সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের জন্য প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) প্রণয়ন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) চূড়ান্ত করেছি। একইসঙ্গে গ্রিড-সংযুক্ত সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্য জমিও নির্বাচন করা হয়েছে।”
এরই মধ্যে রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে পিডিবি। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পটি স্থাপন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি) ফেনীর সোনাগাজীতে ২২২ মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্রিড-সংযুক্ত সৌর ফটোভোলটাইক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করেছে। ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ চলছে।
পিডিবির ওই কর্মকর্তা জানান, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিজস্ব অর্থায়নে ৬৮৮ কিলোওয়াট-পিক ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করেছে। পাশাপাশি চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ৪ হাজার ১৯৫ কিলোওয়াট-পিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
তিনি জানান, পিডিবির নিজস্ব ভবন ও জমিতে নিজস্ব অর্থায়নে ১৭টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের জন্য দুই বছর আগে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল।
পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, কাপ্তাইয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং একাডেমিতে ১৭০ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। চট্টগ্রাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ১৩০ কিলোওয়াট-পিকের একটি ব্যবস্থা চলতি বছরের জুনে এবং রাজশাহী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ১২০ কিলোওয়াট-পিকের আরেকটি ব্যবস্থা ৫ সেপ্টেম্বর চালু হয়েছে।
এ ছাড়া গত ১২ সেপ্টেম্বর খুলনা পাওয়ার প্ল্যান্টে ২৬৮ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে মোট ৪ হাজার ১৯৫ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালুর কাজ করছে পিডিবি।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে ৩০০ কিলোওয়াট-পিক, কাটাখালীতে ৭৩ কিলোওয়াট-পিক, বাঘাবাড়ী পাওয়ার স্টেশনে ৬৫ কিলোওয়াট-পিক এবং ভোলা ২২৫ মেগাওয়াট পাওয়ার প্ল্যান্টে ১৯০ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা।
এ ছাড়া কক্সবাজার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ২৩০ কিলোওয়াট-পিক, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৩৩২ কিলোওয়াট-পিক, ঘোড়াশাল পাওয়ার স্টেশনের ভবনগুলোতে ১ হাজার ৩০০ কিলোওয়াট-পিক ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৮৭ কিলোওয়াট-পিক, চট্টগ্রাম পাওয়ার স্টেশনে ৩৯০ কিলোওয়াট-পিক, দোহাজারী-কালীআইশ ১০০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্ল্যান্টে ১২২ কিলোওয়াট-পিক, শিকলবাহা পাওয়ার প্ল্যান্টে ৭৫০ কিলোওয়াট-পিক, হাটহাজারী ১০০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্ল্যান্টে ৮৬ কিলোওয়াট-পিক এবং ঘোড়াশাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ১৭০ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে।
পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, “পিডিবির মালিকানাধীন অব্যবহৃত ছাদ ও জমিতে নিজস্ব অর্থায়নে এসব সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করা হবে।”
তিনি বলেন, “এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের জলবায়ু সংক্রান্ত অঙ্গীকার পূরণে সহায়তা করবে। পাশাপাশি পরিবেশের ওপর চাপ কমাবে এবং ব্যক্তিপর্যায়ে নিজ বাড়ির ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনে উৎসাহিত করবে।”
সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতি আমদানিতে ৬ মাস শুল্ক-কর রেয়াতি সুবিধা
নবায়নযোগ্য সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে ছয় মাস পর্যন্ত শুল্ক-কর রেয়াতি সুবিধায় যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানির বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ৭ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভা বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নবায়নযোগ্য সৌরশক্তি উৎপাদনের প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে ১ শতাংশের অতিরিক্ত কাস্টমস ডিউটি, সম্পূর্ণ রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আগাম কর এবং অগ্রিম আয়কর থেকে প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে ১৮০ দিন পর্যন্ত অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ সুবিধার ফলে বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে জনজীবনে সৃষ্ট ভোগান্তি কমবে, শিল্প উৎপাদন অব্যাহত থাকবে এবং উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে যন্ত্রপাতির ক্ষয়ক্ষতি কমার পাশাপাশি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে নবায়নযোগ্য সৌরশক্তি উৎপাদনের মাধ্যমে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে সহায়তা করবে এ উদ্যোগ।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, মন্ত্রিসভা বৈঠকে নবায়নযোগ্য সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে ছয় মাস পর্যন্ত শুল্ক-কর রেয়াতি সুবিধায় যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানির বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
বাংলাদেশে তীব্র জ্বালানি সংকটের মধ্যেই বেড়েছে লোডশেডিং। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় নাজেহাল সাধারণ মানুষ। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে এ নিয়ে সরকারের কাছেও নেই সুনির্দিষ্ট কোনো আশার বার্তা।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায়, বর্তমানে দেশজুড়ে নিয়মিত কমবেশি আড়াই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং দিতে হচ্ছে দিনে।
অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে এবছর এক সময়ে তিন হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট পর্যন্তও লোডশেডিং দিতে হয়েছে।
গত ১০ই জুলাই দুপুরে ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ১২ হাজার ৫০৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।
এমন প্রেক্ষাপটে বেশ জোরেশোরেই সামনে আসছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়টি। বিশেষ করে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
কিন্তু এখানেও রয়েছে নানা যদি-কিন্তুর হিসাব। কারণ সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন, এর ব্যবস্থাপনা এবং খরচের হিসেবনিকেষের অতীত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য খুব একটা সুখকর নয়।
তারপরও সৌর বিদ্যুতের পথেই এগোনোর পরিকল্পনা নিয়েছে বর্তমান সরকার।
সম্প্রতি বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন যে, বর্তমান সরকারের মেয়াদে সৌর বিদ্যুতের সক্ষমতা ১০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে এবার স্থানীয় পর্যায়ে এলাকাভিত্তিক সেবা দাতা ও বিনিয়োগকারীর তালিকা তৈরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো।
তালিকাভুক্ত সার্ভিস প্রোভাইডাররা স্থানীয় পর্যায়ে রুফটপ সোলারসহ বিভিন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি স্থাপনে কারিগরি সহায়তা, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক প্যাকেজ, গ্রাহকসেবা এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা দেবে।
কিন্তু, বাংলাদেশের মতো বর্ষাপ্রধান অঞ্চল, যেখানে বছরের বড় সময় সূর্য মেঘে ঢাকা থাকে সেখানে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের সক্ষমতা এবং নীতিগত স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের অনেকে।
পড়ুন : কারখানায় সরবরাহ বেড়েছে, বাসাবাড়িতে গ্যাস বিদ্যুৎ সংকট কাটবে কবে?
সা/


