আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্কে শুরু হতে যাওয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সরাসরি যোগ দিতে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে ভিসা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। ফলে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো জাতিসংঘের বার্ষিক এই অধিবেশনে সরাসরি অংশ নিতে পারছেন না তিনি।
একই সঙ্গে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) কর্মকর্তাদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞার পরিধি আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে মাহমুদ আব্বাসকে মার্কিন ভিসা না দেওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তাসংস্থা এএফপি। সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাও এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
এর আগে ২০২৫ সালের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগে পিএলও ও পিএ কর্মকর্তাদের ভিসা দেওয়া হয়নি অথবা আগের ভিসা বাতিল করা হয়েছিল। তবে জাতিসংঘের সদর দপ্তর-সংক্রান্ত চুক্তির আওতায় জাতিসংঘে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মিশন কিছু ক্ষেত্রে ছাড় পেয়েছিল। এর ফলে গত বছর সদস্য দেশগুলোর অনুমোদনের পর মাহমুদ আব্বাস ভার্চুয়ালি অধিবেশনে বক্তব্য দেন।
এবার ভিসা না দেওয়ার সিদ্ধান্তের আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, পিএ কর্মকর্তা ও পিএলও সদস্যদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরও বাড়ানো হবে। তাদের বিরুদ্ধে সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থতা এবং শান্তির সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর কয়েক দিন আগে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, তারা কংগ্রেসকে জানিয়েছে যে পিএলও ও পিএ আবারও যুক্তরাষ্ট্রের আইনের আওতায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এর কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থায় তাদের কিছু কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) মাধ্যমে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টার কথাও উল্লেখ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এ ছাড়া আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পরিবর্তে একতরফাভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা করে আলোচনা এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগও ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এনেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। পাশাপাশি পিএলও ও পিএ এখনো ‘সন্ত্রাসীদের ভাতা দেয়া এবং সন্ত্রাসবাদকে মহিমান্বিত করা’ অব্যাহত রেখেছে বলেও অভিযোগ করেছে তারা।
গত বছরের মতো এবারও এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে সামনে রেখে। ২০২৫ সালের অধিবেশনের আগে পিএলও ও পিএ কর্মকর্তাদের ভিসা না দেওয়া কিংবা আগের ভিসা বাতিলের একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে মার্কিন ভিসা সংক্রান্ত ঘোষণার বিষয়ে ফিলিস্তিনি পক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
এর আগে বার্তাসংস্থা আনাদোলু যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের কাছে জানতে চেয়েছিল, মাহমুদ আব্বাস ও ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদলের ভিসার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না এবং ভিসা না দেওয়া বা নিষেধাজ্ঞার আইনি ভিত্তি কী।
জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের উপমুখপাত্র পালোমা চাকন ই-মেইলে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে, ‘প্রতিটি ভিসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তই জাতীয় নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত’—জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অংশগ্রহণকারীদের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য।
চাকন বলেন, ‘জাতিসংঘের আয়োজক দেশ হিসেবে আমাদের দায়িত্বকে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে নিই। তবে সব আবেদনকারীর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মানের যাচাই ও নিরাপত্তা পরীক্ষা নিশ্চিত করে আমরা আমেরিকানদের সুরক্ষা অব্যাহত রাখব।’
তিনি আরও বলেন, সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগে ভিসার আবেদনের বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিনিধিদলকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত যাচাইয়ের মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হলে বা অন্য কোনো নির্দেশনা না মানলে ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হতে পারে।
ফিলিস্তিন ও যুক্তরাষ্ট্র বিরেোধ
ফিলিস্তিন ইস্যুতে শুরু থেকেই দুই রাষ্ট্রের সমাধানকে সমর্থন করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। এই সমাধানের অর্থ হলো, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। তবে এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি। গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র দেশগুলোর অনেকে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলেও ওয়াশিংটনের অবস্থানে পরিবর্তন আসেনি।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগে জো বাইডেন প্রশাসনও দুই রাষ্ট্রের সমাধানের নীতির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছিল। কিন্তু একই সময়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো দিয়ে ফিলিস্তিনকে পূর্ণ সদস্য হওয়ার পথেও বাধা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪ সালের এ ভোটের সময়ও মার্কিন পক্ষ বলেছিল, ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে আসা উচিত।
এ কারণে প্রশ্ন উঠছে, ফিলিস্তিন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের এমন অবস্থানের পেছনে কারণ কী? কেনই বা দেশটি ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছে?
এই অবস্থান বুঝতে হলে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়টিও জানা জরুরি।
এর আগে আরেকটি বিষয় জেনে রাখা দরকার। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য এবং ভেটো ক্ষমতাধারী দেশগুলোর মধ্যে চীন ও রাশিয়া ফিলিস্তিনকে আগেই স্বীকৃতি দিয়েছে। যুক্তরাজ্যও ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফ্রান্সও এ পথে এগিয়েছে। ফলে স্থায়ী সদস্য দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রই এখন ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি না দেওয়া দেশ হিসেবে রয়েছে।
মূল কারণ ও বিরোধের ক্ষেত্র
ইসরায়েলপ্রীতি ও কৌশলগত মিত্রতা: ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ও সামরিক মিত্র মনে করে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলকে নিয়মিত বিশাল অংকের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে আসছে ওয়াশিংটন।
রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া: ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ দেওয়া বা একতরফাভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের দাবি, সরাসরি আলোচনার মাধ্যমেই কেবল এই সংকটের সমাধান হতে হবে।
ভোট ও ভিটো প্রয়োগ: জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের পূর্ণ সদস্যপদ পাওয়ার পথে যুক্তরাষ্ট্র বারবার ভিটো ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে। সাম্প্রতিক সময়েও ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রীক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে কূটনৈতিক চাপ ও ভিসা নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যার সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের জাতিসংঘ অধিবেশনে যাওয়ার ওপর ভিসাসংক্রান্ত কড়াকড়ির খবর পাওয়া গেছে।
পশ্চিম তীর ও বসতি স্থাপন: ফিলিস্তিনি ভূমিতে ইসরায়েলি অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি প্রায়শই ইসরায়েলকে পরোক্ষ সুরক্ষা বা নমনীয়তা দিয়েছে, যা ফিলিস্তিনিদের ক্ষুব্ধ করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি
গাজা যুদ্ধ ও ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের দাবিতে বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনের পক্ষে জনমত বাড়লেও, যুক্তরাষ্ট্র তার পুরনো অবস্থান থেকে সরে আসেনি। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (PA) ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা এবং জাতিসংঘে ফিলিস্তিনি শীর্ষ নেতাদের চলাচলে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনা এই বিরোধকে আরও জটিল করে তুলেছে।
পড়ুন : বাংলাদেশ প্রবেশ করছে বৈদ্যুতিক ট্রেনের যুগে, চলবে যেসব রুটে
সা/


