দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। এ কর্মসূচির আওতায় গৃহস্থালি, প্রাতিষ্ঠানিক ও শিল্প পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি স্থাপনে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হবে। সরকারের দেওয়া এ ঋণের সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে বার্ষিক মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ।
তবে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সুবিধাভোগীদের যে ঋণ দেবে, তাতে সব ধরনের ফি ও চার্জসহ কার্যকর বার্ষিক সুদহার সর্বোচ্চ ৬ শতাংশের মধ্যে রাখতে হবে। কোনো অবস্থাতেই নির্ধারিত এই সীমা অতিক্রম করা যাবে না।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সামষ্টিক অর্থনীতি অনুবিভাগ থেকে গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) জারি করা এক পরিপত্রে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। পরিপত্রে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির উচ্চমাত্রার ব্যবহার দেশের উৎপাদন ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সহজ শর্তে ও স্বল্প ব্যয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় এ কর্মসূচির জন্য মোট ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হবে। এর মধ্যে ১ হাজার কোটি টাকা চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এমএসএমই খাতের জন্য সংরক্ষিত ২ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ থেকে পুনর্বিন্যাস করে সংস্থান করা হবে। বাকি ৫০০ কোটি টাকা পরিচালন বাজেট থেকে দেওয়া হবে।
এই অর্থ তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (আইডকল), বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেড (বিআইএফএফএল) এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৫০০ কোটি টাকা করে সরকারি ঋণ দেওয়া হবে।
এ জন্য অর্থ বিভাগ ও প্রতিটি অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পৃথক ঋণচুক্তি সম্পাদন করা হবে। এসব চুক্তিতে ঋণের পরিমাণ, অর্থ ব্যবহারের অনুমোদিত খাত, ঋণ পরিশোধ, প্রতিবেদন, নিরীক্ষা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় শর্ত উল্লেখ থাকবে।
অর্থ বিভাগ প্রয়োজন অনুযায়ী অথবা অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের চাহিদার ভিত্তিতে চুক্তি সম্পাদন এবং অন্যান্য শর্ত পূরণের পর অর্থ ছাড় করবে।
পরিপত্র অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের কাছ থেকে যে ঋণ পাবে, তার সুদহার হবে বার্ষিক শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। তবে এসব প্রতিষ্ঠান যখন সুবিধাভোগীদের কাছে ঋণ বিতরণ করবে, তখন সব ধরনের ফি ও চার্জসহ কার্যকর বার্ষিক সুদহার সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ রাখতে হবে।
অর্থাৎ ঋণ ব্যবস্থাপনার নামে অতিরিক্ত কোনো ফি, চার্জ বা অন্যান্য ব্যয় যুক্ত করে গ্রাহকের ওপর কার্যকর সুদের হার ৬ শতাংশের বেশি নেওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ধারিত সীমা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
সরকারের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের মেয়াদ হবে ১০ বছর। এর মধ্যে এক বছর থাকবে গ্রেস পিরিয়ড। গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পরবর্তী মাস থেকে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের অনুকূলে ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ শুরু করবে। ঋণচুক্তির মাধ্যমে পরিশোধের বিস্তারিত কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।
সরকারের এই বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচির আওতায় মূলত গৃহস্থালি, প্রাতিষ্ঠানিক ও শিল্প পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি স্থাপন, সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে ঋণ দেওয়া হবে।
এর মধ্যে রয়েছে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, নেট মিটারিং সংযোগ, সোলার হোম সিস্টেম এবং সৌরচালিত সেচপাম্প। পাশাপাশি এসব ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইনভার্টার, মিটার ও ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থার জন্যও অর্থায়ন করা যাবে।
অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি অথবা তাদের অংশীদার ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করতে পারবে। তবে যে পদ্ধতিতেই ঋণ দেওয়া হোক না কেন, পরিপত্রে নির্ধারিত সব শর্ত মানতে হবে।
সুবিধাভোগী ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সেই ঝুঁকি সংশ্লিষ্ট অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকেই বহন করতে হবে। ঋণ বিতরণের পদ্ধতি, কিস্তির কাঠামো, পণ্য পরিকল্পনা, কর্মসূচির নির্দেশিকা এবং সুবিধাভোগীর যোগ্যতা ও মূল্যায়নের মানদণ্ড নির্ধারণের দায়িত্বও অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দেওয়া হয়েছে।
কর্মসূচির আওতায় ঋণ দেওয়ার আগে সুবিধাভোগীর যথাযথ যাচাই-বাছাই করতে হবে। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে যথাযথ ডিউ ডিলিজেন্স বা প্রয়োজনীয় যাচাই সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি ঋণসংক্রান্ত নীতিমালা ও নির্দেশিকা পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিতে হবে।
এ কর্মসূচির অর্থ কোনোভাবেই বিদ্যমান ঋণ পরিশোধ, ঋণ নবায়ন বা ‘লোন এভারগ্রিনিং’-এর কাজে ব্যবহার করা যাবে না। একইভাবে জমি বা শেয়ার কেনা, ব্যক্তিগত ভোগ, প্রতিষ্ঠানের সাধারণ প্রশাসনিক ব্যয় কিংবা অন্য কোনো তহবিল বা কর্মসূচিতে অর্থ স্থানান্তরও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
কর্মসূচির অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আলাদা ব্যাংক হিসাব এবং পৃথক হিসাব কোড রাখতে হবে। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদিত পরিচালন পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা তথ্যব্যবস্থা চালু করতে হবে।
ঋণ সুবিধাভোগীদের অনুমোদিত ব্যাংক হিসাবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থ বিতরণ করতে হবে। এর ফলে ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থের ব্যবহার ও লেনদেন পর্যবেক্ষণ সহজ হবে।
ঋণ বিতরণের আগে সুবিধাভোগীর পরিচয় ও যোগ্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি গ্রাহক পরিচিতি বা কেওয়াইসি বিধান অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে এএমএল/সিএফটি-সংক্রান্ত প্রযোজ্য বিধানও পরিপালন করতে হবে।
সরকারের জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
নতুন এই ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে অর্থায়নের সুযোগ বাড়াবে। বিশেষ করে কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পাওয়ার সুযোগ থাকায় গৃহস্থালি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি স্থাপনের সুযোগ বাড়তে পারে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণে এ অর্থায়ন কর্মসূচি ভূমিকা রাখবে।
পড়ুন:৫ হাজার তরুণ উদ্যোক্তা খুঁজবে বাংলাদেশ ব্যাংক, সর্বোচ্চ ২০ লাখ ঋণ সহায়তা
ইমি/


