সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দিনের নির্ধারিত সময়জুড়ে পাঠদান। এরপর বিদ্যালয়ের বাইরেই সেই শিক্ষার্থীদের নিয়ে কোচিং। মাসে শিক্ষার্থীপ্রতি নেওয়া হচ্ছে ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। কোচিংয়ে না পড়লে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। ঢাকার ধামরাই উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করেছেন কয়েকজন অভিভাবক।
অভিভাবকদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে যে শিক্ষক সরকারি দায়িত্বে শিক্ষার্থীদের পড়ান, ক্লাস শেষে তাঁর কাছেই আবার অর্থের বিনিময়ে পড়তে হচ্ছে অনেক শিশুকে। এতে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের পরিবারের ওপর তৈরি হচ্ছে বাড়তি আর্থিক চাপ। সন্তানকে কোচিংয়ে না পাঠালে পড়াশোনা বা পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে ভয় দেখানো হলে অনেক অভিভাবক বাধ্য হয়েই টাকা দিচ্ছেন বলে তাঁদের দাবি।
অভিযোগ রয়েছে, ধামরাই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিজেদের বাসা কিংবা নির্দিষ্ট স্থানে শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিয়মিত কোচিং করাচ্ছেন। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে মাসিক ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন অঙ্কের ফি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলে একজন শিক্ষকের এই কোচিং কার্যক্রম থেকে মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে চাপ তৈরির। কয়েকজন অভিভাবকের দাবি, কোনো শিশু কোচিংয়ে পড়তে না চাইলে তাকে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে নির্ধারিত পাঠদান যদি যথাযথভাবে হয়, তাহলে একই শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের বাইরে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে পড়ার প্রয়োজন কেন তৈরি হচ্ছে? আর কোনো শিক্ষক যদি নিজের কাছে পড়তে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে থাকেন, তাহলে সেটি শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য?
অভিভাবকদের ভাষ্য, শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার দায়িত্ব যেখানে বিদ্যালয়ের, সেখানে কোচিংয়ের অতিরিক্ত খরচ অনেক পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে একাধিক সন্তান থাকা পরিবারগুলোর জন্য এই ব্যয় আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে ধামরাই উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক বিদ্যালয়ের বাইরে কোচিং করাচ্ছেন কি না কিংবা শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে পড়তে বাধ্য করছেন কি না—এমন অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি যাচাই করা হবে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, “যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা ও প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এখন মূল প্রশ্ন—ধামরাইয়ের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কতজন শিক্ষক বিদ্যালয়ের বাইরে কোচিং করাচ্ছেন, কতজন শিক্ষার্থী সেখানে পড়ছে এবং মাসে মোট কত টাকা নেওয়া হচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে বিদ্যালয়ভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ, অভিভাবকদের বক্তব্য এবং সরেজমিন অনুসন্ধান জরুরি।
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বক্তব্যও নেওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সরকারি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও কোচিংনির্ভরতা নিয়েও কার্যকর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকেরা।
পড়ুন : হাওরের বুকে থমকে গেল যুবকের জীবন: বজ্রপাতে নিভল পরিবারের আলো


