বিজ্ঞাপন

যুদ্ধ অবসান ও আলোচনায় ফিরতে ইরানের তিন দাবি

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অবসান এবং ফের আলোচনায় বসতে তিনটি শর্ত দিয়েছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মহসেন রেজাই জানিয়েছেন, কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এরই মধ্যে শর্তগুলো ওয়াশিংটনে পাঠানো হয়েছে।

এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে তেহরান। খবর আল জাজিরার।

ইরানের শর্তগুলো হলো—

১. সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে।
২. যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা ইরানের জব্দ করা অর্থ ও সম্পদ ছেড়ে দিতে হবে।
৩. ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নিতে হবে।

রেজাই বলেন, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

ইরানের শর্তগুলো মেনে নেওয়া ওয়াশিংটনের স্বার্থের জন্যও ইতিবাচক হবে বলে দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে ট্রাম্পের হুমকিতে কোনো ফল হবে না বলেও মন্তব্য করেন এই ইরানি কর্মকর্তা।

আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরান ‘নির্ণায়ক যুদ্ধের’ জন্য প্রস্তুত রয়েছে বলেও সতর্ক করেন রেজাই। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর দুর্বলতাগুলো ইরান চিহ্নিত করেছে এবং সম্ভাব্য মার্কিন বিমান হামলা মোকাবিলায় তেহরান আগের তুলনায় বেশি প্রস্তুত।

রেজাই আরও বলেন, সম্প্রতি একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর কাছাকাছি ইরান জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। ইরানের ওপর হামলা হলে অঞ্চলটির মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থে আরও শক্তিশালী হামলা চালানো হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের নীতির পরিবর্তনের সমালোচনা করে রেজাই বলেন, আগের সমঝোতা স্মারক থেকে ওয়াশিংটন সরে যাওয়ার পর ইরানকে তাদের কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করতে হয়েছে। চলমান সংঘাতের জন্য তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকেও দায়ী করেন।

এদিকে আঞ্চলিক সংঘাত কমানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন রেজাই। তিনি সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতিদের মধ্যকার সংঘাতের অবসান চান বলে জানান। তাঁর দাবি, হুতিরাও রিয়াদের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী।

কাতার ও পাকিস্তান গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা পুনরায় শুরুর চেষ্টা করছে। এর মধ্যেই ইরানের তিন শর্ত প্রকাশ্যে আসায় পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপের দিকে নজর রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণ?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলার সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তারই প্রতিফলন ঘটেছে এতে।

ইরান ও লেবাননে হাজারো মানুষের প্রাণহানি হয়েছে, যাদের মধ্যে বহু বেসামরিক নাগরিক রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কৌশলগতভাবে বড় ধাক্কা খেয়েছে। অন্যদিকে যে শাসনব্যবস্থাকে ধ্বংসের লক্ষ্য নিয়ে অভিযান চালানো হয়েছিল, সেই তেহরানের সরকার শুধু টিকে যায়নি, বরং আগের তুলনায় আরও শক্ত অবস্থানে চলে গেছে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধের চাপ
বিশ্বের তেল সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ট্রাম্পকে বড় ধরনের ছাড় দিতে হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী কট্টর মহল এবং ইসরায়েল সরকার—দুই পক্ষই ক্ষুব্ধ হয়েছে।

সমঝোতায় লেবাননের যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানানো হলেও ইসরায়েল এতে রাজি নয়। দেশটি লেবাননে পূর্ণ সামরিক স্বাধীনতা চায়।

হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর অবরোধ তুলে নেবে, তেল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে এবং জব্দ করা ইরানি সম্পদ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে। এর ফলে ইরান কয়েক বিলিয়ন ডলার আয়ের সুযোগ পাবে।

মূলত পরিস্থিতি যুদ্ধ শুরুর আগের দিন, ২৭ ফেব্রুয়ারির অবস্থায় ফিরে গেছে। তখন হরমুজ প্রণালি খোলা ছিল এবং পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনাও চলছিল। এখন আবার সেই আলোচনাতেই ফিরবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।

সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন এক্সে বলেন, যুদ্ধবিরতির একমাত্র ফল হলো হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া, যেটা যুদ্ধের আগেও খোলা ছিল। আর সেটা করতেও ইরানকে অর্থ দিতে হচ্ছে।

যুদ্ধ কেন হলো

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—এই যুদ্ধের প্রয়োজনই বা কেন হয়েছিল। অনেক বিশ্লেষক এটিকে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় ভুল বলে মনে করছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্যও এটি রাজনৈতিকভাবে বড় ধাক্কা হতে পারে।

নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিয়ে আসছিলেন। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যার পর তিনি আশা করেছিলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।

খামেনির উত্তরসূরিরা বুঝতে পেরেছিলেন, এটি তাদের অস্তিত্বের লড়াই। তাই তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করতে দ্বিধা করেননি, যে অস্ত্রটি খামেনি নিজে ব্যবহার করতে চাননি। এই একটি পদক্ষেপই বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে।

ইরানের প্রতিরোধ অক্ষ দুর্বল হয়েছে, বিশেষ করে সিরিয়ায় আসাদের পতনের পর। তবে হরমুজ বন্ধ করে ইরান যে প্রভাব তৈরি করেছে, তা অনেক বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

ভুল হিসাবের খেসারত

ট্রাম্প প্রথমে বলেছিলেন, এটা ইরানের জনগণের জন্য প্রজন্মে একবার আসা সুযোগ। নেতানিয়াহু বাইবেলের ভাষায় বলেছিলেন, এবার সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থাকে পুরোপুরি শেষ করা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউই তা পারেনি।

ইরানের শাসনব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত ও কঠোর হলেও এটি ধর্মীয় আদর্শ, জাতীয়তাবাদ এবং টিকে থাকার দৃঢ় ইচ্ছার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৮০-এর দশকের ইরাক-ইরান যুদ্ধ থেকেই এই ব্যবস্থা এ ধরনের আঘাত সামলানোর জন্য তৈরি হয়েছে।

এখন কী অপেক্ষা করছে

এই সমঝোতা কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়। এটি শুধু পারমাণবিক ইস্যুতে ৬০ দিনের আলোচনার পথ খুলে দিয়েছে। আলোচনা সফল হলে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হতে পারে। তবে দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার বড় ঘাটতি রয়েছে। উভয় দেশের কট্টরপন্থীরা এই প্রক্রিয়া ভেঙে দিতে চাইবে।

তারপরও হাজারো প্রাণহানি এবং বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতির তুলনায় এই সমঝোতা অনেক ভালো। এখন দেখার বিষয়, আলোচনায় দুই পক্ষ কতটা বাস্তববাদী আচরণ করে।

যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থায় ফিরতে এত রক্ত আর ক্ষতির প্রয়োজন ছিল কি না—এই প্রশ্ন হয়তো অনেকদিন ধরেই ঘুরে ফিরে আসবে।

পড়ুন : রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন হামলার দায় স্বীকার হুতিদের, ‘মক্কা প্যাক্ট’ কার্যকরের ঘোষণা তুরস্কের

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন