দেশের পুঁজিবাজারের আকার দিন দিন বড় হলেও এর বড় অংশ আসছে না নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তি কিংবা শেয়ারবাজারের প্রকৃত সম্প্রসারণ থেকে। বরং সরকারি ট্রেজারি বন্ডের বিপুল উপস্থিতিতে কাগজে-কলমে বড় হচ্ছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) আকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ডিএসইর মোট ইস্যুকৃত মূলধনের ৭৬ দশমিক ৬৪ শতাংশই সরকারি ট্রেজারি বন্ডের দখলে।
২০২৬ সালের জুলাই শেষে ডিএসইর মোট ইস্যুকৃত মূলধনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি ট্রেজারি বন্ডের অংশ প্রায় ৭৭ শতাংশ। একই সময়ে ডিএসইর মোট বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি ট্রেজারি বন্ডের প্রতিনিধিত্ব ৪৭ দশমিক ১৪ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি বন্ডের বিপুল উপস্থিতি পুঁজিবাজারের ইস্যুকৃত মূলধন ও বাজার মূলধনের আকার বড় করে দেখালেও এটি বাজারের প্রকৃত গভীরতা ও লেনদেন সক্ষমতার পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন নয়। কারণ পুঁজিবাজারের গভীরতা শুধু তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের মোট মূল্য দিয়ে নির্ধারিত হয় না। এর সঙ্গে নিয়মিত লেনদেন, বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ, বিনিয়োগ পণ্যের বৈচিত্র্য এবং সহজে কেনাবেচার সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ।
পলিসি থিঙ্ক অ্যান্ড রিসার্চের (পিটিআর) চেয়ারম্যান ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মাজেদুল হক বলেন, পুঁজিবাজারে সরকারি বন্ডের বড় উপস্থিতি বাজারের আকার বাড়িয়ে দেখালেও প্রকৃত বাজার গভীরতা বা লেনদেন সক্ষমতা কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তার মতে, সরকারি বন্ডের নিয়মিত লেনদেন এখনও সীমিত এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও কম।
তিনি বলেন, পুঁজিবাজারসহ আর্থিক খাতের বিভিন্ন অংশে দীর্ঘদিন ধরে আস্থার সংকট রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে শুধু নীতিগত উদ্যোগ বা কাগজে-কলমে বাজারের আকার বাড়ালেই পুঁজিবাজার কার্যকরভাবে চাঙা হবে না।
মাজেদুল হকের মতে, সরকারি বন্ডে প্রকৃত বিনিয়োগকারী বাড়ানোর পাশাপাশি এর নিয়মিত লেনদেন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন নতুন কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে কর অবকাশের মতো প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। এতে তালিকাভুক্তির প্রতি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়বে এবং পুঁজিবাজারে প্রকৃত বিনিয়োগ ও লেনদেন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
গত সপ্তাহে প্রকাশিত ‘মান্থলি রিপোর্ট অন ক্যাপিটাল মার্কেট অ্যানালাইসিস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জুলাই শেষে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৩৮টি। জুন শেষে এ সংখ্যা ছিল ৬৪০টি।
তালিকাভুক্ত এসব সিকিউরিটিজের মধ্যে রয়েছে ৩৬০টি কোম্পানি, ৩৫টি মিউচুয়াল ফান্ড, ২১৯টি সরকারি বন্ড, ৮টি ডিবেঞ্চার এবং ১৬টি করপোরেট বন্ড। তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে ৩৬টি ব্যাংক, ২৩টি ফাইন্যান্স কোম্পানি, ৫৮টি বীমা কোম্পানি এবং ২৪৩টি অন্যান্য কোম্পানি রয়েছে।
জুলাই মাসে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে মোট লেনদেন হয়েছে ২ লাখ ৬৩ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। জুনে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৬৫ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে লেনদেন কিছুটা কমেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই শেষে ডিএসইর ইস্যুকৃত মূলধনে সরকারি ট্রেজারি বন্ডের অংশ ছিল ৭৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। আগের মাস জুনে এ অংশ ছিল ৭৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ। মে শেষে ৭৭ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং এপ্রিল শেষে সরকারি বন্ডের অংশ ছিল ৭৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
অর্থাৎ সরকারি বন্ডের আধিপত্য কোনো এক মাসের ঘটনা নয়; কয়েক মাস ধরেই ডিএসইর ইস্যুকৃত মূলধনে এ প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ট্রেজারি বন্ডের পর ইস্যুকৃত মূলধনে সবচেয়ে বড় অংশ ব্যাংক খাতের, যার পরিমাণ ১০ শতাংশ। এছাড়া টেক্সটাইল খাতের অংশ ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ, টেলিযোগাযোগ ১ দশমিক ৫১ শতাংশ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ, ফার্মাসিউটিক্যালস ও কেমিক্যালস ১ দশমিক ২০ শতাংশ এবং প্রকৌশল খাতের অংশ ১ দশমিক ১৭ শতাংশ।
শুধু ইস্যুকৃত মূলধন নয়, বাজার মূলধনের ক্ষেত্রেও সরকারি ট্রেজারি বন্ডের অংশ উল্লেখযোগ্য। জুলাই শেষে ডিএসইর মোট বাজার মূলধন ছিল ৭ লাখ ৫ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি ট্রেজারি বন্ডের অংশ ৪৭ দশমিক ১৪ শতাংশ।
বাজার মূলধনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ব্যাংক খাত, যার অংশ ১০ দশমিক ৭২ শতাংশ। ফার্মাসিউটিক্যালস ও কেমিক্যালস খাতের অংশ ৮ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং টেলিযোগাযোগ খাতের ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। প্রকৌশল খাতের অংশ ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ৪ দশমিক ৪২ শতাংশ, খাদ্য ও আনুষঙ্গিক পণ্যের ৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ, বীমার ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং টেক্সটাইল খাতের অংশ ২ দশমিক ২০ শতাংশ।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক এম হেলাল আহম্মেদ খান বলেন, শুধু মালিকানার কাঠামো দেখে পুঁজিবাজারের লেনদেন সক্ষমতা বিচার করা ঠিক হবে না। ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ কমে যাওয়া, বিও হিসাব কমে যাওয়া, আইপিও দুর্বল হওয়া এবং বাজারে তারল্য কমে যাওয়ার মতো বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
তার মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনের পাশাপাশি মানসম্মত নতুন কোম্পানি এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও দীর্ঘমেয়াদি বেসরকারি পুঁজির অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
তবে সরকারি বন্ডের উপস্থিতিকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ। তিনি বলেন, সরকারি বন্ডও পুঁজিবাজারের অংশ এবং প্রচলিত ব্যবস্থার আওতায় এসব বন্ড বাজারের হিসাবের মধ্যে এসেছে। ফলে সরকারি বন্ডের উপস্থিতির কারণে বাজারের আকার বড় দেখালেও এটিকে নেতিবাচকভাবে দেখার কারণ নেই।
তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে আরও বেশি প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। নতুন প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করতে নিয়মকানুন সহজ করা হয়েছে এবং বিভিন্ন সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে। ফলে আরও প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জুলাই শেষে চলতি বাজারমূল্যে জিডিপির বিপরীতে ডিএসইর বাজার মূলধনের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ। জুন শেষে এ অনুপাত ছিল ১১ দশমিক ৪২ শতাংশ। তবে গত বছরের জুলাইয়ে অনুপাতটি ছিল ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
অর্থাৎ মাসের হিসাবে কিছুটা উন্নতি হলেও এক বছরের হিসাবে জিডিপির বিপরীতে ডিএসইর বাজার মূলধনের অনুপাত কমেছে। গত এক বছরে এ অনুপাতে বেশ ওঠানামা দেখা গেছে। জুলাই ২০২৫-এ ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ থেকে আগস্টে তা ১১ দশমিক ৯০ শতাংশে উঠেছিল। এরপর ডিসেম্বর ২০২৫-এ ১১ দশমিক ০৮ শতাংশে নেমে আসে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুপাতটি ১১ দশমিক ৭৪ শতাংশে ওঠার পর মার্চে ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ, এপ্রিলে ১১ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং মে মাসে ১১ দশমিক ১৮ শতাংশে ছিল। জুনে বেড়ে ১১ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং জুলাইয়ে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ হয়েছে।
সব মিলিয়ে, সরকারি ট্রেজারি বন্ড ডিএসইর ইস্যুকৃত ও বাজার মূলধনের বড় অংশজুড়ে থাকলেও পুঁজিবাজারের প্রকৃত গভীরতা নির্ভর করছে সক্রিয় লেনদেন, বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ, নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি এবং বাজারে আস্থার পরিবেশের ওপর।
পড়ুন:বিপিসির লোকসান ও পাচার ঠেকাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল
ইমি/


