আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে বাংলাদেশে আবারও বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। সোমবার থেকে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিন—সব ধরনের জ্বালানির দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।
দাম বাড়ানোর পর বর্তমানে দেশে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকায়। পেট্রোলের দাম হয়েছে ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা। সরকারের হিসাবে, মার্চের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে পরিবহন বা ফ্রেইট খরচও বেড়েছে।
অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কম: রিজভী
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম অনেক কম। তিনি বলেন, সরকার জ্বালানি সংকট নিরসনে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে এবং মূল্য সমন্বয়ের পরও জ্বালানিতে লোকসান গুনতে হচ্ছে। রিজভী আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি পরিস্থিতিতে সংকট তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। সরকার জ্বালানিতে ভর্তুকি দিচ্ছে। মূল্য সমন্বয়ের পরও সরকারকে লোকসান বহন করতে হচ্ছে। দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপির এই নেতা বলেন, পরিকল্পিতভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিকে ভিন্ন খাতে নেয়ার ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে, বৈদেশিক মুদ্রায় কেনা জ্বালানি তেল প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে পাচার হওয়ার বড় ঝুঁকিতে থাকায় সরকারকে তেলের মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই অঞ্চলে একমাত্র আমাদের বাংলাদেশেই জ্বালানি তেলের মূল্য সর্বনিম্ন পর্যায়ে ছিল। এর ফলে একটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়।
তিনি আরও বলেন, এমতাবস্থায় সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে এবং প্রবাসী ভাইদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় কেনা জ্বালানি তেল যেন প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে পাচার না হতে পারে, সে কারণেই সরকারকে এই মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে। অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, চলমান বৈশ্বিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে যেভাবে অব্যাহতভাবে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং প্রতিদিন নতুন মাত্রায় আবির্ভূত হচ্ছে-যার ফলে বীমা প্রিমিয়াম ও জাহাজ ভাড়া বাড়ছে, তাতে জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকারের সামনে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। অজনপ্রিয় হলেও অনেকটা বাধ্যতামূলকভাবেই আমাদের এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, যা ২১ সেপ্টেম্বর প্রথম প্রহর (গতকাল দিবাগত রাত ১২টা) থেকে কার্যকর হয়েছে।
বাংলাদেশে জ্বালানির দাম বাড়ার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, প্রতিবেশী দেশগুলোতে একই সময়ে জ্বালানির দাম কত? বাংলাদেশি টাকায় হিসাব করলে এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দামের পার্থক্যই বা কত? রয়টার্স ও এডিটিভির প্রতিবেদন এবং ‘নেপালি পেট্রল ডটকম’ থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বরের স্থানীয় বাজারদর ও ওই সময়ের বিনিময় হার ধরে আনুমানিক বাংলাদেশি টাকায় হিসাব করলে প্রতিবেশী দেশগুলোর জ্বালানির দামের চিত্র এমন—
| দেশ ও বাজার |
|---|
| পেট্রোল/লিটার |
|---|
| বাংলাদেশি টাকায় |
|---|
| ডিজেল/লিটার |
|---|
| বাংলাদেশি টাকায় |
|---|
| বাংলাদেশ |
| ৳১৬০ |
| ১৬০ টাকা |
| ১৩৫ টাকা |
| ১৩৫ টাকা |
| ভারত (দিল্লি) |
| ₹১০২.১২ |
| প্রায় ১৩১ টাকা |
| ₹৯৫.২০ |
| প্রায় ১২২ টাকা |
| ভারত (কলকাতা) |
| ₹১১৩.৪৭ |
| প্রায় ১৪৫ টাকা |
| ₹৯৯.৮২ |
| প্রায় ১২৮ টাকা |
| পাকিস্তান |
| PKR ৩৮৯.১৪ |
| প্রায় ১৭২ টাকা |
| PKR ৪২৪.০৪ |
| প্রায় ১৮৮ টাকা |
| নেপাল (কাঠমান্ডু) |
| NRs ২০০ |
| প্রায় ১৬১ টাকা |
| NRs ২০০ |
| প্রায় ১৬১ টাকা |
ভারতে জ্বালানির দাম শহর ও রাজ্যভেদে পরিবর্তিত হয়। ২১ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ছিল ১০২.১২ রুপি এবং ডিজেল ৯৫.২০ রুপি। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ আনুমানিক ১৩১ ও ১২২ টাকা।
এই হিসাবে দিল্লির তুলনায় বাংলাদেশে পেট্রোলের দাম প্রায় ২৯ টাকা এবং ডিজেলের দাম প্রায় ১৩ টাকা বেশি।
তবে ভারতের ক্ষেত্রে দিল্লির দাম দিয়ে পুরো দেশের চিত্র বোঝা যাবে না। রাজ্যভেদে ভ্যাট ও অন্যান্য করের পার্থক্যের কারণে জ্বালানির দামও পরিবর্তিত হয়। ২১ সেপ্টেম্বর কলকাতায় এক লিটার পেট্রোলের দাম ছিল ১১৩.৪৭ রুপি এবং ডিজেল ৯৯.৮২ রুপি।
পাকিস্তানে বাংলাদেশের চেয়ে জ্বালানির দাম বেশি
পাকিস্তানে ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে পেট্রোলের দাম কমিয়ে ৩৮৯.১৪ পাকিস্তানি রুপি এবং হাই-স্পিড ডিজেলের দাম ৪২৪.০৪ রুপি করা হয়। এই দাম ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কার্যকর ছিল।
বাংলাদেশি টাকায় রূপান্তর করলে পাকিস্তানে এক লিটার পেট্রোলের দাম প্রায় ১৭২ টাকা এবং ডিজেল প্রায় ১৮৮ টাকা।
অর্থাৎ এই হিসাব অনুযায়ী পাকিস্তানে পেট্রোলের দাম বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় ১২ টাকা এবং ডিজেলের দাম প্রায় ৫৩ টাকা বেশি।
পাকিস্তানে জ্বালানির দাম আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার, করসহ বিভিন্ন উপাদানের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির জ্বালানি বাজারেও আন্তর্জাতিক তেলের দামের বড় ওঠানামার প্রভাব পড়েছে।
নেপালে পেট্রোলের দাম বাংলাদেশের কাছাকাছি
নেপালেও ২১ সেপ্টেম্বর জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। নেপাল অয়েল করপোরেশনের নতুন দরে কাঠমান্ডু উপত্যকায় প্রতি লিটার পেট্রোল ও ডিজেলের দাম ২০০ নেপালি রুপি করা হয়েছে।
বাংলাদেশি টাকায় হিসাব করলে উভয় জ্বালানির দাম দাঁড়ায় প্রায় ১৬১ টাকা।
তবে নেপালেও দেশের সব অঞ্চলে জ্বালানির দাম একই নয়। অঞ্চলভেদে পরিবহন ব্যয়ের কারণে দামের পার্থক্য থাকতে পারে।
কোথায় কত বেশি?
এই চার বাজারের হিসাবে পেট্রোলের দামে বাংলাদেশের চেয়ে পাকিস্তানে দাম বেশি। দেশভেদে হিসাবটি হলো—
- বাংলাদেশ: ১৬০ টাকা
- পাকিস্তান: প্রায় ১৭২ টাকা
- ভারত (দিল্লি): প্রায় ১৩১ টাকা
- নেপাল (কাঠমান্ডু): প্রায় ১৬১ টাকা
ডিজেলের ক্ষেত্রে—
- বাংলাদেশ: ১৩৫ টাকা
- পাকিস্তান: প্রায় ১৮৮ টাকা
- ভারত (দিল্লি): প্রায় ১২২ টাকা
- নেপাল (কাঠমান্ডু): প্রায় ১৬১ টাকা
একই আন্তর্জাতিক বাজার, তবু দেশে দেশে দাম ভিন্ন কেন?
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়া বা কমার প্রভাব সব দেশের ওপরই পড়ে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে এক ব্যারেল তেলের যে দামই থাকুক, ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর পর সব দেশে একই দামে তা বিক্রি হয় না। কারণ পাম্পের মূল্যের সঙ্গে আন্তর্জাতিক তেলের দামের পাশাপাশি আরও বিভিন্ন ব্যয় যুক্ত হয়।
এর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে কর ও শুল্ক। প্রতিটি দেশে জ্বালানির ওপর আরোপিত কর, শুল্ক ও ভ্যাটের হার এক নয়। ফলে একই দামে তেল আমদানি করা হলেও করের পার্থক্যের কারণে পাম্প পর্যায়ে দাম আলাদা হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মুদ্রার বিনিময় হার। আন্তর্জাতিক বাজারে সাধারণত মার্কিন ডলারে তেল কেনা হয়। কোনো দেশের মুদ্রার মূল্য ডলারের বিপরীতে কমে গেলে একই পরিমাণ তেল আমদানিতে স্থানীয় মুদ্রায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবহন ও আমদানি ব্যয়। তেল কোন উৎস থেকে আসছে, কীভাবে তা পরিবহন করা হচ্ছে, জাহাজভাড়া, বিমা, বন্দর খরচ এবং দেশের অভ্যন্তরে পরিবহনের ব্যয়—সবই শেষ পর্যন্ত জ্বালানির দামে প্রভাব ফেলে।
সরকারের মূল্য নির্ধারণের নীতিও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশ আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দ্রুত জ্বালানির দাম সমন্বয় করতে পারে। আবার কোনো দেশ ভোক্তার ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কমাতে কিছু সময় বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ সরকার বা রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির মাধ্যমে বহন করতে পারে।
এ ছাড়া স্থানীয় বাজারের কাঠামোর পার্থক্যও জ্বালানির দামে প্রভাব ফেলে। জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা, পরিশোধন ও আমদানির সক্ষমতা এবং দেশের অভ্যন্তরের বিতরণব্যবস্থার খরচ একেক দেশে একেক রকম।
ফলে একই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল কিনলেও বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের পাম্পে জ্বালানির দাম এক হওয়া স্বাভাবিক নয়। আন্তর্জাতিক তেলের দাম চূড়ান্ত মূল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও কর, বিনিময় হার, আমদানি ও পরিবহন ব্যয় এবং সরকারি মূল্যনীতিসহ বিভিন্ন বিষয় মিলেই ভোক্তার জন্য নির্ধারিত হয় চূড়ান্ত দাম।
পড়ুন: ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের এগিয়ে আসার আহ্বান
আর/


