কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের কোল খালি করে চলে গেছে তাঁর ১৩ বছরের প্রাণোচ্ছল সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। ফুটফুটে এই জীবনের এমন করুণ পরিণতি স্তব্ধ করে দিয়েছিল সবাইকে। সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কী ঘটেছিল, তার রহস্যও এখন ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে।
মামলার এক আসামি সম্প্রতি গোয়েন্দাদের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তদন্তে নতুন নতুন দিক সামনে আসতে থাকে। গ্রেপ্তার ওই আসামির ফোনে ঘন ঘন আসা কয়েকটি অস্বাভাবিক কলই হয়ে ওঠে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। পুলিশ সেই কলগুলোর সূত্র ধরে এগোতেই বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর বিভিন্ন তথ্য।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে শোকের আবহ নেমে আসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বরে শিক্ষক সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত হয় মানববন্ধন। সেখানে সহকর্মীর প্রতি সমবেদনা জানাতে উপস্থিত ছিলেন বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহার শীলা। মানববন্ধনে তিনি উপস্থিত সবার সামনে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্তের নতুন ও চাঞ্চল্যকর অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরেন।
ঘটনার দিন ছিল শুক্রবার। অপ্রতিম তখন বাসাতেই ছিল। বাইরে অবশ্য তখনই তৈরি হচ্ছিল একটি সুচতুর ফাঁদ। সেই ফাঁদের শুরু হয় মোবাইল ফোনে আসা একের পর এক খুদে বার্তার মধ্য দিয়ে।
তদন্তকারী সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, যেকোনো মূল্যে অপ্রতিমকে বাসা থেকে বের করে আনাই ছিল অভিযুক্ত তুহিনের উদ্দেশ্য। এজন্য অপ্রতিমের ফোনে বারবার মেসেজ পাঠানো হচ্ছিল। তাকে বাইরে আসার জন্য দেওয়া হচ্ছিল চাপ।
কিন্তু সাধারণ কথায় যখন অপ্রতিমকে বাইরে বের করা যাচ্ছিল না, তখন দেওয়া হয় একটি ভিন্ন ধরনের টোপ। তাকে বলা হয়, তার কাছে থাকা দামি ‘আইফোন’ দিয়ে টিকটকের জন্য সুন্দর সুন্দর ভিডিও বানানো হবে, তোলা হবে ছবি।
কিশোর মনের ছবি তোলার আগ্রহই শেষ পর্যন্ত তাকে বাসার বাইরে নিয়ে আসে। বেলা ঠিক আড়াইটার দিকে মায়ের মোবাইল ফোনটি সঙ্গে নিয়ে বাসা থেকে বের হয় অপ্রতিম। স্বজনদের ধারণা ছিল, বন্ধুদের সঙ্গে হয়তো ছবি তুলতেই বাইরে গেছে সে।
কিন্তু সেই ধারণার আড়ালেই যে অপেক্ষা করছিল ভয়াবহ পরিণতি, তা কেউ জানতেন না। একটি ছুটির দিনের স্বাভাবিক দুপুরে ছবি তোলার আহ্বানে বাসা থেকে বের হওয়া অপ্রতিম আর কখনোই নিজের চেনা ঘরে ফিরে আসেনি।
পুলিশ সূত্রের ভাষ্য, বেলা ৩টা থেকে ৩টা ১০ মিনিটের মধ্যে তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের দেখা হয়। এরপর বিভিন্ন এলাকার অন্তত চারটি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে তাদের গতিবিধি।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, অপ্রতিম ও তুহিন পাশাপাশি হাঁটছে, কথা বলছে। তাদের আচরণেও কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা যায়নি। একটি ফুটেজে তাদের পেছনে আরও দুজনকে যেতে দেখা যায়। পরে অন্য একটি ফুটেজে চারজনকেই একসঙ্গে পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এরপর তারা পৌঁছায় লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি নির্জন জঙ্গলে। চেনা লোকালয় থেকে দূরে ওই স্থানে যেতে হয় মূল সড়ক থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরের আঁকাবাঁকা কাঁচা পথ ধরে।
পুলিশের পাওয়া একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, অপ্রতিম ও তুহিন পাশাপাশি হেঁটে পাহাড়ের পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। তদন্তকারীদের মতে, নির্জন ওই স্থানে পৌঁছানোর পর তাদের সঙ্গে যোগ দেয় আরও দুই কিশোর।
শুক্রবার বিকেল তখন ঘনিয়ে আসছিল। সময় আনুমানিক পাঁচটা থেকে ছয়টার মধ্যে। নির্জন সেই স্থানে অপ্রতিমের হাত থেকে আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়।
কিন্তু নিজের জিনিস রক্ষা করতে অপ্রতিম সেটি শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। একপর্যায়ে শুরু হয় ধস্তাধস্তি। আর সেই ধস্তাধস্তিই মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়।
প্রতিবাদের মুখে তুহিন পাশ থেকে একটি বাঁশের লাঠি তুলে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করে। এরপর অন্যরাও একে একে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিস্তব্ধ হয়ে যায় চারপাশ। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ১৩ বছরের অপ্রতিমের নিথর দেহ।
হত্যাকাণ্ডের পর রক্তমাখা স্থানেই অপ্রতিমের মরদেহ ফেলে রেখে যায় ঘাতকের দল। সঙ্গে নিয়ে যায় শুধু সেই মোবাইল ফোনটি।
তদন্তে পাওয়া তথ্যের কথা জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, সিয়াম নামের আরেক তরুণ ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তবে ঘটনার সময় তিনি আশপাশে থেকে পাহারা দেওয়ার মতো কোনো ভূমিকা পালন করেছিলেন কি না, সেটি যাচাই করছে পুলিশ।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশ জানতে পেরেছে, এলাকাটি বেশ নির্জন। ফলে বাইরে থেকে সেখানে কী ঘটছে, তা সহজে বোঝার সুযোগ কম।
অপ্রতিমের মরদেহে মাথায় গুরুতর আঘাতের পাশাপাশি আরও কিছু ক্ষত পাওয়া যায়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, এসব ক্ষতের কিছু মৃত্যুর পর তৈরি হয়ে থাকতে পারে। রাতে শিয়াল মরদেহ টানাটানি করেছিল।
মরদেহের এসব ক্ষতের বিষয়ে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক তথ্যও পর্যালোচনা করছে পুলিশ। আর এভাবেই একের পর এক সূত্র ধরে সামনে আসছে ১৩ বছরের অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের ঘটনাপ্রবাহ।
পড়ুন: মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় গাজী নজরুল ৪, প্রথম স্ত্রী ১ দিনের রিমান্ডে
আর/


