কিলিয়ান এমবাপের ফুটবল ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের গল্পে লিভারপুলের নাম বেশ জোরালোভাবেই উঠে আসে। ২০১৭ সালে মোনাকো ছাড়ার সময় ইউরোপের একাধিক বড় ক্লাবের নজরে ছিলেন ফরাসি এই তরুণ তারকা। সেই দৌড়ে ছিল ইংলিশ জায়ান্ট লিভারপুলও। শুধু ক্লাব নয়, এমবাপের মা-ও চেয়েছিলেন ছেলে যেন অ্যানফিল্ডের ক্লাবটিতেই যোগ দেন।
লিভারপুলের প্রতি এমবাপের পরিবারের আগ্রহ কতটা ছিল, তার একটি গল্পও প্রায় এক দশক পর সামনে এসেছে। মোনাকোতে থাকার সময় এমবাপেকে দলে ভেড়াতে ব্যক্তিগতভাবেও চেষ্টা করেছিলেন লিভারপুলের তৎকালীন কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ। জার্মান এই কোচের সঙ্গে এমবাপের সম্পর্কও ছিল ভালো। ক্লপের ফুটবল দর্শন ও ব্যক্তিত্বের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা ছিল এমবাপের।
লিভারপুল যে সে সময় এমবাপেকে দলে পাওয়ার জন্য কতটা মরিয়া ছিল, সেটিও জানিয়েছেন ক্লপ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এমবাপের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করতে লিভারপুলের একটি দল ব্যক্তিগত বিমানে করে ব্ল্যাকপুল থেকে নিসে গিয়েছিল।
শুধু তাই নয়, এমবাপে ও তার পরিবারের সদস্যরাও সেই বিমানে উঠেছিলেন। পাঁচ কক্ষের ওই বিমানে বসেই চলেছিল ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা। এমনকি বিমানটি আকাশে চক্কর দিচ্ছিল, যাতে নিচ থেকে কেউ তাদের অবস্থান বুঝতে না পারে। ক্লপের ভাষায়, এমবাপেকে দলে নিতে তখন লিভারপুল ‘সবকিছুই’ করার চেষ্টা করেছিল।
সেই আলোচনায় ক্লপ নিজেই এমবাপের সামনে লিভারপুলের পরিকল্পনা তুলে ধরেছিলেন। কীভাবে তাকে দলে ব্যবহার করা হবে, ক্লাবের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী—এসব নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ফরাসি তারকা।
এমবাপে পরবর্তী সময়ে সেই ঘটনার স্মৃতিচারণও করেছেন। তার ভাষায়, তারা তখন বিমানে ছিলেন এবং বিমানটি আকাশে ঘুরছিল। সেই সময় ক্লপ তাকে লিভারপুলের পরিকল্পনার কথা বোঝাচ্ছিলেন।
তবে লিভারপুলের প্রতি আগ্রহ থাকলেও এমবাপের মায়ের পছন্দ ছিল আরও স্পষ্ট। তিনি নিজেই লিভারপুলে গিয়ে ক্লাবের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। শহর ঘুরে দেখার পাশাপাশি অ্যানফিল্ডেও গিয়েছিলেন তিনি। এমনকি একা অ্যানফিল্ডে গিয়ে কয়েকটি ম্যাচও দেখেছিলেন।
কারণটা ছিল পুরোপুরি আবেগের। এমবাপেকে লিভারপুলের জার্সিতে অ্যানফিল্ডের মাঠে খেলতে দেখার স্বপ্ন দেখেছিলেন তার মা। ছেলের ক্যারিয়ারের পরবর্তী গন্তব্য হিসেবে লিভারপুলকে তিনি পছন্দ করেছিলেন।
দ্য অ্যাথলেটিককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমবাপে জানিয়েছেন, তার মা ইয়ুর্গেন ক্লপের বড় ভক্ত ছিলেন। সে কারণেই লিভারপুল ছিল তার মায়ের পছন্দের গন্তব্য। মা চাইতেন, এমবাপে যেন ইংল্যান্ডে গিয়ে লিভারপুলের হয়ে খেলেন।
এ নিয়ে মা-ছেলের মধ্যে নিয়মিত কথাও হতো। এমবাপে মাকে জিজ্ঞেস করতেন, তার কী করা উচিত। উত্তরে মায়ের পরামর্শ প্রায় সব সময়ই একই থাকত—লিভারপুলে যাওয়া উচিত।
এমবাপের মা লিভারপুলকে শুধু একটি বড় ফুটবল ক্লাব হিসেবেই দেখেননি। ক্লাবটির পরিবেশও তার ভালো লেগেছিল। অ্যানফিল্ড ও ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের দেখে তার মনে হয়েছিল, সেখানে একটি পারিবারিক আবহ রয়েছে। ক্লাবের আন্তরিক পরিবেশও তাকে আকৃষ্ট করেছিল।
এমবাপেও স্বীকার করেছেন, লিভারপুল তাকে মুগ্ধ করেছিল। ক্লপের মতো একজন কোচের অধীনে কাজ করার সুযোগও তার কাছে আকর্ষণীয় ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ফুটবলের বাইরের একটি বিষয় বড় হয়ে ওঠে—নিজের শহর প্যারিস।
তখন এমবাপের সামনে একাধিক বড় প্রকল্প ও ক্লাবের প্রস্তাব ছিল। লিভারপুলের পরিকল্পনাও তাকে আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু প্যারিসে জন্ম ও বেড়ে ওঠা একজন তরুণ ফুটবলারের জন্য নিজের শহরের ক্লাবের হয়ে বিশ্বমঞ্চে তারকা হয়ে ওঠার সুযোগ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের অনুভূতি।
সেই সিদ্ধান্তের কথা বলতে গিয়ে এমবাপে জানিয়েছেন, ক্লপকে তাকে বোঝানোর প্রয়োজন ছিল না। তিনি জানতেন ক্লপ কে, লিভারপুলের গুরুত্ব কী এবং ক্লাবটির প্রতি তার নিজেরও আগ্রহ ছিল। তবে একই সময়ে অন্য কিছু প্রকল্পও তার সামনে ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের শহরকে বেছে নেন।
২০১৭ সালে মোনাকো থেকে পিএসজিতে ধারে যোগ দেন এমবাপে। পরে ১৮ কোটি ইউরোর চুক্তিতে স্থায়ীভাবে প্যারিসের ক্লাবটির খেলোয়াড় হন। পিএসজিতে কাটানো দীর্ঘ সময়ে তিনি ক্লাবটির অন্যতম প্রধান তারকা হয়ে ওঠেন এবং ফরাসি ফুটবলে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন।
প্যারিসে দীর্ঘ অধ্যায় কাটানোর পর এমবাপে শেষ পর্যন্ত স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদে পাড়ি জমান। তবে ক্যারিয়ারের শুরুর সেই সময়ে লিভারপুলে যাওয়ার সম্ভাবনার গল্পটি এখনো ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়।
একদিকে ছিল ইয়ুর্গেন ক্লপের পরিকল্পনা, লিভারপুলের আগ্রহ এবং অ্যানফিল্ডে ছেলেকে দেখার মায়ের স্বপ্ন। অন্যদিকে ছিল নিজের শহর প্যারিসে থেকেই বড় তারকা হওয়ার সুযোগ। শেষ পর্যন্ত আবেগ ও পরিচিত শহরের টানেই পিএসজিকে বেছে নিয়েছিলেন এমবাপে।
আজকের বিশ্বতারকা এমবাপের ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকালে তাই লিভারপুলের সেই অধ্যায়টি এক ধরনের ‘যদি’ হয়ে আছে। অ্যানফিল্ডে লিভারপুলের জার্সিতে এমবাপেকে দেখার যে স্বপ্ন তার মা দেখেছিলেন, তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। তবে সেই সিদ্ধান্তই তাকে প্যারিসে দীর্ঘ সময়ের এক সফল অধ্যায়ের সুযোগ করে দেয় এবং পরে তার ক্যারিয়ার পৌঁছে যায় রিয়াল মাদ্রিদের মতো আরেক ঐতিহাসিক ক্লাবে।


