বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

১৮০ দিনে বিচার শেষ না হলেও নারী-শিশু মামলা বাতিল হবে না: হাইকোর্ট

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে কোনো মামলার বিচার শেষ না হলেও শুধু সময়সীমা পার হওয়ার কারণে ওই মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত বা বাতিল হবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, বিচার শেষ করার ক্ষেত্রে আইনে উল্লেখ করা ১৮০ দিনের সময়সীমা বাধ্যতামূলক নয়, বরং নির্দেশনামূলক।

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করা সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব হলেও ১৮০ দিন পার হয়ে গেলেই মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর বা কোনো বিরূপ আইনগত পরিণতির মুখে পড়বে না।

‘মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেল বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় এ রায় দেন হাইকোর্ট। ইডেন কলেজের এক ছাত্রীর ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলায় জারি করা রুল খারিজ করে বিচারপতি কে. এম. কামরুল কাদের ও বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৩ সালের ৭ জুন এ রায় দেন। রায়ের অনুলিপি গত ২০ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

রায়ে আদালত বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ও ৩১ক ধারা সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ট্রাইব্যুনাল কোনো মামলার বিচার নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে ব্যর্থ হলেও কোনো অবস্থাতেই নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করা যাবে না।

আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার বিচার ১৮০ দিনের মধ্যে শেষ করার যে সময়সীমা আইনে নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাধ্যতামূলক (mandatory) নয়; বরং নির্দেশনামূলক (directory)। কারণ, আইনের ২০ ও ৩১ক ধারায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ না হলে বিচারিক প্রক্রিয়া বাতিল বা স্থগিত হওয়ার কোনো পরিণতির বিধান রাখা হয়নি।

আদালতে পাভেলের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এম. এইচ. রশীদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ সাইফুজ্জামান (জামান) ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. শফিকুজ্জামান (রানা)। আদালতের মূল রায়টি লিখেছেন বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরী।

মামলার পটভূমি

প্রকাশিত রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, কলেজে যাতায়াতের সূত্রে আসামি পাভেলের সঙ্গে ইডেন কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ২০ বছর বয়সী এক ছাত্রীর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ২০০৭ সালের ৮ জুলাই পাভেলের সঙ্গে একটি বাসায় যাওয়ার পর বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে ধর্ষণ করা হয়। পরে পাভেল ওই শিক্ষার্থীকে একাধিকবার ধর্ষণ করলে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাকে জোরপূর্বক গর্ভপাত করানো হয়।

এ ঘটনার পর ২০০৮ সালের ২৭ জানুয়ারি রাজধানীর শ্যামপুর থানায় পাভেলসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন ভুক্তভোগীর মা। তদন্ত শেষে পুলিশ মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়।

পরে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকার ১ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। ২০০৮ সালের ২৩ জুলাই আদালত পাভেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। তবে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

এরপর ২০১১ সালের ৮ মে হাইকোর্টে রিট করেন পাভেল। তার দাবি ছিল, বিচারের জন্য মামলার নথি ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই ট্রাইব্যুনালে নথিভুক্ত হওয়ার পরও নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ হয়নি।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ধারা অনুযায়ী মামলা গ্রহণের ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

পাভেলের দাবি অনুযায়ী, মামলার নথি ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই ট্রাইব্যুনালে গৃহীত হয়। কিন্তু ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারির ৩৪ নম্বর আদেশ থেকে দেখা যায়, ২০১১ সালের ৮ মে পর্যন্ত মামলাটি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ছিল। তার মতে, এটি ২০০০ সালের আইনের ৩১ক ধারার লঙ্ঘন।

এ ছাড়া নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হলে আইনের ৩১ক ধারা অনুযায়ী বিচার শেষ না হওয়ার কারণ উল্লেখ করে ৩০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল, পাবলিক প্রসিকিউটর ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের কাছে প্রতিবেদন দেওয়ার বিধান রয়েছে। পাভেলের দাবি ছিল, এমন কোনো প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি।

পাভেলের আরও দাবি ছিল, আইন লঙ্ঘন করে বিচারিক কার্যক্রম চলতে পারে না। বিচার স্থগিতের আবেদন করলে হাইকোর্ট মামলার বিচারিক কার্যক্রম তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। পরে সময় সময় ওই স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হয়।

পরবর্তীতে হাইকোর্ট উভয় পক্ষের যুক্তি পর্যালোচনা এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ও ৩১ক ধারা বিশ্লেষণ করে রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে ২০২৩ সালের ৭ জুন রায় দেন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত

রায়ে আদালত বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ও ৩১ক ধারা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন নয়। আদালতের মতে, রিটকারী অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে ২০১০ সালের ৭ নভেম্বরের পরবর্তী আদেশগুলো গোপন করেছেন, যা রিটকারীর অসৎ উদ্দেশ্যে প্রণোদিত কাজ বলে মনে হয়।

আদালত আরও বলেন, মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করার জন্য যে যুক্তিগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে, তা রিটকারীর মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন নয়। কারণ, রিটকারীর পক্ষে কোনো আইনি অধিকার তৈরি হয়নি।

সার্বিক তথ্য-প্রমাণ, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং আইনের বিধান বিবেচনায় আদালত রুলের কোনো সারবত্তা খুঁজে পাননি। ফলে রুলটি খারিজ করে হাইকোর্টের দেওয়া আগের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার ও বাতিল করা হয়।

পড়ুন : জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বাস-মিনিবাসের ভাড়া বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন