চলন্ত অবস্থায় মেট্রোরেলের একটি দরজা খুলে যাওয়ার ঘটনায় নিরাপত্তার স্বার্থে উত্তরা-মতিঝিল রুটে প্রায় ২৬ মিনিট ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। পরে যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামতের পর আবারও ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকালে এ ঘটনা ঘটে।
এমআরটি পুলিশের (অপারেশন) পরিদর্শক মো. মহসীন শেখ বাংলানিউজকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান, সকালে উত্তরা উত্তর স্টেশন থেকে মতিঝিলের দিকে যাচ্ছিল একটি মেট্রোরেল। চলন্ত অবস্থায় ট্রেনটির পেছনের একটি দরজা হঠাৎ খুলে যায়।
নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সকাল ৭টা ৩৭ মিনিটে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে মেট্রোরেলের যান্ত্রিক ত্রুটি সমাধানের পর সকাল ৮টা ৩ মিনিটে পুনরায় সার্ভিস চালু করা হয়।
এর ফলে উত্তরা-মতিঝিল রুটে ২৬ মিনিট ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। বর্তমানে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে, সকাল থেকে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে উত্তরা থেকে মতিঝিল এবং মতিঝিল থেকে উত্তরা—দুই দিকের ট্রেনই নির্ধারিত সময়ের তুলনায় কিছুটা দেরিতে স্টেশনে পৌঁছাচ্ছে। এতে অফিসগামী যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
ট্রেন আসতে দেরি হওয়ায় বিভিন্ন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মেও যাত্রীদের অতিরিক্ত ভিড় দেখা গেছে। বিশেষ করে মিরপুর-১০, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও ও ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনে প্রচণ্ড ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
তবে এই সাময়িক বিঘ্নের বিষয়ে মেট্রোরেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য জানায়নি।
ঢাকার মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-৬) চালুর পর থেকে বিভিন্ন সময়ে সিগন্যালিং, বিদ্যুৎ সঞ্চালন, কোচ, সিভিল স্ট্রাকচারসহ নানা ধরনের যান্ত্রিক ও কারিগরি ত্রুটির তথ্য সামনে এসেছে। কিছু ত্রুটি তাৎক্ষণিকভাবে মেরামত করা হলেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে বড় ধরনের ত্রুটি ও ঝুঁকির বিষয়ও চিহ্নিত হয়েছে।
ট্রেনের দরজা ও ব্রেকিং সিস্টেমে ত্রুটি
চলন্ত অবস্থায় মেট্রোরেলের দরজা খুলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ উত্তরা উত্তর স্টেশন থেকে মতিঝিলগামী একটি ট্রেনের পেছনের দরজা চলন্ত অবস্থায় হঠাৎ খুলে যায়। নিরাপত্তার স্বার্থে সকাল ৭টা ৩৭ মিনিটে ট্রেন চলাচল বন্ধ করা হয়। ত্রুটি মেরামতের পর সকাল ৮টা ৩ মিনিটে আবার ট্রেন চলাচল শুরু হয়।
এর আগে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পল্লবী স্টেশনে একটি ট্রেনের স্বয়ংক্রিয় দরজা লক হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। দরজা খুলতে না পারায় প্রায় এক ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল।
এ ছাড়া একটি স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষায় ট্রেনের ৩০২টি ব্রেক উপাদানে ফাটল বা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার তথ্য রয়েছে। স্টেশনে ট্রেনের দরজা ও প্ল্যাটফর্মের স্ক্রিন ডোরের (PSD) মধ্যে ঠিকমতো সামঞ্জস্য না থাকার বা মিসঅ্যালাইনমেন্টের সমস্যার কথাও উঠে এসেছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ওভারহেড লাইনে সমস্যা
মেট্রোরেলের ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেমেও বিভিন্ন সময়ে ত্রুটি দেখা দিয়েছে। ২১ আগস্ট ২০২৩ ওভারহেড বৈদ্যুতিক তারে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টা মেট্রোরেল চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল।
এ ছাড়া ঢাকা শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ওপর দিয়ে মেট্রোরেল চলাচল করায় ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেমে ঘুড়ির সুতা, প্লাস্টিক ও কাপড় আটকে শর্ট সার্কিটের ঘটনাও ঘটেছে। ২০২৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ও ৩১ মার্চ ঝড়ের সময় ক্যাটেনারি লাইনে ময়লা আটকে যাওয়ায় এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল।
বিভিন্ন ট্রেনের পাওয়ার বোর্ড ও অক্সিলারি পাওয়ার সিস্টেমেও সমস্যার তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ইলেকট্রনিক ব্রেকিং সিস্টেম, ব্রেক কম্পোনেন্ট এবং থার্মাল সেন্সরেও ত্রুটি শনাক্ত হয়েছে।
বেয়ারিং প্যাড ও পিয়ারে ত্রুটি
মেট্রোরেলের ভায়াডাক্টের পিয়ার বা খুঁটির ওপর থাকা রাবারের বেয়ারিং প্যাড নিয়েও ত্রুটির তথ্য পাওয়া গেছে। স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষা ও সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রুটের শত শত বেয়ারিং প্যাডে ত্রুটি বা স্থানচ্যুতির ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
পাশাপাশি কয়েকটি পিয়ারে ফাটলের তথ্যও সামনে এসেছে। ফার্মগেটে একটি বেয়ারিং প্যাড খুলে নিচে পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
২০২৪-২০২৫ সময়ে বেয়ারিং প্যাড সরে যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকির বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে আসে।
এ ছাড়া ৭ আগস্ট ২০২৩ মেট্রোরেলের ট্র্যাকে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় নির্ধারিত সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৫ মিনিট দেরিতে ট্রেন চলাচল শুরু হয়।
দরজা ও প্ল্যাটফর্মের সামঞ্জস্যের সমস্যা
কখনও কখনও নির্ধারিত স্থানে ট্রেন পুরোপুরি না থেমে কিছুটা সামনে বা পেছনে থামে। এতে ট্রেনের দরজা এবং প্ল্যাটফর্মের আউটার বা স্ক্রিন ডোরের মধ্যে সামঞ্জস্যে সমস্যা দেখা দেয়।
এই ধরনের মিসঅ্যালাইনমেন্টের ঘটনাও মেট্রোরেলের কারিগরি সমস্যার তালিকায় রয়েছে।
টিকিটিং ব্যবস্থায় কারিগরি জটিলতা
মেট্রোরেলের টিকিট ভেন্ডিং মেশিন (TVM) এবং স্বয়ংক্রিয় ভাড়া আদায় বা এএফসি গেটেও বিভিন্ন সময়ে কারিগরি সমস্যা দেখা দিয়েছে।
টিকিট স্ক্যানের সময় জটিলতা এবং লোকাল কন্ট্রোল ইউনিট ক্র্যাশ করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। ডেটাবেজ সফটওয়্যারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় সেন্ট্রাল সার্ভার ও লোকাল কন্ট্রোল ইউনিট একাধিকবার ক্র্যাশ করেছে।
এ ছাড়া প্রতি এক লাখ যাত্রীর মধ্যে গড়ে ১ হাজার ৫০০ জনের টিকিট স্ক্যানে ত্রুটি দেখা গেছে।
স্টেশনে পানি চুইয়ে পড়ার সমস্যা
বৃষ্টির সময় মেট্রোরেলের বিভিন্ন স্টেশনে পানি চুইয়ে পড়ার সমস্যাও দেখা গেছে। কারিগরি ও নির্মাণজনিত ত্রুটির কারণে ১৬টি স্টেশনের ছাদ, লিফট ও এসকেলেটরের বিভিন্ন অংশ দিয়ে বৃষ্টির পানি ভেতরে ঢোকার তথ্য পাওয়া গেছে।
২০২৪-২০২৫ সময়ে এসব স্টেশনের মোট ৮৯টি স্পটে বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ার সমস্যা দেখা দেয়।
সব মিলিয়ে এমআরটি লাইন-৬-এ বিভিন্ন সময়ে ট্রেনের দরজা, ব্রেকিং ও পাওয়ার সিস্টেম, ওভারহেড ক্যাটেনারি, বেয়ারিং প্যাড, পিয়ার, ট্র্যাক, টিকিটিং ব্যবস্থা এবং স্টেশন কাঠামোতে নানা ধরনের যান্ত্রিক ও কারিগরি ত্রুটির তথ্য সামনে এসেছে। এসবের কিছু ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে ট্রেন চলাচল বন্ধ বা ধীরগতির হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
পড়ুন : তারেক রহমানের সঙ্গে এরদোয়ানের বৈঠক, সহযোগিতা বাড়ানোর আলোচনা
সা/


