ক্যারিয়ারের দীর্ঘ পথচলায় নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করলেও এবার নিজেকে আরও ভিন্নভাবে দর্শকের সামনে তুলে ধরার ইঙ্গিত দিয়েছেন অভিনেত্রী মধুমিতা সরকার। দীর্ঘদিনের পরিচিত অভিনয়ধারার বাইরে গিয়ে এবার চরিত্রনির্ভর ও মনস্তাত্ত্বিক গল্পে নিজেকে মেলে ধরতে চাইছেন তিনি। সেই ধারাবাহিকতায় ‘অটবি’ চলচ্চিত্রে সম্পূর্ণ নতুন এক রূপে হাজির হচ্ছেন এই অভিনেত্রী।
‘অটবি’ সিনেমায় মধুমিতার চরিত্রে রয়েছে ভিন্ন মাত্রার মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা। চরিত্রটির মানসিক টানাপোড়েন, অস্বাভাবিক আচরণ এবং শারীরিক অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে ধরা হবে। ফলে এই চরিত্রটি শুধু অভিনয়ের সুযোগই নয়, বরং নিজের পরিচিত অভিনয়-ছক ভাঙারও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে মধুমিতার জন্য।
নিজের চরিত্র প্রসঙ্গে মধুমিতা বলেন, ‘এতদিন দর্শক আমাকে যেভাবে দেখে এসেছেন, এই ছবিতে একেবারেই তেমনটা পাবেন না। চরিত্রটির ভেতরে গভীর এক মনস্তাত্ত্বিক দিক রয়েছে, যা প্রথম থেকেই আমাকে আকর্ষণ করেছিল। কোনো পরিচালক যে আমাকে এমন একটি জটিল চরিত্রে কল্পনা করতে পেরেছেন, এটাই আমার কাছে অনেক বড় বিষয়। কারণ একজন শিল্পী হিসেবে আমি এক জায়গায় আটকে থাকতে চাই না।’
মধুমিতার কথায় স্পষ্ট, ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে শুধু পরিচিত ও সহজ চরিত্রে সীমাবদ্ধ থাকতে চান না তিনি। বরং এমন চরিত্র বেছে নিতে চান, যেখানে অভিনয়শিল্পী হিসেবে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের সুযোগ রয়েছে। ‘অটবি’ সেই যাত্রায় তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হয়ে উঠেছে বলেই মনে করছেন তিনি।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে কাজের প্রতি অনেক বেশি সময় দিয়েছেন মধুমিতা। একের পর এক কাজ, শুটিং ও পেশাগত ব্যস্ততার কারণে ব্যক্তিগত জীবন এবং পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত সময় বের করা সবসময় সম্ভব হয়নি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার জীবনের অগ্রাধিকারেও পরিবর্তন এসেছে।
এখন বেছে বেছে কাজ করতে চান এই অভিনেত্রী। অতিরিক্ত কাজের চাপ কমিয়ে নিজের জীবন, পরিবার ও কাছের মানুষদের জন্য সময় দেওয়াকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে মধুমিতা বলেন, ‘বাবা-মা সবসময়ই আমার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অগ্রাধিকার বদলায় এটা আমি উপলব্ধি করেছি। শুধু পেশাগত সাফল্যই জীবন নয়; যাদের আমরা ভালোবাসি, সেই প্রিয় মানুষ ও পরিবারের জন্যও পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সমান গুরুত্বপূর্ণ।’
তার মতে, একজন শিল্পীর জীবনে কাজ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ব্যক্তিগত জীবন ও সম্পর্কগুলোর প্রতিও দায়িত্ব রয়েছে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া উপলব্ধিই তাকে এখন আরও নির্বাচনমুখী করে তুলেছে।
ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রসঙ্গেও নিজের ভাবনা জানিয়েছেন মধুমিতা। তার মতে, একটি সম্পর্কে দুজন মানুষের মধ্যে মতের অমিল থাকতেই পারে। সব বিষয়ে একই মত বা চিন্তা থাকা সম্ভব নয়। তবে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য পারস্পরিক বোঝাপড়া, সম্মান ও সঙ্গতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মধুমিতার মতে, ভিন্ন মত থাকা কোনো সম্পর্কের জন্য অস্বাভাবিক বিষয় নয়। বরং একে অপরের অবস্থান বোঝার চেষ্টা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাই একটি সম্পর্ককে শক্ত ভিত্তি দিতে পারে।
‘অটবি’তে অভিনয় করতে গিয়ে মধুমিতার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল চরিত্রটির শারীরিক ও মানসিক অভিব্যক্তির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। সাধারণ অভিনয়ধারায় শুধু সংলাপ বা মুখের অভিব্যক্তির ওপর নির্ভর করা সম্ভব হলেও এই চরিত্রের ক্ষেত্রে শরীরের ভাষা ও চোখের দৃষ্টিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হয়েছে।
চরিত্রটির অস্বাভাবিক মানসিক অবস্থা ফুটিয়ে তুলতে নিজের চোখের দৃষ্টি, হাঁটা, দাঁড়ানোর ভঙ্গি এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হয়েছে তাকে। একই সঙ্গে দৃশ্যের পরিস্থিতি ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে চরিত্রের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন তিনি।
এই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে মধুমিতা মনে করেন, চরিত্রটির জন্য তাকে নিজের অভিনয়ের পরিচিত জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। একজন শিল্পী হিসেবে এমন চ্যালেঞ্জই তাকে নতুন করে কাজের প্রতি আগ্রহী করে তোলে।
অভিনয় ক্যারিয়ারের প্রায় ১৭-১৮ বছরের পথচলায় মধুমিতা নানা ধরনের চরিত্রে কাজ করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে দর্শকের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসাকেই নিজের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখেন তিনি।
তবে শুধু প্রশংসা নয়, দর্শকের সমালোচনাকেও গুরুত্ব দেন এই অভিনেত্রী। তার বিশ্বাস, একজন শিল্পীকে আরও ভালো করার ক্ষেত্রে দর্শকের গঠনমূলক সমালোচনার ভূমিকা রয়েছে।
দর্শকদের উদ্দেশ্যে মধুমিতা বলেন, ‘আমি একটু আড়ালে গেলে যখন দর্শক প্রশ্ন তোলেন, “মধুমিতা কোথায়?”, তখন মনে হয় এটাই আমার প্রাপ্তি। তবে শুধু প্রশংসাই নয়, আমার ভুলগুলোও দর্শক ধরিয়ে দিক। দর্শক আমার কাজ পছন্দ হলে যেমন ভালোবাসবেন, ভুল হলে সমালোচনাও করবেন—তাদের এই যুক্ততাই আমার কাছে সবচেয়ে অর্থবহ।’
দীর্ঘ ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে তাই মধুমিতার লক্ষ্য শুধু নিয়মিত পর্দায় উপস্থিত থাকা নয়; বরং এমন কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, যা তাকে অভিনয়শিল্পী হিসেবে নতুনভাবে পরিচিত করবে। ‘অটবি’তে তার নতুন রূপ সেই পরিবর্তনেরই একটি ইঙ্গিত। এখন অপেক্ষা, ভিন্নধর্মী এই চরিত্রে মধুমিতাকে দর্শক কীভাবে গ্রহণ করেন।
পড়ুন:জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে কার্তিক, মাম্মুটি, রণদীপ ও ইয়ামির জয়
ইমি


