প্রবল এল নিনোর প্রভাবে আগামী ছয় মাসে অতিরিক্ত গরমে বিশ্বজুড়ে ৪ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। জলবায়ু বিজ্ঞানীদের করা গবেষণায় এমন আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে। ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও নাইজেরিয়ার মতো দেশ থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত এর প্রভাব পড়তে পারে।
গবেষকদের হিসাবে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে এল নিনোর কারণে অতিরিক্ত তাপজনিত ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে। তবে তাপজনিত মৃত্যুর হার আগামী বছরের জুন বা জুলাই পর্যন্ত বেশি থাকতে পারে।
এই হিসাবের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত গরমে এরই মধ্যে যে মৃত্যুগুলো হচ্ছে, সেগুলো ধরা হয়নি। একই সঙ্গে এল নিনোর প্রভাবে খরা, দাবানল ও বন্যার মতো দুর্যোগ বাড়তে পারে। ফলে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গবেষণায় বিশ্বের ২৪ হাজার ৩৭৮টি অঞ্চলের তাপমাত্রা ও অতিরিক্ত মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ১৯৯৬-২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ের গড় তাপমাত্রা ও মৃত্যুর হারকে ভিত্তি ধরে আগামী মাসগুলোতে এল নিনোর কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সম্ভাব্য প্রভাব হিসাব করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, ভারত ও ব্রাজিল। আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও এর প্রভাব বেশি পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে।
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের সমুদ্রের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি উষ্ণ হয়ে যাওয়ার জলবায়ুজনিত ঘটনা। এর প্রভাব পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়া ও তাপমাত্রায় পড়ে। আর এই সমুদ্রের পানি যখন অস্বাভাবিকভাবে বেশি গরম হয়ে যায় এবং এল নিনোর প্রভাব অনেক বেশি শক্তিশালী হয়, তখন তাকে ‘সুপার এল নিনো’ বলা হয়।
বর্তমান এল নিনো এরই মধ্যে আগের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। সোমবার এটি এল নিনোর ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড অতিক্রম করেছে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা হলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে।
গবেষকেরা এল নিনোকে ভবিষ্যতের একটি সতর্কবার্তা হিসেবেও দেখছেন। তাদের মতে, বর্তমান এল নিনোর কারণে যে ধরনের উচ্চ তাপমাত্রা দেখা যাচ্ছে, আগামী দুই দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক জায়গায় সেটিই স্বাভাবিক তাপমাত্রায় পরিণত হতে পারে।
গবেষকদের মতে, এই পূর্বাভাসের উদ্দেশ্য শুধু সম্ভাব্য মৃত্যুর সংখ্যা জানানো নয়। কোন অঞ্চলে আগে থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, সেটিও চিহ্নিত করা। এর মধ্যে রয়েছে আগাম তাপমাত্রার সতর্কতা, মানুষকে আশ্রয় নেওয়ার জন্য শীতল কেন্দ্র তৈরি, অতিরিক্ত গরমের সময়ে হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে জনবল বাড়ানো এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেন, ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যুর হিসাবটি বিশাল। তবে এই সংখ্যার পেছনে রয়েছে পরিবার, শিশু, বয়স্ক মানুষ, প্রতিবেশী এবং কাজে যাওয়া সাধারণ মানুষ।
এদিকে এল নিনোর কারণে খাদ্য সরবরাহেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, এল নিনোর প্রভাবে আগামী বছর প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারে এবং খাদ্যের দামও বাড়তে পারে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, এল নিনো এমনিতেই বিপজ্জনক একটি জলবায়ু ঘটনা। তবে এটি এখন আরও উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীর ওপর ঘটছে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আগে দেখা যায়নি এমন তীব্র গরম, খাদ্য ও পানির সংকট তৈরি হতে পারে।
এল নিনো কীভাবে ঘটে এবং কেন এবার এটি শক্তিশালী হতে পারে
প্রশান্ত মহাসাগর ও এর ওপরের বায়ুমণ্ডলীয় অঞ্চলের পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই তৈরি হয় এল নিনো। সাধারণ সময়ে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত বাতাস দুর্বল হয়ে গেলে কিংবা এর দিক পরিবর্তন হলে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ পানি মধ্য ও পূর্বাঞ্চলীয় ক্রান্তীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় এল নিনোর সৃষ্টি হয়।
নোয়ার বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, মধ্য ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ের তুলনায় শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে যাওয়ার তথ্য পর্যবেক্ষণের পর নতুন এল নিনো পর্যায় শুরু হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। একই সঙ্গে বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থাতেও পরিবর্তন দেখা গেছে। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের তুলনায় মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে বায়ুচাপ কমে গেছে।
জাপান মিটিওরোলজিক্যাল এজেন্সিও জানিয়েছে, বর্তমানে এল নিনোর পরিস্থিতি বিদ্যমান। তবে কিছু বিজ্ঞানী সতর্ক করেছেন, এবারের এল নিনো অস্বাভাবিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তাঁরা প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের নিচের পানির অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রার কথা উল্লেখ করছেন।
ওয়ার্ল্ড মিটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী, কিছু অঞ্চলে সমুদ্রের পৃষ্ঠের নিচের পানির তাপমাত্রা গড়ের তুলনায় প্রায় ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। সাধারণত গভীর সমুদ্রের এই অতিরিক্ত তাপ পরবর্তী সময়ে পৃষ্ঠের পানিকেও আরও উষ্ণ করে তোলে।
‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ বা তথাকথিত ‘সুপার এল নিনো’ বলতে বোঝায়, যখন মধ্য ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি বৃদ্ধি পায়। ১৯৫০ সালের পর থেকে এমন ঘটনা মাত্র কয়েকবার ঘটেছে।
নোয়া জানিয়েছে, বর্তমান এল নিনো ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা ৬৩ শতাংশ। সংস্থাটির ভাষায়, এটি ‘১৯৫০ সাল থেকে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক রেকর্ডের সবচেয়ে বড় এল নিনো ঘটনাগুলোর একটি’ হিসেবে স্থান পেতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, এই পরিস্থিতি অন্তত ২০২৭ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত স্থায়ী হবে।
শক্তিশালী এল নিনো আবহাওয়ায় কী প্রভাব ফেলতে পারে
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো বলেছেন, শক্তিশালী এল নিনো ‘খরা ও অতিবৃষ্টির পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করবে এবং স্থলভাগ ও সমুদ্রে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়াবে।’
এল নিনোর সময় সমুদ্র তার তাপ বায়ুমণ্ডলে স্থানান্তর করে। এর ফলে বায়ুর তাপমাত্রাও বাড়ে। এর সঙ্গে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইতোমধ্যে বেড়ে যাওয়া বৈশ্বিক তাপমাত্রা যুক্ত হলে ২০২৭ সাল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর হয়ে উঠতে পারে।
অবশ্য এল নিনোর প্রভাব পৃথিবীর সব অঞ্চলে একই রকম নয়। কোন অঞ্চলে এবং বছরের কোন সময়ে এর প্রভাব পড়ছে, তার ওপর আবহাওয়ার পরিবর্তন নির্ভর করে। দুটি এল নিনো কখনো পুরোপুরি একরকম হয় না। তবে সাধারণভাবে শক্তিশালী এল নিনো দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু এলাকায় গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া তৈরি করতে পারে। এতে খরা ও দাবানলের ঝুঁকিও বাড়ে।
ভারতীয় মৌসুমি বায়ুর ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। এল নিনোর কারণে মৌসুমি বায়ু দুর্বল হলে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এল নিনোর সময় পূর্ব ও মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে সাধারণত বেশি ক্রান্তীয় ঝড় তৈরি হয়। বিপরীতে দক্ষিণ-পূর্ব যুক্তরাষ্ট্রসহ ক্রান্তীয় আটলান্টিক অঞ্চলে ঝড়ের সংখ্যা কমে।
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়ার ওপর এল নিনোর প্রভাব তুলনামূলক জটিল এবং ভিন্নতর হতে পারে। তবে ব্রিটিশ মেট অফিস বা আবহাওয়া বিভাগের মতে, এল নিনো যুক্তরাজ্যে শীতের শুরুটা তুলনামূলক উষ্ণ এবং শেষটা বেশি ঠান্ডা হওয়ার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।
মানুষের ওপর এল নিনোর কী প্রভাব পড়তে পারে
এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিশ্ববাসীকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, ‘এল নিনোর পরিস্থিতি উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীর আগুনে আরও জ্বালানি ঢালবে। এর প্রভাব আরও কঠিনভাবে আঘাত হানবে, আরও দূরে পৌঁছাবে এবং ভয়াবহ গতিতে সীমান্ত অতিক্রম করবে।’
দক্ষিণ আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অঞ্চলে খরার কারণে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমন এক সময়ে এটি ঘটছে, যখন হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সার পরিবহনও ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে ফসল উৎপাদন কমতে পারে, খাদ্য সরবরাহ সংকুচিত হতে পারে এবং খাদ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে।
দক্ষিণ আমেরিকার মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর জন্যও ঝুঁকি রয়েছে। এল নিনোর সময় ঠান্ডা ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানি কম পরিমাণে উপরে উঠে আসে। ফলে অ্যাঞ্চোভিসসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর খাদ্য কমে যায় এবং মাছের উৎপাদনও হ্রাস পেতে পারে।
কিছু বিজ্ঞানী বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোর তুলনা করছেন। সেটি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো ছিল। ওই সময়ে ক্যারিবীয় অঞ্চলে পানির সংকট দেখা দেয়, মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে রেকর্ডসংখ্যক ঝড় তৈরি হয় এবং আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে খরা দেখা দেয়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ঝড় এবং বিস্তৃত খরার এই সম্মিলিত প্রভাব, যার পেছনে অন্তত আংশিকভাবে এল নিনো কাজ করেছিল, বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের খাদ্য সংকট তৈরি করেছিল।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
পড়ুন: রুপির বিপরীতে শক্তিশালী হচ্ছে টাকা
আর/


