দ্রুত পথ পাড়ি দিতে আমরা সাইকেল চালাই। আর বয়সের ভারে নুয়ে পড়া একজন মানুষ সেই সাইকেলেই ভর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেন। তাঁর এই পথচলা কোনো শখের নয়, জীবিকার তাগিদে। পরিবারের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দিতে প্রায় ৮০ বছর বয়সেও থামেনি তাঁর জীবনসংগ্রাম।
জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার চরপুটিমারী ইউনিয়নের ডিগ্রীরচর খলিফাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা হযরত আলী। বয়স প্রায় ৮০ ছুঁই ছুঁই। ছয় কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জনক তিনি। বয়সের ভারে শরীর অনেকটাই নুয়ে পড়েছে। সাইকেল চালানোর সামর্থ্য নেই। তাই সাইকেলটিকে ভর হিসেবে ব্যবহার করেই ধীরে ধীরে পথ চলেন তিনি।
নিজের এই কষ্টের পথচলা সম্পর্কে হযরত আলী বলেন, আমি সাইকেল চালাতে পারি না। কিন্তু এই সাইকেলে ভর দিয়েই পথ হাঁটি। বয়স হয়ে গেছে, শরীরে আগের মতো শক্তি নেই। তারপরও সংসারের জন্য বের হতে হয়।
জীবনের শুরু থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে তাঁর লড়াই। কখনো দিনমজুরি, কখনো বর্গাচাষ—এভাবেই জীবনের দীর্ঘ সময় পার করেছেন। এই সামান্য আয় দিয়েই সন্তানদের লালন-পালন করেছেন, বড় করেছেন এবং তাঁদের বিয়ে দিয়েছেন। অভাবের সংসার হলেও আত্মসম্মানকে আঁকড়ে ধরে অন্যের কাছে হাত পাতেননি তিনি।
বার্ধক্যেও থেমে নেই তাঁর শ্রম। সামান্য কিছু বন্ধকী জমিতে সবজি চাষ করেন। সেই সবজি স্থানীয় বাজারে নিয়ে গিয়ে প্রতিদিন বিক্রি করেন। সবজি বিক্রির আয় দিয়েই কোনো রকমে চলে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর সংসার। কোনো দিন খাবার জোটে, কোনো দিন আবার অভাবের কারণে না খেয়েও থাকতে হয়।
হযরত আলীর একমাত্র ছেলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঢাকায় থাকেন জীবিকার প্রয়োজনে। মেয়েরাও বিয়ের পর নিজ নিজ শ্বশুরবাড়িতে সংসার করছেন। ফলে বৃদ্ধ হযরত আলী ও তাঁর স্ত্রীকে নিজেদের খাবারের সংস্থান নিজেদেরই করতে হয়।
বয়সের ভার, দারিদ্র্য আর শারীরিক সীমাবদ্ধতা—কোনোটিই তাঁকে থামাতে পারেনি। প্রতিদিন সাইকেলে ভর দিয়ে তাঁর এই পথচলা যেন বলে দেয়, মানুষের জীবনে বয়স বাড়ে, শরীর দুর্বল হয়; কিন্তু আপনজনের জন্য কিছু করার তাগিদ অনেক সময় মানুষকে শেষ বয়সেও পথ চলার শক্তি জোগায়।
হযরত আলীর নীরব পথচলার দিকে তাকালে মনে হয়, একই পথ সবার কাছে এক নয়। কারও কাছে পথ দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর মাধ্যম, আবার কারও কাছে সেই পথই জীবনের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার প্রতিচ্ছবি।
হয়তো জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনিও একটু স্বস্তি চান। চান, স্ত্রীকে নিয়ে দুবেলা খাবার খেয়ে শান্তিতে বাঁচতে। কিন্তু সেই স্বস্তির পথও তাঁর কাছে সহজ নয়। তাই বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর নিয়ে সাইকেলে ভর দিয়ে আজও পথ চলেন তিনি—জীবনের প্রয়োজনে, পরিবারের জন্য, একটু ভালো থাকার আশায়।
হযরত আলীর কথায়, সাইকেল চালাতে পারি না, কিন্তু এতে ভর দিয়েই হাঁটি। এই ছোট্ট কথার মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে তাঁর দীর্ঘ জীবনের সংগ্রাম, অভাবের সঙ্গে লড়াই এবং শেষ বয়সেও হাল না ছাড়ার গল্প।
জীবন যে সবসময় দৌড় নয়, কখনো কখনো ধীরে ধীরে এগিয়ে চলাটাই সবচেয়ে বড় সংগ্রাম—হযরত আলীর পথচলা যেন তারই এক নীরব প্রতিচ্ছবি।
পড়ুন : সংবাদ প্রকাশের ১ ঘণ্টার মাথায় তড়িঘড়ি করে সরানো হলো বাংলোর আলোকসজ্জা


