ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল জার্মানি আজ নতুন অধ্যায়ে পা রাখতে যাচ্ছে। ইউয়েফা নেশনস লিগের ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের মুখোমুখি হবে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। আর এই ম্যাচ দিয়েই প্রথমবারের মতো জার্মানির জাতীয় দলের ডাগআউটে দাঁড়াবেন ইয়ুর্গেন ক্লপ। তবে অভিষেক ম্যাচের আগে শিরোপা জয়ের কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি নন সাবেক লিভারপুল কোচ।
জার্মান জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ক্লপের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ দলটিকে নতুন করে গড়ে তোলা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রত্যাশা অনুযায়ী সাফল্য পায়নি জার্মানি। ২০১৪ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় মঞ্চে দলটির পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতার ঘাটতি দেখা গেছে। পরপর কয়েকটি বড় টুর্নামেন্টে প্রত্যাশার আগেই বিদায় নেওয়ার পর এবার নতুন কোচের অধীনে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্য জার্মানির।
২০২৬ বিশ্বকাপে হতাশাজনক বিদায়ের পর জুলাইয়ে জুলিয়ান নাগেলসম্যানের উত্তরসূরি হিসেবে জার্মানির কোচের দায়িত্ব নেন ক্লপ। দীর্ঘদিন ক্লাব ফুটবলে সফলতার সঙ্গে কাজ করা এই কোচ এবার জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। তার প্রধান লক্ষ্য, জার্মানির ফুটবল কাঠামোকে পুনর্গঠন করে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দল তৈরি করা।
লিভারপুলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় ক্লপ ভবিষ্যৎ সাফল্য নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। চার বছর পরও ক্লাবে থাকলে শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি সে সময় আশাবাদী মন্তব্য করেছিলেন। পরে তার অধীনে লিভারপুল প্রিমিয়ার লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শিরোপা জেতে। কিন্তু জাতীয় দলের দায়িত্বে এসে পরিস্থিতি ভিন্ন বলে মনে করছেন ক্লপ।
নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে জার্মানির নতুন কোচ স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি এখনই শিরোপার প্রতিশ্রুতি দিতে চান না। বরং ধাপে ধাপে দলকে উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
ক্লপ বলেন, ‘আমি কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে চাই না। আমি শুধু বলতে পারি, আমরা চেষ্টা করব। এই মুহূর্তে এটাই গুরুত্বপূর্ণ এবং আমরা যেখানে আছি, সেখান থেকে এভাবেই এগোতে হবে।’
জার্মানির বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ক্লপের বক্তব্যে দল পুনর্গঠনের বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। অতীতে জার্মানির মতো দলের কাছে প্রতিটি প্রতিযোগিতায় শিরোপা প্রত্যাশা করা হলেও বর্তমান সময়ে কোচের লক্ষ্য হচ্ছে প্রথমে দলকে প্রতিটি ম্যাচে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো অবস্থায় নিয়ে যাওয়া।
ক্লপ বলেন, তার দায়িত্ব হলো সিনিয়র দলকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যাতে জার্মানি প্রতিটি ম্যাচে জয়ের সুযোগ নিয়ে মাঠে নামতে পারে।
তার ভাষায়, ‘আমি সিনিয়র দলের দায়িত্বে আছি এবং আমার কাজ হলো দলকে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে আমরা খেলা প্রতিটি ম্যাচ জেতার সুযোগ নিয়ে মাঠে নামতে পারি। প্রতিদিন সেটা সম্ভব হবে না, কিন্তু আমরা সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি। আশা করি, আগামীকালই আমরা এর কিছুটা দেখতে পাব।’
জাতীয় দলের কোচ হিসেবে ক্লপের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভিজ্ঞ ও তরুণ খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে নতুন দল তৈরি করা। দীর্ঘদিন ধরে জার্মান দলের মূল কাঠামোতে থাকা কয়েকজন খেলোয়াড়ের জায়গায় নতুন প্রজন্মকে ধীরে ধীরে সুযোগ দেওয়ার প্রক্রিয়াও তার পরিকল্পনার অংশ।
দায়িত্ব নেওয়ার পর সামনে থাকা ম্যাচগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে ক্লপ দুটি আলাদা স্কোয়াড ঘোষণা করেছেন। ইউরো ২০২৮ সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই প্রক্রিয়া নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একসঙ্গে ফল পাওয়ার বদলে ধাপে ধাপে দলকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান তিনি।
জার্মানির সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসও ক্লপের কাজের কঠিনতা তুলে ধরে। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে বিশ্বকাপ জয়ের পর দলটি আর কোনো বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জিততে পারেনি। ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল জার্মানিকে। ইউরোর সাম্প্রতিক আসরগুলোতেও প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি।
ফলে ক্লপের দায়িত্বের শুরুতেই জার্মানির সমর্থকদের প্রত্যাশা থাকবে দলটি যেন আগের ব্যর্থতা কাটিয়ে নতুন পরিচয় তৈরি করতে পারে। তবে কোচ নিজেই তাৎক্ষণিক বড় কোনো সাফল্যের নিশ্চয়তা না দিয়ে সময় নিয়ে দল গঠনের কথা বলছেন।
নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচটি সেই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার প্রথম বড় পরীক্ষা। দুই দলের ফুটবল ইতিহাস দীর্ঘদিনের এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ফলে ক্লপের জন্য জাতীয় দলের প্রথম ম্যাচেই কঠিন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচের পরও জার্মানির সামনে রয়েছে ব্যস্ত সূচি। রোববার ঘরের মাঠে গ্রিসের বিপক্ষে খেলবে তারা। এরপর ১ অক্টোবর সার্বিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামবে জার্মানি। ৪ অক্টোবর আবার গ্রিসের বিপক্ষে খেলবে দলটি।
এই ম্যাচগুলো ক্লপকে দলের বিভিন্ন খেলোয়াড়কে পরীক্ষা করার পাশাপাশি নিজের কৌশল বাস্তবায়নের সুযোগ দেবে। জাতীয় দলের ক্ষেত্রে ক্লাব ফুটবলের মতো প্রতিদিন খেলোয়াড়দের নিয়ে কাজ করার সুযোগ না থাকায় সীমিত সময়ের মধ্যে একটি কার্যকর দল তৈরি করাই হবে তার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১২টা ৪৫ মিনিটে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে মাঠে নামবে জার্মানি। ম্যাচটি শুধু নেশনস লিগের আরেকটি ম্যাচ নয়, জার্মান ফুটবলে ক্লপ যুগেরও আনুষ্ঠানিক সূচনা। শিরোপার প্রতিশ্রুতি না দিলেও দলকে প্রতিটি ম্যাচে জয়ের জন্য প্রস্তুত করার লক্ষ্য জানিয়েছেন জার্মানির নতুন কোচ।
ক্লপের ভাষায়, ‘আমাদের ধাপে ধাপে এগোতে হবে এবং ছেলেরা সেই চ্যালেঞ্জ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত।’
এখন দেখার বিষয়, তার সেই পরিকল্পনার প্রথম বাস্তব প্রতিফলন নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে মাঠে কতটা দেখা যায়।
পড়ুন:পাঁচ বছর পর ফিরলেন ডিকভেলা
ইমি/


