ফিডের দাম বাড়তে বাড়তে এখন পোলট্রি খামারিদের উৎপাদন হিসাবই পাল্টে দিচ্ছে। বাড়তি খরচ সামলাতে কেউ ফিডের পরিমাণ কমাচ্ছেন, কেউ উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছেন। এতে একদিকে মুরগির কাঙ্ক্ষিত ওজন পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে বাজারে মিলছে না প্রত্যাশিত দাম। ফলে লোকসান সামলাতে না পেরে অনেক খামারি ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার কথাও ভাবছেন।
দিনাজপুর সদর উপজেলার পাঁচবাড়ির পোলট্রি খামারি মোমিনুল ইসলামের অবস্থাও এমন। ব্রয়লার মুরগির জন্য প্রতি মাসে তিনি ৭০ বস্তা ফিড কিনতেন। দুই দফায় দাম বেড়ে যাওয়ার পর এখন আর সেই পরিমাণ ফিড কেনা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে ৬০ বস্তা ফিড দিয়েই খামার চালাচ্ছেন তিনি। এতে মুরগির কাঙ্ক্ষিত ওজন হচ্ছে না। বাজারেও মিলছে কম দাম। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে কিছুদিনের মধ্যেই খামার বন্ধ করে দিতে হতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁর।
মোমিনুল ইসলামের মতো দেশের বিভিন্ন এলাকার খামারিরাও একই সংকটে পড়েছেন। ফিডের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি গত কয়েক মাসে ওষুধ, ভ্যাকসিনসহ উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণের খরচও বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ডিম ও মুরগির দাম সেই হারে বাড়ছে না। ফলে লোকসান কমাতে অনেক খামারি উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য ও সাম্প্রতিক বাজার বিশ্লেষণ বলছে, ফিড তৈরির প্রায় সব প্রধান উপাদানের দাম এক মাসের ব্যবধানে বেড়েছে। ১৩ শতাংশ আর্দ্রতার ভুট্টা এখন প্রতি কেজি ৩৮ টাকা ৮০ পয়সায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগে এর দাম ছিল ৩১ টাকা ৩০ পয়সা। ডিওআরবির (ডি-অয়েলড রাইস ব্রান) দাম ২৬ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৩ টাকা। ১৬ শতাংশ তেলযুক্ত চালের কুঁড়ার দাম ৩৩ টাকা থেকে বেড়ে ৩৯ টাকা হয়েছে। সরিষার খৈলের দাম ৩৬ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯ টাকা ৭০ পয়সায়। সয়াবিন মিলের দামও ৮ টাকা বেড়ে হয়েছে ৬৬ টাকা।
ফিড উৎপাদনে ব্যবহৃত অন্যান্য প্রোটিন উৎসের দামেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে। এর সঙ্গে মুদ্রাবাজারের ওঠানামা, বিশেষ করে ডলারের বিনিময় হারের পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে আমদানিনির্ভর পণ্যের দামে।
ভুট্টার বাজারেও সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিসাবে, মার্চ-এপ্রিল-মে মৌসুমে প্রতি কেজি ভুট্টার দাম ছিল ২৮ থেকে ২৯ টাকা। জুন, জুলাই ও আগস্টে সেই দাম বেড়ে হয়েছে ৩৮ থেকে ৪০ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন ভুট্টার দাম ২৩৫-২৪০ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ২৯০ ডলারে পৌঁছেছে। ফিডের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ভুট্টার এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে খাদ্যের দামে। আর ফিডের দাম বাড়ায় পোলট্রি, মাছ ও গবাদিপশু উৎপাদনের খরচও বাড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, পোলট্রি ও গবাদিপশুর খাদ্যের দাম বাড়ার পেছনে কাঁচামালের ব্যয় বড় একটি বিষয়। একটি মানসম্মত ফিড তৈরির মোট খরচের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই কাঁচামাল কেনায় ব্যয় হয়। ফলে ভুট্টা, সয়াবিন মিল, রাইস ব্রান ও ডিওআরবির মতো মৌলিক উপাদানের দাম স্থানীয় কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়ে গেলে ফিড মিলগুলোর পক্ষে আগের দামে ফিড বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
শুধু কাঁচামালের দাম বাড়াই নয়, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলেও ফিডের দাম বেড়ে যায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, তাই শুধু ফিডের দাম নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নিলে হবে না; কাঁচামালের দাম ও সরবরাহ ব্যবস্থার দিকেও নজর দিতে হবে।
বগুড়া সদরের পোলট্রি খামারি হাফিজুর রহমান বলেন, গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন ধরনের প্রাণিজ খাবারের দাম কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে। ৫০ কেজির এক বস্তা ফিডের দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা। রাইস ব্রান ও ভুট্টার দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। ৫০ কেজির এক বস্তা রাইস ব্রানে ৫০০ টাকা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৮০০ টাকা। ভুট্টার দাম কেজিতে ২৫ থেকে বেড়ে ৩৭ টাকা হয়েছে। ৫০ কেজির এক বস্তা পোলট্রি ফিডের দাম বেড়ে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৬৭৫ টাকায় উঠেছে।
গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা সদরের প্রাণিজ খাদ্য বিক্রেতা সলিম উল্যাহ বলেন, খামারিদের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাত মুরগির খাবার। কোনো কোনো খামারির হিসাবে উৎপাদন খরচের প্রায় ৮০ শতাংশ খাবারের পেছনে চলে যায়। ভুট্টার দাম বাড়ায় সব ধরনের খাবারের দাম বেড়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ফিড উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। এতে বেশি দামে ফিড কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। দাম বাড়ায় ক্রেতাও কমে গেছে।
ফিডের দাম বাড়ার কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদেও গত চার মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কর্মসূচি পালন করেছেন খামারিরা। জুনের শুরু থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজশাহী, গাজীপুর, পাবনা, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, নরসিংদী, ঢাকা, কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহে মানববন্ধন, বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ডিম ভেঙে প্রতিবাদ ও স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি হয়েছে।
এসব কর্মসূচিতে ফিডের দাম কমানো, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর কমানো এবং ডিম-মুরগির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফিড তৈরির প্রধান কাঁচামালের দাম আন্তর্জাতিক ও স্থানীয়—দুই বাজারেই বেড়েছে। এর সঙ্গে ডলারের বিনিময় হারের ওঠানামা, আমদানি ব্যয়, স্থানীয় বাজারে সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতিও যুক্ত হয়েছে। এসব কারণে ফিডের দাম কমানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ প্রান্তিক পোলট্রি খামারি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাসেল প্রধান বলেন, দেশের ফিডের কাঁচামালের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডিওআরবি ও রাইস ব্রানের সরবরাহ আগে দেশের চাহিদা অনুযায়ী নিশ্চিত করা দরকার। প্রয়োজনে এসব পণ্যের রপ্তানিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি আমদানি করা কাঁচামালের ওপর ভ্যাট, কর ও শুল্ক কমানো এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। ফিডের দাম কমাতে পারলে খামারির উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং ডিম-মুরগির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল নিউট্রিশন বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. শফিকুর রহমান শিশির বলেন, ডিওআরবি ও রাইস ব্রানের মতো স্থানীয় কাঁচামালের ক্ষেত্রে আগে অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করা উচিত। তবে রপ্তানির সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ না করে উৎপাদক ও স্থানীয় শিল্পের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বাড়লে আমদানি পর্যায়ের কর ও শুল্ক সাময়িকভাবে সমন্বয় করা যেতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে ভুট্টাসহ দেশে উৎপাদনযোগ্য কাঁচামালের উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোর ওপর জোর দেন তিনি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, খামারিরা যাতে কম খরচে পোলট্রি উৎপাদন করতে পারেন, সে জন্য ফিডসহ উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণের ব্যয় কমানোর বিষয়ে কাজ করছে সরকার। দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মূল্যে পোলট্রি পণ্য নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদন পর্যায়ের ব্যয় কমানো জরুরি।
তিনি বলেন, ফিডসহ পোলট্রি উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপকরণের ব্যয় কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। খামারি ও উদ্যোক্তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধানেও উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সূত্র: সমকাল
পড়ুন: ইউপি নির্বাচনে জামানত-ভোটের ব্যয় বাড়ল
আর/


