জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন ভাড়াও বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু সরকারের নির্ধারিত বর্ধিত ভাড়ার সঙ্গে বাস্তবে আদায় করা ভাড়ার মিল পাওয়া যাচ্ছে না। রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলা—বিভিন্ন রুটে বাস, লঞ্চ ও পণ্যবাহী যানবাহনে নিজেদের মতো করে ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ফলে সরকারি সিদ্ধান্তের পর যাত্রীদের জন্য পরিবহন ভাড়ার নতুন হিসাব তৈরি হয়েছে পথে পথে।
সোমবার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। এরপর মঙ্গলবার বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বাড়ানোর কথা জানায় সরকার। বুধবার লঞ্চের ক্ষেত্রে প্রথম ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রতি কিলোমিটারে ২৩ পয়সা এবং ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে প্রতি কিলোমিটারে ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানো হয়। ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত যাতায়াতে সর্বনিম্ন ভাড়া ৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৫ টাকা করা হয়। পাশাপাশি স্পিডবোটে ১১ শতাংশ এবং ফেরিতে ৮ শতাংশ ভাড়া বাড়ানো হয়।
কিন্তু এসব নির্ধারিত হারের বাইরে গিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বাসে এক গন্তব্যের ভাড়া একেক জায়গায় একেকভাবে নেওয়া হচ্ছে। লঞ্চে ডেক ও কেবিনের ভাড়াও নির্ধারিত বৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেশি বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পণ্য পরিবহনেও একই ধরনের অভিযোগ উঠছে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপ নিয়ে।
যাত্রীদের ভাষ্য, বর্তমান সরকারের ছয় মাসে দুই দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর পরিবহন খাতে যে ভোগান্তি তৈরি হয়েছে, এবার তার মাত্রা আগের তুলনায় বেশি। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় পরিবহন ভাড়া নিয়ে এমন দুর্ভোগের চিত্র দেখা গেছে।
তবে এই পরিস্থিতির মধ্যে ট্রেনেই আগের হিসাব অনুযায়ী ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। সরকারি এ পরিবহনে এখনো ভাড়া বাড়ানো হয়নি। যদিও লোকসানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দু-এক দিনের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
রাজধানীতে ভাড়ার নতুন হিসাব বাস মালিকদের
রাজধানীর বিভিন্ন রুটে সরকারি নির্ধারিত ভাড়ার বদলে নিজেদের মতো করে ভাড়া নির্ধারণ করে আদায় করার অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো রুটে সামান্য দূরত্বের ভাড়াতেও একসঙ্গে কয়েক টাকা বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে যাত্রীদের সঙ্গে চালক ও হেলপারদের বচসা এবং হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে।
মিরপুর, পল্টন, গুলিস্তান, রামপুরা, মালিবাগ, সদরঘাট, যাত্রাবাড়ী, ধানমন্ডি, শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, উত্তরা, মহাখালী, গুলশান ও বনানীসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। প্রায় সব রুটেই বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫ টাকা করা হয়েছে। আবার ১৫ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২০ টাকা।
অর্থাৎ, সরকারি সিদ্ধান্তে কিলোমিটারপ্রতি যে পরিমাণ ভাড়া বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তার সঙ্গে মিল রেখে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না। বরং বিভিন্ন সিটি বাস সার্ভিসে গন্তব্যভেদে নতুন ভাড়া নির্ধারণ করে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের।
লঞ্চে নির্ধারিত বৃদ্ধির চেয়ে বাড়তি কত?
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে বিভিন্ন রুটের ভাড়া পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ডেক ও কেবিনে আগের তুলনায় বড় অঙ্কের বাড়তি টাকা নেওয়া হচ্ছে। সরকার যেখানে কিলোমিটারপ্রতি ২৩ পয়সা করে ভাড়া বাড়িয়েছে, সেখানে ডেকের যাত্রীদের কাছ থেকে আগের তুলনায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
কেবিনেও বেড়েছে ভাড়া। সিঙ্গেল কেবিনে ২০০ টাকা এবং ডাবল কেবিনে ৪০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে। সর্বনিম্ন ভাড়া সরকার ৩৫ টাকা করলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।
বরিশাল ও ভোলা রুটে সাধারণ ও বিলাসবহুল লঞ্চের সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া আগে ছিল ১০০০ ও ১২০০ টাকা। এখন নেওয়া হচ্ছে ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা। ডাবল কেবিনের ভাড়া ১৮০০-২০০০ টাকার জায়গায় নেওয়া হচ্ছে ২২০০-২৪০০ টাকা। তৃতীয় শ্রেণির ডেকের ভাড়া ২০০ টাকা থাকলেও এখন তা নেওয়া হচ্ছে ৩৫০ টাকা।
অন্য রুটের কেবিন ও ডেকেও একই ধরনের ভাড়া বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম থেকে টেকনাফ—বাড়তি ভাড়ার চিত্র
চট্টগ্রাম: নগরীর অভ্যন্তরীণ রুট থেকে দূরপাল্লার বাস—সব ক্ষেত্রেই বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
বহদ্দারহাট থেকে আগ্রাবাদে যাতায়াতকারী ব্যাংক কর্মচারী নাসির উদ্দিন জানান, আগে এ পথে বাসভাড়া ছিল ১৮ টাকা। এখন এক লাফে তা ২৫ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। চালক-হেলপাররা নিজেদের মতো করে ভাড়া আদায় করছেন। যাত্রীরা অসহায় হয়ে বাড়তি ভাড়া দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
দূরপাল্লার বাস কাউন্টারগুলোতেও একই চিত্র। টেকনাফগামী বিভিন্ন বাসে আগে ৬৫০ টাকা নেওয়া হলেও এখন তা ৭৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। কক্সবাজার যেতে আগে ৪৩০ টাকা ভাড়া নেওয়া হলেও এখন আদায় করা হচ্ছে ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকা।
জেলা শহরগুলোতেও বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ
বরিশাল: বরিশাল-ভোলা রুটে লঞ্চের যাত্রীভাড়া ৪০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। অন্যান্য রুটে সর্বনিম্ন ২০ টাকা করে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। ভোলা ও মেহেন্দিগঞ্জ রুটে ১৫০ টাকার ভাড়া এখন ১৯০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ: সিরাজগঞ্জ-রংপুর রুটে ৪০০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৪২০ টাকা। পাবনা রুটে ২৫০ টাকার ভাড়া বেড়ে হয়েছে ২৮৫ টাকা।
পাবনা: রুটভিত্তিক নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশে বিলম্বের পাশাপাশি বিভিন্ন পরিবহনে বাড়তি ভাড়া চাওয়ার অভিযোগে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার আগেই পাবনার বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে।
নাটোর: বগুড়া থেকে নাটোর আসা যাত্রী মেহেদি হাসান বলেন, তেলের দাম বাড়ানোর আগে ১০০ টাকা ভাড়া দিয়ে নাটোর আসতাম। এখন ১৫০ টাকা দিতে হয়েছে।
ঢাকাগামী হানিফ এন্টারপ্রাইজের নাটোর কাউন্টারের মাস্টার কোরবান আলী জানান, ‘আগে নাটোর থেকে ঢাকার ভাড়া ছিল ৬০০ টাকা। এখন নেওয়া হচ্ছে ৬৫০ টাকা। তবে এখন পর্যন্ত কেউ ঝামেলা করেনি।’
কিশোরগঞ্জ: কিশোরগঞ্জ-ঢাকা রুটে এতদিন বাসভাড়া ছিল ৩৫০ টাকা। সরকারের নির্ধারিত বর্ধিত ভাড়া অনুযায়ী ২২ টাকা বাড়িয়ে ভাড়া হওয়ার কথা ৩৭২ টাকা। কিন্তু বৃহস্পতিবার থেকে সব পরিবহনে ৩৭০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর সরকারের ঘোষিত ভাড়া বৃদ্ধির হার একদিকে, আর বাস্তবে যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা ভাড়া অন্যদিকে—দেশের বিভিন্ন রুটের এমন চিত্রেই বাড়তি ভাড়ার চাপের মুখে পড়েছেন যাত্রীরা।
সূত্র: সমকাল
পড়ুন: সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সমন্বয়ে জরুরি সামরিক বৈঠক
আর/


